গাঙ্গাটিয়া জমিদার বাড়ির আঙিনায়

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

হোমায়েদ ইসহাক মুন

জমিদার বাড়িতে প্রবেশের প্রধান ফটক

দেশে একসময় রাজা ছিল, তার রাজত্য ছিল, সিংহাসনও ছিল। কিন্তু এখন এর কিছুই নেই। তবুও গাঙ্গাটিয়া গ্রামের মানুষদের বিশ্বাস এ রাজ্যে একটি রাজ সিংহাসন আছে। আর তাতে কপালে দাগ নিয়ে জন্ম নেওয়া শিশুদের বসালে তা দূর হয়। এ সিংহাসনের গল্প শুনছিলাম গাঙ্গাটিয়া জমিদার বাড়ির উওরসূরি শ্রী তপন কুমার চক্রবর্তী চৌধুরির কাছ থেকে। তাদের এ জমিদার বাড়িতে সত্যিই এমন একটি চেয়ার আছে যা ব্রিটিশ সময়ের এবং তারা নিজেরাও এই চেয়ারটিকে বেশ সমীহ করে। দূর দূরান্ত থেকে নানা জন তাদের সস্তানদের নিয়ে আসেন এ পুণ্য চেয়ারে বসাতে। আমরা বেড়িয়ে বেড়ানোর দল বিটিইএফ (বাংলাদেশ ট্যুরিজম এক্রপানসন ফোরাম) সেই জমিদার বাড়ির প্রাঙ্গনেই বেশ কয়েক বছর আগে বাংলা নববর্ষের প্রথম প্রহর শুরু করি। তপন দাদা থেকে এ জমিদার বাড়ি সম্পর্কে আরো অনেক কিছু শোনার জন্য ধীরে ধীরে আগ্রহ বাড়তে থাকে। পহেলা বৈশাখের আগের রাতেই পৌঁছে যাই গাঙ্গাটিয়ায়। বৈশাখের এ আয়োজন হচ্ছে কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর উপজেলার গাঙ্গাটিয়ায় গ্রামে। আগের বছর গুলোতে আমরা পহেলা বৈশাখ উদযাপন করি মানিকগঞ্জের পারিল এবং টাঙ্গাইলের ভূয়াঁপুরে।
এ গ্রামে প্রবেশ করলে যে কারোরই মন ভালো হয়ে যাবে। গ্রামের বিস্তর প্রান্তর, গাছ-গাছালি, পুকুর, পাখির কলতান আর রাজবাড়ির সৌন্দর্য সবাইকে আকর্ষন করবে। জমিদার পরিবারে এককালে বউ হয়ে আসে গঙ্গাবতী। আর সেই গঙ্গাবতীর নামেই পরবর্তীতে এ গ্রামের নাম হয় গাঙ্গাটিয়া। তবে একসময় গ্রামটির নাম ছিল পুরাতন গাঙ্গাটিয়া। বয়ে চলা গকুল নদীতে যখন চর ভেসে উঠলো

জমিদার বাড়ি সংলগ্ন ডাকঘর

তখন আরো একটি গ্রাম তৈরি হলো যার নাম হলো চর গাঙ্গাটিয়া বা নতুন গাঙ্গাটিয়া। গ্রামের প্রবেশ মুখে ঢুকতে প্রকান্ড এক অশ্বত্থ বৃক্ষের দেখা মিলবে যেখান থেকে সরু পথটা ভাগ হয়েছে। সেখান থেকেই জমিদার বাড়ির মূল ফটক দেখা যায়। সামনে একটি প্রাচীন মন্দির আর বিশাল ঘাট বাঁধানো পুকুর। দূর থেকে বেশ লাগে দেখতে।
গ্রামে যখন পৌঁছাই তখন রাতের আকাশে লক্ষ তারা জ্বল জ্বল করছে। দূর থেকে কাছারি ঘরটাকেই রঙমহল মনে হলো। আলোকরাজি যেন সেই রঙমহলকে আরো জীবন্ত করে তুলেছে। বাড়ির আঙিনায় বিশাল বড় এক আম গাছ। সে গাছে আমগুলো যেন কেউ নিজ হাতে সাজিয়ে রেখেছে। আমাদের খাবারের জন্য বিশাল আয়োজন চলছে একটু দূরেই। জমিদার বাড়ির পাশের বড় মাঠ জুড়ে প্যান্ডেল তৈরি হয়েছে। গান গাইছে,বাদ্য বাজছে পহেলা বৈশাখকে বরণ করার জন্য। আয়োজনে ছিল জারিগান, মহিলা গীত, বলাই সঙ্গীত, কিচ্ছা, গ্রামীণ আরো অনেক কিছু। আমরা সবাই ফানুস উড়াতে মাঠে দৌড় দিলাম। এ গ্রামের মানুষ কখনো ফানুস দেখেনি। তাই সবারই একটু বাড়তি আকর্ষন ফানুসের উপর। মাইকে বার কয়েক ফানুষ উড়ানোর কথা ঘোষনা দিতেই দেখলাম দূর থেকে সবাই ছুটে আসছে। মাঠের মধ্যিখানে আগুনের কুন্ডলী বানানো হলো। এ

জমিদার বাড়ির এই কাছারি ঘরে রাতে থাকার ব্যাবস্থা হয়েছিল

কটা একটা করে ফানুসে আগুন ধরে আর সবাই আনন্দে চিৎকার করে ওঠে। জমিদার বাবুরাও আনন্দে শামিল হয়। উল্লাসে সবাই তালি দেই আর আকাশের দিকে চেয়ে থাকি, জীবনের বয়ে যাওয়া দিনগুলো যেন এমন আনন্দেরই হয়।
রাতে ঘুমের ব্যবস্থা করা হলো সেই কাছারি ঘরে। সে রাতে বেশ বৃষ্টি হলো। সামির, মনির, মাহি ভাইরা অনেক রাত পর্যন্ত কদম তলায় বসে ভিজেছে। কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম মনে নেই, সকালে উঠে এমন স্নিগ্ধ আকাশ দেখে মনটা ভরে গেল। শাহীন ভাই সহ হাটতে বের হলাম, বিশাল জায়গা জুড়ে এ জমিদার বাড়ি। অন্দর মহলে কারো প্রবেশ নিষেধ। প্রবেশ দ্বার থেকে বাড়ি পর্যন্ত রাস্তার পাশে লাগানো নানা জাতের ফল গাছের সারি। ফটকটাও বেশ কারুকাজ করা। তপন কুমারের ভাই মানব কুমার বললেন, তার বাবা ভূপথিনাথ চত্রবর্তী চৌধুরী ভালো আঁকিয়ে ছিলেন। ফটকের এবং বাড়ির অনেক কারুকাজ তিনি নিজেই করেছেন। ৭১-এ যখন পাকবাহিনীরা আসলো তখন জ্যেঠামশাই বললেন আমরা এ বাড়িঘর ছেড়ে কোথাও যাব না। বাবাও থেকে গেলেন। তারপর একদিন আক্রমন চালালো পাকবাহিনী আর বাবাকে ধরে নিয়ে গেল। আর ফিরে এল না, আমরা বাবাকে হারালাম।
মানব দাদার বয়স ৭৪ হয়েছে, তিনি নিঃসন্তান, জীবনের অভিজ্ঞতাও অনেক। হাটতে হাটতে শুনছিলাম আমি আর মনা ভাই। সেই ১৯০৪ সালে তাদেরই পূর্বপুরুষ দিলুনাথের নামে জমিদারি কেনা হয় ষোলআনা, দুইআনা, দুইকড়া, দুইক্রান্তি। তারা জমিদারি হারিয়েছে বহু বছর হয়ে গেছে তারপরও লোকে তাদের অনেক সমীহ করে, জমিদার বলে। এ গ্রামের মানুষদের জন্য তারা আমৃত্যু কছিু করতে চান।

পহেলা বৈশাখের প্রথম প্রহরে গ্রামের সকলের গ্রাম প্রদক্ষিণ

তিনি ঘুরে ঘুরে আমাদের ফিসারিজ দেখালেন। এদিকে পহেলা বৈশাখের র‌্যলি হবে তার আয়োজন করেছে এ গ্রামের দুটি স্কুল। আমারা ছুটলাম গোবিন্দপুর উচ্চবিদ্যালয়ে র‌্যালি ধরতে। গ্রামের সরু পথ ধরে সে র‌্যালি গিয়ে ঠেকেছে জমিদার বাড়ি পর্যন্ত। স্কুলের সবাই আনন্দে আটখানা হয়েছে, সঙ্গে আমরাও। হেটে সবাই পরিশ্রান্ত, বিশ্রাম নিয়ে আবার ‘যেমন খুশি তেমন সাজোরে’ স্কুলের ছেলেমেয়েরা অংশ নিয়েছে। জমিদার বাবুদের ফিশারিজের দিকে আবারো একটু ঢুঁ মারলাম। বেশ সুন্দর আর নিরিবিলি জায়গাটা। যে কারো দীর্ঘ সময় বসে থাকতে ইচ্ছে করবে। মাছ ধরতে শঙ্খ চিলেরা ওড়াউড়ি করছে, পহেলা বৈশাখে ঘুরতে আসা ছেলেমেয়েরা ঘুরে বেড়াচ্ছে, মুক্ত আকাশে আরো কত রকমের পাখি উড়ছে।
ফিরে এলাম জমিদার বাড়ির আঙ্গিনায়। দুপুরের খাবারের আয়োজন তখন শেষ। ডুবো তেলে ভাজা বড়

গ্রামীণ ঐতিহ্যের অংশ লাঠিখেলা হারিয়ে যেতে বসেছে

বড় তেলাপিয়া, কার্প মাছের ভূনা আর ডাল চর্চরি। আহা কি স্বাদ ছিল সেই তাজা মাছ ভাজির। বিকেলের আয়োজনে সবাই তৈরি হচ্ছে। লাঠি খেলা হবে। পহেলা বৈশাখের এ আয়োজন করতে বেশ আগে থেকে পরিশ্রম করে যাচ্ছে দলের বড় ভাইরা।
বিকেলে লোকে লোকারণ্য সেই মাঠ। সবার সঙ্গে বসলাম লাঠি খেলা দেখতে। দূরের গ্রাম থেকে লাঠিয়ালরা এসেছে খেলা দেখাতে। আস্তে আস্তে গ্রামীণ এসব খেলার প্রতি লোকেদের আকর্ষন কমে যাচ্ছে। তারপরও মেলা পার্বণে তারা আসে খেলা দেখায়, গ্রামীণ ঐতিহ্যকে ধারন করে। একের পর এক কসরত দেখিয়ে যাচ্ছে লাঠিয়ালরা। সবাই হাততালি দিয়ে তাদের আরো উৎসাহিত করছে। ছবি তুললাম, বাজারে মিঠাই মন্ডা খেলাম, মানুষের মেলা দেখলাম। সেদিন সায়াহ্নে আবারো ফানুস উড়ানো হলো। আচ্ছা তপন দাদার গানইতো শোনা হলো না। তিনি বেশ ভাল গান করেন। কিন্তু এখনতো গান গাওয়ার সময় নয়, অন্য কোনদিন এলে শোনাবো – বলনে তপন কুমার চক্রবর্তী চৌধুরি। রাত বাড়ছে,আমাদেরও যাবার সময় হয়ে গেল। তপন দাদার গান শুনতে এখানে তো আরেকবার আসতেই হবে। আকাশের দিকে তাকাই, ফানুসগুলো আমাদেরকে আশীর্বাদ করছে, তোদের মঙ্গল হোক।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: তপন দাদার গান শোনার সৌভাগ্য বুঝি আর কখনো হবে না। পহেলা বৈশাখের এ মেলা করার বেশ কিছুদিন পরেই তিনি পরলোক গমন করেন। তার আত্মা আনন্দচিত্তে ফানুশ হয়ে ওই নীল আকাশে তারাদের সঙ্গে ঘুরে বেড়াক এই কামনা করি।

 ছবি: লেখক

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com