গল্পটা বাপজানের বায়োস্কোপের…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ফয়েজ আহমেদ: ‘বাপজানের বায়োস্কোপ’ নিয়ে ঢালিউডের বাজারে কম নাটকীয়তা হলো না। মুক্তির প্রথমদিনেই হল থেকে সড়িয়ে দেয়া হয় ছবিটি, রাতের অন্ধকারে সব পোস্টার তুলে ফেলা হয়। বড় কষ্টের, বড় আদরের ছবিটি নিয়ে পরিচালক রিয়াজুল রিজু ঘুরেছেন শহরে শহরে। বারবার বলতে চেয়েছেন, ‘বাপজানের বায়োস্কোপ’ ৫২ আর ৭১ এর উপগাঁথা। বলতে চেয়েছেন ‘বাপজানের বায়োস্কোপ’ বন্দুক-গুলি-ধর্ষণ ছাড়াই মুক্তিযুদ্ধের প্রতিচ্ছবি।
তার পর কেটে গেল বহুদিন। মুক্তির দিন থেকে ১ বছর ৫ মাস পর। টাঙ্গাইল যাচ্ছেন স্ত্রী-সন্তানের সঙ্গে দেখা করতে।তখনই খবরটা পলেনে। খবরটা যখন শুনলেন তখন তার গাড়িটি আশুলিয়া পার হচ্ছেিলা। কেউ একজন মুঠোফোনে বললেন, ‘রিজু, সব পুরস্কার তো তুমি একাই নিয়ে নিলে। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের মোট ৯ টি পেয়েছে বাপজানের বায়োস্কোপ।’ রিজুর বিশ^াস হচ্ছে না, চুপ করে বসে রইলনে। একেক করে কল আসতে লাগল সাংবাদিক, শুভাক্সক্ষী, আপনজনের। রিজুর আকাশ সমান ভাবনা মাথায় ঘুরছে। ভাবতে থাকেন; বায়োস্কোপের যুদ্ধ, জীবনের যুদ্ধ কত কী! এই সিনেমার জন্য টিভি চ্যানেলের চাকরি ছেড়ে দিতে হয়েছে, স্ত্রী-সন্তানকে ঢাকা ছেড়ে টাঙ্গাইলে থাকতে হচ্ছে। বায়োস্কোপের যুদ্ধে শেষ পর্যন্ত জয়ীই হলেন রিজু।
নির্মাণের শুরুর গল্পটা জানতে চাইলে রিজু বলেন, আমি তখন এসএ টিভিতে ‘চারপাশ’ নামের নিয়মিত একটি অনুষ্ঠান নির্মাণ করি। সেখানে একটি পর্ব করি একজন বায়োস্কোপওলাকে নিয়ে। যেহেতু আমার পূর্বপুরুষের বাড়ি চরে। রক্তের একটা টান ঘুরেফিরে সেখানে নিয়েই যায়। বায়োস্কোপওলার সঙ্গে সঙ্গে ঘোরাঘুর,ি নদীর মাছ ধরে দুপুরের খাবার খাওয়া। নদী-চর-বালি, চরে মানুষ এসব নিয়েই ভাবতে থাকি। এ ভাবনা থেকেই সিনেমা বানানো। তবে ভাবনার সঙ্গে শক্তিশালী মুক্তিযুদ্ধের বিষয়টি যোগ করেন চিত্রনাট্য রচিয়তা মাসুম রেজা। তিনি যখন আমাকে স্কিপ্টটা দেখান আমি অভিভূত হয়ে যাই। প্রত্যাশার চেয়ে বেশি কিছু পেয়েছি মাসুম ভাইয়ের কাছে। এরপর শুটিংয়ের জন্য সিরাজগঞ্জের এনায়াতপুরের নাঙলমোড়ার চরে গিয়ে ঘরবাড়ি তৈরি করতে হয়েছে। এরমধ্যে অনেক প্রযোজকের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা কেউ আমার সিনেমায় ইনভস্টে করতে রাজি হয়নি। দেড়শ’ জনের টিম নিয়ে চরে যখন শুটিং করি তখন আমার কাছে ছিল মাত্র ষাট হাজার টাকা। একদিন পরেই টাকা শেষ হয়ে যায়। আমি চরে বসেই আমার যে নির্বাহী প্রযোজক এমএ হোসেন মঞ্জু, ওনাকে কল দেই। এছাড়া আমার এক চাচা আছেন আনোয়ার হোসেন, ওনাকেও কল দেই। মঞ্জু ভাইকে বললাম, আমি একটি সিনেমা বানাতে আসছি এখন আমার এ অবস্থা। তিনি বললেন, তুমি কাজ চালিয়ে যাও আমি পাশে আছি। একই ভাবে চাচাও তাই বললেন। এর পর আস্তে আস্তে কাজ চলতে থাকে। টেকনিশিয়ানরা আমার পূর্বপরিচিত হওয়ায় টিমওয়ার্কটা খুব ভালো হয়েছে। এত অভাব-অনটনের মধ্যেও তারা স্বাছন্দ্যে কাজ করেছেন। আমার ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে এদের সঙ্গে কাজ করেছি, নাটক বানিয়েছি। এরা আমার বন্ধু, বড় ভাই, কাছের মানুষ। এদের একটা বিশ্বাস, ভালোবাসা ছিল বলেই কাজটি করতে পেরেছি। আমরা অনেক কষ্ট করেছি। আমরা একদিন শুটিং শেষে এক চর থেকে আরে চরে আসার সময় ধুলো ঝড়ের মধ্যে পড়ি। ওই ঝড়েই কিন্তু যমুনা সেতুর ওপর থেকে ট্রেন পড়ে যায়। ঝড়ে আমাদের সব খাবার নষ্ট করে দেয়, উড়িয়ে নিয়ে যায়। আমরা সারা রাত না খেয়ে কাটিয়েছি। এমন অনেক কষ্ট আমরা করেছি। ছবি নির্মাণ হলো। এর পর মুক্তি নিয়ে শুরু হলো কঠিন বাস্তবতার। সে সব কথা নাই বলি।
কেন মুক্তির প্রথম দিনেই ছবিটি হল থেকে সরিয়ে নেয়া হলো জানতে চাইল,েরিজু বললেন, যারা হল থেকে সিনেমাটি সরিয়ে নিয়েছেন তারাই বলতে পারবেন কেন এ কাজটি করেছেন। আমি শুধু একান্ত আমার ধারণা থেকে দুটি কারণ বলতে পারব তবে এ দুটি কারণই সত্যি তা নাও হতে পারে। কারুকাজ ফিল্ম থেকে ছবি নির্মিত হয়েছে। কারুকাজ এটি সমবায় সমিতির মতো। বড় বড় প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলো হয়ত চায়নি আমরা ভালো কিছু করি। আরেকটি কারণ, দেশবিরোধী অপশক্তিদের হয়তো ভালো লাগেনি। এরপর ছবিটি নিয়ে আমি বিকল্পভাবে বিভিন্ন জেলার শিল্পকলা একাডেমিতে, বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রদর্শন করি। তবে তা থেকে খুব একটা অর্থ সংগ্রহ করতে পারিনি।
জানতে চাই নতুন ছবি নির্মাণ নিয়ে ভাবছেন কি-না? বলনে, হ্যাঁ। আমার নতুন ছবির নাম ‘প্রেমের কবিতা’। সিনেমাটি কেমন হবে, জানতে চাইলে বলবো- আমি আমার মতো করে সিনেমা বানাবো। আমি আর্টস-কমার্স বুঝি না। আমি সিনেমা বুঝি। আমি সিনেমা ভালোবাসি। ‘প্রেমের কবিতা’য় যারা অভিনয় করবেন তারা সবাই নতুন অভিনয়শিল্পী। শুধু সঙ্গীতায়োজনের টিমটাতে পুরনো শিল্পী থাকবেন। চিত্রনাট্যের কাজ চলছে, পাশাপাশি অভিনয় শিল্পী খুঁজছি। সেপ্টেম্বর- অক্টোম্বরের মধ্যে শুটিং শুরু হবে।

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com