‘গার্মেন্টস’ গল্প নিয়ে বিতর্ক

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

তাহমিমা আনামের ‘গার্মেন্টস’ গল্প নিয়ে চলছে জোর আলোচনা-সমালোচনা।সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ আলোচনা ভীষণ জোরালো। মনে হয় দুই দলে ভাগ হয়ে সবাই বিরোধীতা আর সমর্থনের খেলায় নেমেছেন। অবশ্য এ ধরণের মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও সমালোচনা লেখক ও তার লেখার ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যকর। এই গল্পটি নিয়ে সাহিত্যের পাতায় দুটো আলোচনা তুলে দেয়া হলো।দুটো লেখাই ফেসবুক থেকে সংগৃহীত। মতামতের জন্য প্রাণের বাংলা কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়।- (সাহিত্য সম্পাদক)

তাহমিমা আনামের ‘গার্মেন্টস’ পড়লাম। কী কারণে এটি একটি উৎকৃষ্ট গল্প, বুঝলাম না।
বাস্তবতা তো নেই-ই, কল্পনায়ও ভেজাল। চরিত্রগুলো আরোপিত। নিজেরা গড়ে ওঠেনি। ব্যর্থ গল্প লেখকরাই গল্পে চরিত্র নিয়ে আলোচনা করে। পাঠককে অবকাশ না দিয়ে তাহমিমা তার চরিত্রগুলোকে আগেভাগেই পাঠকের কাছে উন্মোচন করে দিয়েছেন। গল্প নয়, মনে হল বড় একটি উপন্যাসের সারমর্ম পড়েছি। গল্পে সাহিত্য পাইনি, নড়বড়ে একটি ঘটনা মাত্র। ঘটনার মূল সুর কোনটি আন্দাজ করা কঠিন। আন্দাজ করা এ কারণে কঠিন নয় যে, এটি উচ্চমার্গের নিগূঢ় অর্থবহ এক গল্প। বরং উল্টোটা। এতই সস্তা আর লেজে-গোবরে বিন্যাস যে কোন সুরই এককভাবে শোনা যায় না। তাই বলে কোন অর্কেষ্ট্রাও নয় এটা! কিছু ঘটনা, চরিত্র ও বর্ণনা ফেলে দিলেও গল্পটার কিছু যায় আসতো না। এই বাড়তি মেদ আধুনিক গল্পে থাকে না। শুরুতেই আভাষ পাওয়া যায়, কাহিনী এগিয়ে যাবে হিটেরোসেক্সুয়াল নর্মের হাত ধরে। কিন্তু হোঁচট খেতে হয়। জোর করে আরও কিছু নর্ম নিয়ে আসা হয়েছে— বহু, উভ, সম। শুধু নিয়েই আসা হয়েছে। কোনো পরিণতি পায়নি। এই নিয়ে আসাটা গল্পকে রগরগে করার জন্য বলা বাহুল্য। হ্যাঁ রগরগে হয়েছে অনেক। যৌনদৃশ্যের বর্ণনা ও ব্যবহৃত শব্দে চটি সাহিত্যের আলামত আছে। গার্মেন্টস, রানা প্লাজা, ফ্লাইওভার এসব তাজা আইটেম দিয়ে সময়কে ধরতে চাইলেও ধরা যায়নি। ধরা গেছে ও’ হেনরি-কে। গার্মেন্টস তো পণ্য হিসেবে চালুই। মেড ইন বাংলাদেশ বলে কথা।
আরও বিশ গল্পকারের সংগে তাহমিমা আনাম পেয়েছেন ও’ হেনরি। কৌতুহলে অন্য দু’তিনজনের গল্পও পড়লাম। আশ্চর্য হলাম। গার্মেন্টস তো এই লিস্টে থাকার কথা নয়। বুঝলাম, বাজারের জন্য একজন ইংলিশভাষী বাংলাদেশী লেখক দরকার পশ্চিমের। তাহমিমা হয়তো ঠিক বাছাই। কিন্তু তাই বলে তার ’গার্মেন্টস’? “ও’ হেনরি” কমিটির মোটিভেশনের সংগে মেলাতে পারছিনা, স্যরি।
তাহমিমার ক্রেডিট যেটা, ইংরেজিতে লিখতে পারা। আফসোস লাগে, আহা! বাংলাদেশের ছোটগল্প লেখক, যাদের কিছু কিছু গল্প পড়ে চমকে উঠি, সম্মোহিত হই, ঘুমুতে পারিনা— তারা যদি ইংরেজিতে লিখতেন! কতগুলো ‘ও হেনরি’ ঝুলতো বাংলাদেশের গলায়?
তাহমিমাকে তার নিজেরই বর্ণিত সেই অন্তর্বাসের মত মনে হয়। মেকি। অন্যের চোখে ধোঁকা দেয়া পরিধানটি, যা দিয়ে আপনি আপনার শরীরের ঘাটতিকে আড়াল করতে পারবেন। পরিধানটি খুলে ফেললে সেই আগের শরীরটিই কিন্তু আরও নির্মমভাবে প্রকাশিত হয়। প্রকাশিত হয় আরও কিছু ক্ষত, দাগ, অনুজ্জ্বল্যতা। চেপে বসার।
প্রিয় তাহমিমা আনাম! আপনার গল্প থেকে ইংলিশ পরিধানটি সরিয়ে ফেলে দেখেন তো! দেখবেন? ‘থ্যাংকস’।

পাভেল কুবলয়

 ‘গার্মেন্টস’ গল্পটিকে নারীস্বাধীনতা, পুরুষতান্ত্রিকতার আদলে মূল্যায়ন করার চেষ্টা চলছে

তাহমিমা আনামের ‘গার্মেন্টস’ গল্পটিকে নারীস্বাধীনতা, পুরুষতান্ত্রিকতার আদলে মূল্যায়ন করার চেষ্টা চলছে। বিষয়টি রীতিমতো হাস্যকর। গল্পের মূল্যায়ন হবে, গল্পের কাহিনী ও কাহিনীর গাঁথুনি দিয়ে। মূল্যায়ন হওয়া উচিৎ গল্পটি কতটা সাহিত্যমানের হয়েছে; সঠিক শব্দবাক্যের ব্যবহারে কাহিনীর চিত্ররূপ ফুটে উঠেছে কিনা! মোদ্দাকথা গল্প হিসেবে কতটা সার্থক সেটাই বিচার্য বিষয়। অথচ এসবের মধ্যে না গিয়ে নারীস্বাধীনতার বিষয়টি চলে এসেছে। গল্পে আবার নারীপুরুষ!? সবকিছুতে নারীপুরুষ নারীপুরুষ বিষয় তুলে আনলে মানুষ আর রইলো কোথায়!? মানুষ কি আদৌ কোথাও নেই!?
গল্পের কাহিনী হলো গল্পের মূল আকর্ষণ। বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রির মেয়েদের জীবন তুলেধরা হয়েছে এই গল্পে । আসলে, এমন ঘটনা আছে কিনা জানি না, তবে গল্প কিন্তু দেশ, কাল, সময়কে চিহ্নিত করে। সেক্ষেত্রে ‘গার্মেন্টস’ গল্পের কাহিনী ধরে বিশ্বায়নের সুর তুলে ধরাও একটি বিভ্রান্তির লক্ষণ, অর্থাৎ সারাবিশ্বে নারীশ্রমিকদের নিয়ে কি হচ্ছে তার সাথে তুলুনা করা। গল্পের কাহিনী যেহেতু বাংলাদেশের বর্তমান সময়কে চিহ্নিত করছে সেহেতু সময়টাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। সময়ের সঙ্গে গল্পের কাহিনীর সাংঘর্ষিক কিছু আছে কিনা সেটাও বিবেচনার বিষয়। কল্পকাহিনী দিয়ে গল্প হয়, তবে গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রি কোনো কল্পকাহিনী নয়। এখানে রক্তঝরা শ্রম দিয়ে যারা এই ইন্ডাস্ট্রিকে পৃথিবীর বুকে মাথাতুলে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে, তাদের প্রতি আমাদের সম্মানটা সেভাবেই দেওয়া উচিত, কোনো কল্পকাহিনী দিয়ে নয়। গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রি বাস্তব বিবর্জিত কিছু নয়। একে নিয়ে কল্পকাহিনী করতে হলে বাস্তবতার নিরিখেই করতে হবে। কল্পকাহিনী বলে মূল্যায়ন করাও ঠিক হবেনা। অতএব, গল্পটির সার্বিক মূল্যায়নে সাহিত্যের মান রক্ষা পাক এই প্রত্যাশা করি।

আঞ্জুমান রোজী

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com