খটাশ খটাশ…টাইপরাইটার

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ইরাজ আহমেদ

বৃষ্টি নামে কেরানীর টাইপরাইটারে…প্রয়াত কবি আবিদ আজাদ তার কবিতায় লিখেছিলেন। টাইপরাইটার নামের এই যন্ত্রটির সঙ্গে নানা কারণেই জড়িয়ে আছে অফিস আর কাজের আবহ। প্রথম একেবারে হাতের কাছে টাইপরাইটার দেখি ১৯৭০ সালে। হাতের কাছে দেখা মানে কাগজে লিখে দেখা। তখন অবশ্য একেবারেই স্কুলের বালক আমি। এরপর টাইপরাইটারের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ রাস্তায়। প্রেসক্লাবের উল্টোদিকে কয়েকজন মানুষকে দেখা যেতো বেশ বড় আকৃতির যন্ত্রটির সামনে বসে খটাশ খটাশ শব্দ তুলে টাইপ করে যেতে। একটা সময়ে প্রায় সব অফিসেই টাইপিস্ট নামে একটি পদ ছিলো। তাদেরকে বলা হতো স্টেনো টাইপিস্ট। তখন ঢাকা শহরে অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে মেয়েদের টাইপিস্ট হিসেবে কাজ করতে দেখা যেতো। তাদের বেশভূষা আর মুখশ্রীতে আলাদা চটক থাকতো। এই মহিলা টাইপিস্ট আমাদের সাহিত্যে বহু গল্পের চরিত্রও হয়ে উঠেছিল।  আমার পিতা সাংবাদিকতার প্রশিক্ষণ নিতে ৭০ সালে লন্ডনে যান। দেশে ফেরার সময় সঙ্গে নিয়ে আসেন একটি টাইপরাইটার। জাপানের অলিম্পিয়া কোম্পানীর তৈরী করে অব্যবহৃত সেই যন্ত্রটি আজো আমাদের বাড়িতে রয়ে গেছে।টাইপরাইটারটি ব্যবহার করার গভীর লোভ ছোটেবেলা থেকেই মনের মধ্যে ছিলো। বহু দুপুরে টাইপরাইটারে কাগজ লাগিয়ে ইচ্ছে মতো টাইপ করে গেছি উল্টোপাল্টা।সেই দুপুরগুলো স্মৃতির মধ্যে রয়ে গেছে ডালপালা বিস্তার করে।

টাইপরাইটারকে এখন এই শহরে একটি মৃত অধ্যায় বললে ভুল বলা হবে না। দলিল লেখালেখির কাজ ছাড়া টাইপরাইটের ব্যবহার আর কোথাও নেই বললেই চলে। অধ্যায় বললাম এইজন্য যে, টাইপরাইটারের সঙ্গে কালি, রিবন, কার্বন পেপার আর বহু মানুষের গল্প জড়িয়ে আছে।কৈশোরে পিতার সাংবাদিকতা পেশার সূত্র ধরে ঢাকার দু একটি ইংরেজি দৈনিক কাগজের অফিসে টাইপরাইটার ব্যবহার হতে দেখেছি। বাবা বাড়িতে বসে সেই অলিম্পিয়া কোম্পানীর টাইপরাইটারে খট খট শব্দ তুলে পত্রিকার লেখা লিখতেন। সেসব দেখে আমারও টাইপরাইটারে লেখালেখি করার আগ্রহ তৈরী হয়েছিল। কিন্তু সুযোগটা আর পাওয়া হয়নি। কম্পিউটারের আগ্রাসনে এই শহর থেকে টাইপরাইটার পিছু হটে গেলো।

একদা হাইকোর্টের সামনে সার বেঁধে টাইপটিস্টদের বসে থাকতে দেখা যেতো। দেখা যেতো লুপ্ত দৈনিক বাংলা ভবনের ধার ঘেঁষে বিশাল রাস্তার পাশে তাদের কাজ করতে। পুরনো ঢাকায় কোর্ট ভবনের আশপাশেও দেখা মিলতো তাদের। মানুষের কত যে প্রয়োজনীয় দরখাস্ত, চাকরির চিঠি আর দলিল পারিশ্রমিকের বিনিময়ে লেখা হতো সেখানে। ছোট্ট্ কাঠের টেবিলের ওপর টাইপরাইটার মেশিন, পাশে কাগজের প্যাকেট, হোয়াইট ফ্লুইড, কার্বন পেপার আর কত কী সরঞ্জাম যে থাকতো সেই টাইপিস্টদের কাছে!

টাইপরাইটারের সঙ্গে এক সময় মতিঝিলের গভীর যোগাযোগ ছিল। মতিঝিল কথাটা কানে এলেই কিছু কিছু দৃশ্যের সঙ্গে টাইপরাইটার যন্ত্রটা চোখের সামনে ভেসে উঠতো। আশির দশকের মাঝামাছি সময় থেকে মতিঝিলে গজিয়ে উঠেছিল অসংখ্য অনুবাদ কেন্দ্র। সেইসব কেন্দ্রের সঙ্গেই একাধিক মানুষকে বসে থাকতে দেখা যেতো টাইপরাইটার নিয়ে।

সময় আর যান্ত্রিক অগ্রগতি এভাবে অনেক কিছুকেই পেছনে ফেলে দেবে সেটই স্বাভাবিক। এক যন্ত্রের স্থান দখল করবে অন্য যন্ত্র। কিন্তু আমি মাঝে মাঝে ভাবি সেই মানুষেরা কোথায় গেলো? ভাবি সেই বৃদ্ধের কথা। সাংবাদিকতা করতে গিয়ে পরিচয় হয়েছিল প্রেসক্লাবের সামনে সেই নাম ভুলে যাওয়া মানুষটি গভীর মনযোগে টাইপ করে যেতেন। যতদূর মনে পড়ে ঢাকায় এসেছিলেন ফরিদপুর থেকে। ছয় জন মানুষের সংসার চলতো ওই টাইপরাইটার মেশিনের ওপর ভর করে।

আমার খুব মনে পড়ে সেই তরুণের কথা যে বলেছিল সারাদিন টাইপ করে মেসে ফিরে গরম পানিতে হাতের আঙুল ডুবিয়ে রাখতে হতো ব্যথা কমানোর জন্য। এই শহরে বসে দিনমান টাইপ করে তাকে গ্রামে টাকা পাঠাতে হতো।

নানা ধরণের টাইপরাইটার ছিল এই শহরে। কিছু টাইপরাইটার ছিল বিশালাকৃতির। সচিবালয়ে ঢুকলে দেখা যেতো এই টাইপরাইটারগুলো টেবিলে টেবিলে বসানো। ঘর জুড়ে খুট খুট, খটাশ খটাশ শব্দ। সবাই একমনে টাইপ করে চলছে। আমি শব্দটা আজো কান পাতলে যেন শুনতে পাই। আবিদ আজাদের কবিতার মতো।

ছবিঃ প্রাণের বাংলা

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com