গল্প – বোধন

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

স্মৃতি সাহা, নিউ ইয়র্ক থেকে

কাশের বন পার হয়ে যখন ময়না নবগঙ্গা নদীর তীর ঘেঁষে দাঁড়ায় তখন চারপাশে ঘুটঘুটে অন্ধকার। অমাবশ্যা কাটিয়ে যে একফালি চাঁদ আকাশে ,তার আলো ছড়াবার অক্ষমতা অবশ্য ময়নাকে খুব একটা বিচলিত করে না। অন্যদিন হলে এই অন্ধকার ময়নাকে গিলে খেতো। আশ্বিন মাসের শেষরাতের হাল্কা হিম বাতাসেও দরদর করে ঘামছে ময়না। সারাজীবন অন্ধকারের সাথে আড়ি থাকলেও আজ এই অন্ধকারটাকেই আঁকড়ে ধরতে চাইছে ও। অন্ধকারকে ভয় পেত বলে মা কত মজা করতো ময়নার সাথে! সূর্য ডুবলেই সেই যে মায়ের আচঁল ধরতো তা ছাড়তো মনে হয় পরদিন সূর্য উঁকি দিলে। ঘুমের মধ্যেও মা ওর হাত ছাড়াতে পারতো না! তাই মাঝেমধ্য মা মজা করে বলতো,” ও মনি, বড় হলে যখন শ্বশুরঘরে যাবে তখন তো তোমার সাথে আমি থাকবো নানে, তা তখন কি শ্বাশুড়ি মায়ের আচঁল ধরি থাকবা নে!” এই কথায় যেন মা কে হারিয়ে ফেলার কল্পিত ভয়ে আরোও আঁকড়ে ধরতো মা কে,ময়না। কিন্তু মা একদিন সত্যি সত্যি যে এই কল্পনাকে সত্য করে চলে যাবে ময়নাকে একা করে, তা বিশ্বাস করতে ময়নার অনেক সময় লেগেছিলো। টগর ফুলের মতো গায়ের রং দেখে ময়নার নানা মেয়ের নাম রেখেছিলো টগর। নামের সাথে মিলিয়েই যেন আস্তে আস্তে টগর হয়ে উঠতে থাকে টগর ফুলের মতোই লাবণ্যময়ী। আশেপাশের পাঁচগ্রামেও ছড়িয়ে পড়ে গরীব মজুরের ঘরের মেয়ের সেই লাবণ্যের গল্প। টগরের সেই সুবাসে মোহিত হয়ে বাচ্চু শেখ এক বিঘা জমি টগরের বাপ কে উপহার দিয়ে টগরকে বিয়ে করে আনে। বিয়ের দিনের গল্প মায়ের মুখে অনেকবার শুনেছে ময়না। “যেদিন তোমার বাপ আমারে পালকি করে নিয়ে আসলো সেদিন খুব দুর্যোগ ছিল রে, মনি। তুফান জানি আকাশ ভাঙতি ছিল!আর দুয়ারে পালকি নামাবার সাথি সাথি সেই দুর্যোগ যেন বাড়ির ভিতরেও শুরু হয়ে গেলো। মেম্বারের আগের দুই পক্ষ পারলি আমারে কাঁটি খায়! মেম্বার আমারে উঠোনে দাঁড় করায়ে রাখি দুই পক্ষকে নিয়ে মিমাংসা করতি ঘরে ঠুকলো। তুফানের হাওয়ায় একলা আমি মাটিত পইড়ে এইটুকুন বুঝলাম এখন থিকি মাটিই আমার আপন!” মাটিরে আপন ভাবা মা তাই বুঝি এত তাড়াতাড়ি মাটিতে মিশে গেলো। ময়নার তখন আট বছর বয়স। ততদিনে বাচ্চু মেম্বারের পক্ষ চার ছাড়িয়ে পাঁচ।ময়নার মেম্বার বাপের প্রথম পক্ষের সীমানায় ভুল করে ময়নার মায়ের মুরগীগুলো ঢুকে কিছু আনাজের গাছ নষ্ট করে। প্রথম পক্ষের নালিশে ময়নার মার টগর ফুলের মতো শরীরে অসংখ্য কালশিটে ফেলে দেয় বাচ্চু মেম্বার। সেদিনো এমন ঘুটঘুটে অন্ধকার ছিলো। ময়নার হাতও কিভাবে যেনো মায়ের আচঁল থেকে খসে গিয়েছিলো। বাড়ির পাশের আমগাছের সাথে মা কে ঝুলতে প্রথম দেখে অবশ্য ময়না-ই। সেই কালশিটে পড়া শরীর নিয়েই মা আস্তে আস্তে মাটির সাথে মিশে যায়। এরপর ময়না একাই বড় হতে থাকে । বাপ তার একবেলার খবর রেখেছে বলে ময়না মনে করতে পারে না। আর ময়নার সাথে বড় হতে থাকে বাচ্চু মেম্বারের পক্ষের সংখ্যা। আজ তা নয়ে গিয়ে দাড়িয়েছে। বয়সের ভার বাচ্চু মেম্বারকে কাহিল করছে অবিরত। টান ওঠা রোগে বছরভর ভোগে। তবুও পক্ষ বাড়ানো তে দমে না। আর প্রতিটা পক্ষের সময়ই বাচ্চু মেম্বার বেছে আনে সেই গ্রামের সবচেয়ে সুন্দর আর অল্পবয়সী মেয়ে। কোনো পক্ষ হয়তবা ময়নার থেকেও কম বয়সী। এই বাড়িতে আসার পর প্রথমে খুব ভয় আর জড়তায় আড়ষ্ট হয়ে থাকে মেয়েগুলো। কেউ কেউ তো আবার ময়নাকে ভুল করে বুবু ডেকে ফেলে। পরে অবশ্য বাচ্চু মেম্বারের শাষণে এক একজন বড় আম্মা আর মেজো আম্মার মতো যোগ্য ঘরণী হয়ে ওঠে বাচ্চু মেম্বারের। আর দু’একজন কিছু বুঝে ওঠার আগেই তিন চার বাচ্চার মা হয়ে যুঝতে থাকে পরিস্থিতির সাথে। বাচ্চু মেম্বারের নয় নম্বর পক্ষের সাথে ময়নার বেশ ভাব। একই বয়সী হবে বলে হয়ত। আর এই পক্ষটির উচিত কথা আর কাজগুলো যেন ময়নাকে আরোও ভরসা দেয়, আপন করে নেয়। বিয়ের পর একটা রাতও বাচ্চু মেম্বার এই পক্ষের ঘরে আসতে পারে নি। কখনো মুখের উপর দরজা বন্ধ করে দিয়ে আবার কখনো ময়নার ঘরে ঘুমিয়ে বাচ্চু মেম্বারকে সায়েস্তা করে এই পক্ষ। এই পক্ষই ময়নাকে শিখিয়েছে ভালবাসার মানুষ বলে নিজের কেউ থাকে। যে মানুষটি সমাজ মানে না, নিষেধ মানে না, বাঁধায় হারে না। এমন একটি মানুষ অপেক্ষায় আছে মেয়েটির সেই ঝিনাই বিলের পাশে। সুযোগ পেলেই মেয়েটিকে নিয়ে ডিঙ্গিতে করে জল কেটে দেশান্তর হবে। মাঝরাতে প্রায় ঘুম ভেঙে যায় ময়নার, মেয়েটির কান্নার শব্দে। মেয়েটি কাঁদে, হু হু করে কাঁদে সেই নিজের মানুষটির জন্য। ময়নাও কাঁদতে চায় এভাবে নিজের মানুষের জন্য, ময়নাও হতে চায় ডিঙ্গি ভাসিয়ে তেপান্তর!! নয় নম্বর পক্ষের সাথে জুত করতে না পেরে বাচ্চু মেম্বার খুঁজতে থাকে আরেক পক্ষ। কয়দিন হলো চোখ পড়েছে ময়নার বান্ধবী সাথীর উপর। হিন্দু হরিজন ঘরের মেয়ে সাথী। খুব গরীব। বাপ জুতা সেলাই করে সংসার চালায়। সাথী বাচ্চু মেম্বারের নয় নম্বর পক্ষের ঘরেই কাজ করে । সেখান থেকেই ময়নার সাথে সই পেতেছে। খুব ভাব সাথীর সাথে ময়নার। বৈশাখ মাসের দুপুরে আম, কাঁঠালের কয়রা তেতুল দিয়ে মেখে পিছন আঙ্গিনায় বসে জিহ্বায় টাস টাস শব্দ করে খায় ময়না আর সাথী।

আবার মাঘ মাসের ভোরে খেজুর গাছে বাঁধা হাড়ি থেকে রস চুরি করে এনে ময়নাকে দেয় সাথী। আর ময়না মায়ের কিনে দেওয়া কিছু লাল-নীল চুড়ি আর পুতির মালা সাথীকে পড়িয়ে ওর চোখের ঝিলিক দেখতো। আর সেই ঝিলিক ময়নার কাছে মনে হতো জীবনের একমাত্র তরঙ্গ!! তবে সাথীর জীবন তরঙ্গ অবশ্য পলাশ দাদা। সারাদিন কারখানায় জুতা সেলাই করে পলাশ দা সাথীর জন্য এনে দেয় চালতার আচার। রথের মেলায় কিনে দেয় পাপড় আর কদমা। আবার পূজার সময় শহর থেকে গন্ধ সাবান, স্নো। পলাশ দাদাও সাথীকে নিয়ে দেশান্তর হবার স্বপ্ন দেখিয়েছে। তাই আজ বাচ্চু মেম্বার যখন সাথীর বাপের হাতে টাকা গুঁজছিলো তখন ময়না আর সহ্য করতে পারে নি। ময়নার জীবনের একমাত্র তরঙ্গ যখন বাচ্চু মেম্বারের লালসায় নিস্তরঙ্গ হতে যাচ্ছে তখন হিংস্র হয়ে ওঠে ময়না। সাথীর দেশান্তর হবার স্বপ্নে বাচ্চু মেম্বারের লালসার ছায়া ময়নাকে অস্থির করে তোলে। রাতভর সাথীর কান্নার কল্পিত আওয়াজ ময়নাকে সব শেষ করে দেবার সাহস যোগায়! ওঁত পেতেছিলো ময়না,রাতের অন্ধকার ঘন হতেই বাপের ঘরে যায়। বাপ সারাক্ষন কাশতে থাকে তাই সব পক্ষই রাতের বেলা তাকে দুরে রাখে। বাপরে একা পেয়ে এক কোপে সব শেষ করে। ময়না শেষ করে নিজের মানুষকে দূরে রাখা কিছু মানুষের কষ্ট, ময়না শেষ করে কৈশোরের উচ্ছ্বলতা হারানো মেয়েগুলির কষ্ট। আর কোনো টগরের শুভ্রতায় কালশিটে ফেলতে পারবে না বাচ্চু মেম্বার। বঁটির গায়ে লেগে থাকা রক্ত শরীরে লাগলে ঘৃণার বমি আসে ময়নার। তাই নবগঙ্গায় এসেছে ময়না। রক্ত ধুতে,যখন জলে নামছে ময়না তখন বামন বাড়ির মন্দিরে বোধনের ঢাক বাজছে।

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com