কৌশানি ভ্রমণ …

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

দীপারুণ ভট্টাচার্য্য

এক.

“কৌশানি” জায়গাটা ভ্রমণ পিপাসু বাঙালিদের কাছে খুবই জনপ্রিয়। এখানকার সিংহভাগ টুরিস্টই বাঙালি। একটা ছোট্ট গল্প দিয়ে লেখাটা শুরু করছি। ২০১১ সালের এপ্রিল মাসের শেষের দিকে আমরা প্রথম কৌশনিতে আসি। তখন প্রায় সব হোটেলই খালি। পথে ঘাটেও মানুষ জনের দেখা নেই। চায়ের দোকান গুলো খাঁ খাঁ করছে। বুঝতে পারছিলাম না একটা পাহাড়ি শহরে এপ্রিল মাসে কেন একেবারেই লোকজন নেই। এক চায়ের দোকানিকে প্রশ্ন করলাম, এখন কি সিজিন নয় কৌশনিতে? সে বলল, এখানে সারাবছরই লোক আসেন। আরও অবাক হলাম, তবে এখন লোক নেই কেন? ফুটন্ত জলে চায়ের পাতা দিতে দিতে লোকটি বলল, ‘বাঙাল মে চুনাও হ্যায় কেয়া’? (পশ্চিমবঙ্গে কি নির্বাচন চলছে?)।

কোলকাতা থেকে ‘বাগ এক্সপ্রেস’-এ চেপে মানুষ আসেন কাঠগুদাম বা হালদুয়ানী। সেখান থেকে ভাড়ার গাড়ি নিয়ে আলমোড়া হয়ে কৌশানি পৌঁছাতে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা সময় লাগে। ছোট বড় মিলিয়ে প্রচুর হোটেল রয়েছে এই কৌশনিতে। প্রায় সব হোটেলেই পাওয়া যায় ডাল ও আলুপোস্ত।

সেবার আমরা দিল্লি থেকে রানিক্ষেত এক্সপ্রেসে এসেছিলাম। আর এবার গাড়ি চালিয়ে। রাত একটার সময় গাড়ি নিয়ে যখন বেরোচ্ছি তখন অষ্টমী পড়ে গেছে। আমি ও মলয়দা ভাগাভাগি করে চালিয়ে, চা-কফি ও প্রাতরাশের বিরতি নিতে নিতে কৌশানি পৌঁছালাম প্রায় বেলা বারোটায়। দিল্লিতে একঘন্টার উপর আটকে ছিলাম বিচ্ছিরি যানজটে।

গান্ধী আশ্রম

কৌশনির উল্লেখযোগ্য আকর্ষণ গান্ধী আশ্রম। সেই মহান মানুষটি ১৯২৯ সালে এসে কৌশনিতে ছিলেন দুই সপ্তাহ। এই সময়ে তিনি অনুশীলন করেন “অনাশক্তি যোগ”। এই আশ্রমের নাম তাই রাখা হয়েছে “অনাশক্তি আশ্রম”। পরবর্তী কালে মহাত্মা গান্ধী তার লেখার মধ্যে কৌশনির কথা উল্লেখ করেছেন। এই জায়গার সৌন্দর্য বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি কৌশনিকে, “Switzerland of India” বলেছেন। ঘুরতে আসা মানুষদের জন্য আশ্রমে সামান্য খরচে থাকা খাওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে । গতবার আমরা এখানেই ছিলাম। আশ্রমের সকলকে প্রার্থণায় যোগ দেওয়া বাধ্যতামূলক। আমার অবশ্য ওই সুন্দর প্রার্থণাকক্ষে একা একা বসে থাকতেই বেশি ভালো লেগেছিলো। ভালো লেগেছিলো রবীন্দ্রনাথের গান গুনগুন করতে।

বৈজনাথ বা বৈদ্যনাথ (Baijnath/ Vidyanath)

কৌশানি থেকে মাত্র ১৭ কিমি দূরে গোমতী নদীর তীরে বৈজনাথ এক উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থান। অঞ্চলটি বাগেশ্বর জিলার অংশ। এই অঞ্চলের পুরনো নাম কার্ভিপুর (Karvirpur/ karbirpur)। অঞ্চলটি ছিল কাত্যুরি (Katyuri) বংশের রাজা নরসিংহ দেও এর রাজধানী। কাত্যুরি বংশের রাজারা ৭ম থেকে ১৩য় শতাব্দী পর্যন্ত রাজত্ব করেন। তাদের রাজত্ব ছিলো উত্তরাঞ্চলের গাড়য়াল-কুমায়ুন এবং নেপালের দোটি অঞ্চল জুড়ে। কাত্যুরি বংশের রাজারা ছিলেন শিবের উপাসক। ৯ম থেকে ১২য় শতাব্দীর মধ্যে কোন এক সময়ে তারা নির্মাণ করেন এই বৈদ্যনাথ মন্দির। মন্দির প্রাঙ্গনে প্রায় ১২-১৩টি ছোট বড় মন্দির রয়েছে। শিব সহ এখানে রয়েছেন পার্বতী, গণেশ অন্য হিন্দু দেবদেবী।
বর্তমানে মন্দিরটি রয়েছে Archaeological Survey of India এর অধীনে।

পাশের গোমতী নদীতে বাঁধ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে এক বিশাল জলাধার। এই জলাধার থেকেই আশেপাশের অঞ্চলে খাবার ও চাষের জল সরবরাহের ব্যবস্থা হয়েছে। মন্দিরের সামনের এই বিশাল জলাধারের জলে মেঘের প্রতিছবি তৈরি করে এক চমৎকার পরিবেশ। জলে খেলা করছে হাজার হাজার মাছ। খানিকটা মুড়ি ছড়িয়ে দিলে মাছেরা লাফালাফি করে খেতে থাকে। মুড়ি বিক্রেতা বংশীলাল বলল, ২০১৫ সালে বরফ পড়ে সব মাছ মারা গিয়েছিলো। সম্প্রতি আবার ছাড়া হয়েছে মাছের চারা।

তখন গোমতীর কলকল শব্দ, মন্দিরের ধূপের গন্ধ, চমৎকার পরিষ্কার আকাশ আর জলে মাছেদের ছোটাছুটি সৃষ্টি করেছে এক অনির্বচনীয় পরিবেশ। আমরা যখন ছবি তুলতে ব্যস্ত তখন দেখলাম এক জায়গাতে বেশ কয়েকজন গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। কাছে গিয়ে দেখলাম আমার স্ত্রী কাগজ পেন দিয়ে ফুটিয়ে তুলছে মন্দিরের রেখা-চিত্র। বৈজনাথ শুধু ক্যামেরা বা স্মৃতি নয়, খাতা বন্ধিও হলেন আজীবনের জন্য।

২.

কৌশানি এমনই এক জায়গা যেখানে এসে আর কিছু না করলেও চলবে। সামনে রয়েছে প্রায় সাড়ে তিনশো কিলোমিটার উন্মুক্ত অঞ্চল। এতটা উন্মুক্ত বলেই কৌশানি থেকে দেখা যায় নয়টি শৈল শৃঙ্গ। এরচেয়ে বেশি সংখ্যক শৈল শৃঙ্গ ভারতের অন্য কোন জায়গা থেকে এক সঙ্গে দেখা যায় বলে আমার জানা নেই। এই শৃঙ্গ গুলির মধ্যে চৌখাম্বা, ত্রিশূল, নন্দাঘুনটি, নন্দাকোট, পঞ্চচলি উল্লেখযোগ্য। আমরা এবারে ছিলাম হোটেল সুমিত-এ। জায়গাটা গান্ধী আশ্রম থেকে খানিকটা নীচে এবং নিরিবিলি। পাহাড়ের গায়ে কাঠ দিয়ে তৈরি ছোটো ছোটো কটেজ। কটেজের বিছানায় শুয়েই দেখা যায় সেই অনির্বচনীয় সৌন্দর্য্য। মনে পড়ে যায় কবি বিনয় মজুমদারের সেই লাইন, “দৃশ্যের নিকটে এনে সকলে বিদায় নাও, / নির্মাণ সফল হলে শুনে নিও যুগল ঘোষণা”। কিংবা গাইতে ইচ্ছা করে, “আকাশ আমায় ভরলো আলোয়, আকাশ আমি ভরবো গানে”। এমন এক পরিবেশে নিজেকে খুঁজে পাওয়া সব চেয়ে সহজ বলেই মনে হয় মহাত্মা গান্ধী এখানে “অনাশক্তি যোগ” অনুশীলন করতে এসেছিলেন।

চা-বাগান কথা

এবার একটু চা হোক। চা সম্পর্কে আমার একটি লেখা “চা পান উদার” কেউ কেউ পড়েছেন। তাতে চা নিয়ে অনেকটা আলোচনা করেছি। এখন ছোট্ট করে বলি। আমাদের উপমহাদেশে চায়ের বাণিজ্যিক চাষ শুরু হয় সাহেবদের উদ্যোগে। তারা তখন অনেকগুলি জায়গাতে চা-চাষের চেষ্টা করেছিলেন। আসাম, দার্জিলিং (উত্তর বঙ্গের কিছু অঞ্চল সহ) বা কেরালার মুনার ছাড়া অন্য কোথাও তেমন সাফল্য অর্জন করেননি এই চা চাষ। কৌশানিকে চায়ের এক অসফল চাষক্ষেত্র বলা যেতে পারে। বৈজনাথ যাওয়ার পথে রয়েছে বেশ কয়েকটি চা-বাগান। সাহেবদের ছেড়ে যাওয়া পুরনো বাগান গুলো এখনও চলছে ধীরে ধীরে। তবে চা ব্যবসা ততটা লাভজনক নয় বলে মালিকরা চায়ের পাশাপাশি আরও অনেক রকম চাষ শুরু করেছেন। তারমধ্যে আপেল, আলমন্ড ও মাছ চাষ উল্লেখযোগ্য। আমরা ধীরে ধীরে নেমে গেলাম কৌশানি চা বাগানের মধ্যে। চা গাছের পাশে পাশে রয়েছে আপেল ও আলমন্ড গাছ। বাগানের ঢালু জমি বেয়ে নেমে আসা জলকে ধরার জন্য তারা নিচে তৈরি করেছেন একটি ছোট্ট পুকুর। তাতে চলছে মাছ চাষ। চা বাগানে দাঁড়িয়ে আমার চিরপরিচিত দার্জিলিং এর কথা মনে পড়ছিলো। একজায়গায় দেখলাম অনেকগুলো ঘন্টা আর পাশে একটা ছোট্ট শিব মন্দির। বুঝলাম, দেবভূমির রীতি মেনেই দাঁড়িয়ে রয়েছে এখানকার চা গাছ।

চা, আপেল, আলমন্ড ও মাছ চাষের পাশাপাশি, প্রায় প্রতিটি বাগানেই রয়েছে শাল ও সোয়েটারের ব্যবসা। শাল বোনার মেশিন রয়েছে। মেয়েরা হাতেই বুনছে সোয়েটার। টুরিস্টরাই মূলত ক্রেতা এখনে। আমার স্ত্রী পছন্দ করে শাল কিনে ফেলল, মা ও মাসীর জন্য। মনে হলো দামটা একটু বেশি। কিন্তু আমি জানি এই শালের সঙ্গে মায়ের গায়ে জড়িয়ে থাকবে খানিকটা কৌশানির স্মৃতি।(চলবে)

ছবি: লেখক

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com