গর্ভবতী মায়েরা শুনুন…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ডা. মিজানুর রহমান কল্লোল

একজন গর্ভবতী মায়ের গর্ভকালীন সময় সুস্থভাবে অতিবাহিত হওয়া এবং সেই সুস্থ প্রসূতি থেকে সুস্থ শিশুর জন্ম লাভকরা খুবই জরুরি ও অত্যাবশ্যক বিষয়। এই পুরোকাজ সম্পন্ন করার জন্য আমাদের সমাজের প্রত্যেক মানুষের, প্রত্যেকটি গর্ভবতী মায়ের প্রতি নৈতিক দায়িত্ব রয়েছে। মায়েদের এ সময় একটা নির্দিষ্ট ও সতর্ক নিয়মনীতির মধ্য দিয়ে চলতে হয়। নতুবা যে কোনো সমস্যা জরুরিভাবে যেকোনো সময় উপস্থিত হতে পারে। তাই এই প্রসূতি মায়েদের প্রতি রয়েছে বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কিত উপদেশ।

খাবার দাবার সম্পর্কিত
গর্ভকালীন সময়ে দেহে অতিরিক্ত ক্যালরির প্রয়োজন হয়। তাই এ সময় মায়েদের স্বাভাবিকের তুলনায় পরিমাণে বেশি খেতে হবে। একজন স্বাস্থ্যবতী মায়ের গর্ভকালীন সময়ে ওজন ৮ থেকে ১২ কেজি পর্যন্ত বাড়তে পারে। কিন্তু আমাদের দেশে এই ওজন বাড়ার পরিমাণ গড়ে ৬.৫ কেজি। এ সময়কার খাবার হতে হবে সহজপাচ্য কিন্তু পুষ্টিকর। যেমন প্রচুর শাকসবজি, ফলমূল, আয়রন ও ভিটামিন সমৃদ্ধ খাবার। আঁশ জাতীয় খাবার, মাছ ইত্যাদি। প্রয়োজন হলে একবারে বেশি খেতে না পারলে বারবার খাবে। প্রচুর পানি খাবে।
নিজস্ব স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কিত
* নিজের পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা
এটাকে অভ্যাসে পরিণত করতে হবে। প্রতিদিন পরিচ্ছন্ন গোসল, পরিষ্কার কাপড়চোপড় পরতে হবে। মাথার চুল পরিষ্কার, শুকনা ও শক্ত করে বেঁধে রাখতে হবে। নিজের ব্যবহৃত বিছানা ও অন্যান্য সামগ্রী পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।
* বিশ্রাম ও ঘুম
রাতে কমপক্ষে আট ঘণ্টা ভালো ঘুমাতে হবে এবং দুপুরের খাবারের পর অন্তত দুই ঘণ্টা বিশ্রাম নিতে হবে।
* কোষ্ঠ্যকাঠিন্য
সব সময় কোষ্ঠকাঠিন্য পরিহার করতে হবে। সেজন্য আঁশযুক্ত খাবার (যেমন-শাকসবজি)ও বেশি পরিমাণ পানি পান করতে হবে।
* ব্যায়াম
ঘরের হালকা কাজকর্ম করতে পারবে তবে গর্ভকালীন সময়ের শেষের দিকে শারীরিক পরিশ্রম শিশুকে প্রভাবিত করতে পারে।
* অ্যালকোহল ও ধূমপান
যেসব মহিলা ধূমপায়ী তাদের গর্ভকালীন সময়ে ধূমপান সম্পূর্ণভাবে ত্যাগ করতে হবে। তা না হলো কম ওজনের শিশু প্রসব বা বিকলঙ্গে শিশু প্রসব বা শিশু জরায়ুর মধ্যে মারা যেতে পারে। আবার যেসব মহিলা অ্যালকোহল পান করেন তাদের এটা পান থেকে বিরত থাকতে হবে।
*   দাঁতের পরিচ্ছন্নতা
প্রসূতিকে দিনে দুবার ভালো করে দাঁত ব্রাশ করতে হবে ও মুখ পরিষ্কার রাখতে হবে।
*  যৌন মিলন
গর্ভকালীন সময়ে যৌনসঙ্গম না করলে ভালো, তবে প্রথম ও শেষ তিন মাস অবশ্যই বিরত থাকতে হবে।
* ওষুধপত্র সম্পর্কিত
আমরা অনেক ক্ষেত্রেই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অনেক ওষুধ খাই কিন্তু গর্ভবতী মহিলাদের ক্ষেত্রে এ রকম কিছু করলে অনেক বিশাল সমস্যা হতে পারে। অনেক ওষুধ আছে যা প্রসূতি সেবন করলে শিশুর বৃদ্ধি ব্যাহত বা মৃত্যু বা গর্ভপাত পর্যন্ত হয়ে মায়ের জীবন সংশয় হতে পারে, তাই কোনো সমস্যা হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবন করতে হবে। নিজের সিদ্ধান্তে নয়।

শিশুর যত্ন ও মানসিক প্রস্তুতি
কিছু দিন পরেই মায়ের কোলে শিশু আসবে। সেজন্য প্রসূতিকে (বিশেষ করে প্রথমবার গর্ভবতী) মানসিক দিক থেকে প্রস্তুত থাকতে হবে। তা ছাড়াও শিশুর যতœ, দুধ খাওয়ানো, পরিচ্ছন্নতা ইত্যাদি সম্পর্কে নিজেকে গড়ে তুলতে হবে। তবে এ বিষয়ে নিকটস্থ পরিবার কল্যাণ ক্লিনিকগুলো আপনাকে সাহায্য করবে।
সতর্কতামূলক সঙ্কেত
পুরো গর্ভকালীন সময়ে প্রসূতিকে শারীরিক অসুস্থতা বা খারাপ লাগা বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। এ জাতীয় কোনো সমস্যা বোধ করলে সঙ্গে সঙ্গে নিকটজনকে জানাতে হবে এবং প্রয়োজনে চিকিৎসক বা নিকটস্থ মাতৃমঙ্গল কেন্দ্রে যোগাযোগ করতে হবে। মনে রাখতে হবে এ সমস্যাগুলো অনেক বড় হয়ে নিজের এবং শিশুর জন্য জীবনমৃত্যুর ঝুঁকিও হতে পারে। এ ধরনের বিষয়গুলো যেমন-
* গর্ভকালীন সময়ের প্রথম দিকে খুব বেশি বমি হলে এবং এতে খাওয়া দাওয়া বন্ধ হয়ে গেলে।
* প্রচণ্ড জ্বর।
-* প্রচণ্ড মাথাব্যথা।
*চোখে ঝাপসা দেখা।
* পা অস্বাভাবিকভাবে বেশি ফুলে গেলে।
* হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে যাওয়া।
* যোনিপথ দিয়ে রক্ত  বা অন্য কিছু নিঃসরণ হওয়া, যা স্বাভাবিক বলে মনে হয় না।
* হঠাৎ শিশুর নড়াচড়া বন্ধ হয়ে গেলে।
* প্রস্রাবে জ্বালাপোড়াসহ তলপেটে ব্যথা হলে।
* প্রসব ব্যথা শুরু হওয়ার পর ১২ ঘণ্টার বেশি অতিক্রম সত্ত্বেও শিশু প্রসব না হওয়া।
* প্রসবের নির্ধারিত তারিখ থেকে ১৪ দিনের বেশি সময় চলে গেলেও প্রসব ব্যথা না হওয়া।
তা ছাড়াও কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রসূতিকে বলা হয় ঝুঁকিপূর্ণ মা। সে ক্ষেত্রে আরো বেশি করে প্রসূতিকে এবং স্বজনদের সতর্ক থাকতে হবে। যেমন,
* ৩০ বছর বা তার অধিক বয়সে প্রথম গর্ভবতী হওয়া।
* প্রসূতি লম্বায় ১৪০ সে.মি. বা তার নিচে হলে।
* জরায়ুর মধ্যে শিশুর অবস্থান ভালো না থাকলে, যা আলট্রাসনোগ্রাফির মাধ্যমে দেখা হয়।
* প্রচণ্ড রক্তশূন্যতায় আক্রান্ত প্রসূতি।
* গর্ভে যমজ শিশু এবং অ্যামনিউটিক ফ্লুইড কম বা বেশি থাকলে।
* পূর্বের গর্ভধারণের সময় প্রসব পূর্ববর্তী রক্তপাত বা এন্টিপারটাম হেমোরেজ, গর্ভপাত, মৃত শিশুর জন্ম, বিকলাঙ্গ শিশুর জন্ম, সিজারিয়ান ডেলিভারি, একলাম্পশিয়া, প্রসবের পরে বেশি রক্তপাত ইত্যাদি।
* গর্ভস্থ ফুল বা প্লামেন্টা সঠিক জায়গায় না থাকলে যেমন- প্লাসেন্টা প্রিভিয়া।
গর্ভবতী মায়ের হৃৎপিণ্ডের রোগ (উচ্চরক্তচাপ), ডায়াবেটিস, যক্ষ্মা, হেপাটাইটিস, সিফিলিস, কিডনি রোগ ইত্যাদি থাকলে।
মনে রাখতে হবে, মা যখন গর্ভবতী থাকেন তখন হঠাৎ করে যেকোনো জরুরি পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়া লাগতে পারে। তাই উচিত গর্ভকালীন সময়ে চিকিৎসকের বা স্বাস্থ্যকর্মীর উপদেশ অনুযায়ী চলা এবং যেকোনো প্রকার অসুবিধাতে তাদের সাহায্য নেয়া। আমাদের লক্ষ্য সুস্থ মায়ের সুস্থ শিশু এবং তা হবে ঝঞ্ঝাটহীন গর্ভকালীন সময় শেষে সুস্থ প্রসবের মাধ্যমে।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, অর্থোপেডিকস ও ট্রমাটোলজি বিভাগ, ঢাকা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল।চেম্বার : পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার লিঃ, ২ ইংলিশ রোড, ঢাকা।

ছবি: জয় শাহরিয়ার সৌজন্যে

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com