কৌশানি ভ্রমণ-২

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

দীপারুণ ভট্টাচার্য্য(কলকাতা)

রুদ্রধারী ঝর্ণা

গান্ধী আশ্রমের খুব কাছেই রাঁধুনী রেস্টুরেন্ট। এটিই কৌশানিতে সঠিক অর্থে বাঙালি খাবার খাওয়ার জায়গা। সকালে রাঁধুনীতে লুচি তরকারি খেয়ে আমরা গিয়েছিলাম বৈজনাথ আর চা বাগান দেখতে। পথে একটি গ্রাম্য সমবায় থেকে কিনলাম বিভিন্ন মসলা ও গুরাসের সিরাপ। গুরাস মানে রডডেনড্রন। রডডেনড্রনের লাল ফুলকে রোদে শুকিয়ে জলে ভিজিয়ে তৈরী হয় এই সিরাপ। খুব সুন্দর স্বাদ ও ঘন্ধ। এতে বাচ্চাদের স্মৃতি শক্তি ভালো হয় শুনেছি। আমরা যদিও বাচ্চা নই তবুও কিনলাম কেননা valley of flowers এর পথে আমার এই গুরাসের সিরাপ খাওয়ার এক সুন্দর স্মৃতি আছে। তাছাড়া এটি সহজলভ্য নয় আদৌ।

যা-ই হোক, রাঁধুনী রেস্টুরেন্টে আবার দুপুরের খাবার খেয়ে আমরা চললাম রুদ্রাধারী ঝর্ণার পথে। প্রথমে গুগুল ম্যাপ নির্ভর করে পথ ভুল হলো। পরে স্থানীয় মানুষের সাহায্য নিলাম। পথে প্রকৃতির শোভা দেখতে দেখতে আরও খানিকটা সময় গেল। এরপর আমরা এসে পৌঁছালাম ঝর্ণা থেকে দেড় কিলোমিটার আগের এক চায়ের দোকানের সামনে। আর গাড়ি যাবেনা। এখন থেকে পায়েই হাঁটতে হবে। তখন প্রায় পাঁচটা বাজে। পাহাড়ে তাড়াতাড়ি সন্ধে নামে। ফিরে আসতে হবে আলো থাকতে থাকতে। তারপর আবার দশ কিলোমিটার সরু পথ বেয়ে গাড়ি চালিয়ে ফিরতে হবে কৌশানি। এসব ভেবে মহিলারা যেতে অস্বীকার করলো। স্থানীয় গাইড তারা শেঠ কে সঙ্গে নিয়ে জঙ্গল ও পাহাড়ের দূর্গম পথে আমি আর মলয়দা পা বাড়ালাম। শিশিরের জলে ভিজে পথে ভীষণ পিছল। চার-পাঁচ জায়গাতে ঝর্ণার জলের ধারা পেরিয়ে যেতে হলো আমাদের। কোথাও কোন জন-মানব নেই। তারা শেঠ বলল, ঝর্ণার পাশে রয়েছে এক শিবের মন্দির। টুরিস্ট আজ যারা এসেছিলো ততক্ষনে তারা সবাই ফিরে গেছেন। পূজারী সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত থাকবেন। তারপর তিনিও ফিরে যাবেন নীচের গ্রামে। এরপর জায়গাটা শুধু ঝর্ণা ও শিবের দখলে। আমাদের পৌঁছাতে হবে সাড়ে পাঁচটার আগেই। আমরা প্রায় হন হন করে হাঁটতে শুরু করলাম। খানিক বাদে হৃদপিণ্ড বেচারা বলল, এই কি করছিস এসব? আমি বললাম, তুই এই সামান্য চাপটুকুও নিতে পারছিস না? সে বলল, দিনের পর দিন এতো আরামে রাখলে কি করে পারবো বলতো!

তখন পাহাড়ি জঙ্গলে শুধুই আমরা। তারা শেঠের পিছন পিছন চলছি। হঠাৎ দেখলাম একপাল গরু। তারা লাঠি উঁচিয়ে তেড়ে যেতেই জঙ্গলের মধ্যে থেকে আওয়াজ এলো, ‘মত মারো’ (ওদের মেরোনা)। একটু পরেই গাছের ছাল দিয়ে বাঁধা দশ-এগারো ফুটের তিনটে গাছের কাণ্ড কাঁধে নিয়ে এক বৃদ্ধ জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এলেন। কাঠের ওজন ৩০-৪০ কেজির কম হবেনা কোন মতেই। তারা বুড়োর সঙ্গে খানিকটা গল্প করে এগিয়ে চলল। প্রশ্ন করে জানলাম, বুড়ো যখন জঙ্গলে কাঠ কাটছিলো তখন তার গরুগুলো এদিক ওদিক চলে যায়, তাই আজ তার একটু দেরি হলো ফিরতে। তারা বলল, বুড়োর বয়েস প্রায় ৮৫। ক্লান্ত হয়ে আমরা সামনের ঘাস জমিতে বসে পড়লাম।
মলয়দা বলল, যে পথে খালি হাতে আমরা চলতে পারছিনা, সেখানে এমন ভারী কাঠ আর গরু নিয়ে এই বয়সে, ভাবা যায়না! কথাটা শুনে আমার শরীরের কষ্টটা খানিকটা লাঘব হলো, উঠে পড়লাম। বড় বড় পা ফেলে চললাম ঝর্ণার দিকে।

পাহাড়ে গাছ তার শিকড়ে বৃষ্টির জল ধরে রাখে। তারপর ধীরে ধীরে ছাড়তে থাকে সারা বছর ধরে। কোন এক পাথরের ফাটল থেকে বেরিয়ে আসে এই ঝর্ণাধারা। প্রকৃতির এ এক অদ্ভুত দান। মূলত এইসব ঝর্ণার জলই পাহাড়ে জীবনকে সচল রাখে। আরো খানিকটা চড়াই পেরিয়ে আমরাও পৌঁছে গেলাম রুদ্রধারী ঝর্ণার কাছে। রুদ্র অর্থাৎ শিব। তাই পাশেই শিবের মন্দির। আমার মনে হয় পাহাড়ের দূর্গম অঞ্চলে এই জন্যই মন্দির তৈরি করা হয় যাতে মানুষ সেখানে আসেন বারে বারে। পূজারী যেন অপেক্ষা করছিলেন আমাদের জন্যই। মন্দির প্রাঙ্গনে বসে মনে হলো গলা খুলে গেয়ে উঠি, “এসো করো স্নান নব ধরা জলে, এসো নিপবনে ছায়া বীথি তলে…” কিন্তু বিধি বাম। সূর্য্য ডুবেগেছে তাই চারপাশের পাহাড় জঙ্গল দ্রুত শুষে নিচ্ছে গোধূলির শেষ আলোটুকু। নিচের দিকে নামতে তেমন কষ্ট নেই। তাই তারা শেঠের সঙ্গে গল্প শুরু করলাম, ফেরার পথে। জানা গেল সে রাজমিস্ত্রীর কাজ করে। সে যে কোম্পানিতে কাজ করে তারা ভারতীয় সেনা বাহিনীর কাজে যুক্ত। নিচের গ্রামেই তার বাড়ি। সে এখন বাড়ি এসেছে দুর্গা পুজোতে। কথায় কথায় জানা গেল তার গ্রামে বিদ্যুৎ আছে প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই। অবশ্য মিটার সেভাবে নেই। আনুমানিক ২০০ থেকে ৩০০ টাকা মাসে বিল আসে। তবে রান্নার গ্যাসের ব্যবস্থা এখনও গ্রামে আসেনি তাই রান্না এখনও জঙ্গলের কাঠ নির্ভর। গ্রামে রয়েছে দুটি স্কুল। একটা পঞ্চম শ্রেণী ও অন্যটা দশম শ্রেণী পর্যন্ত। একাদশ দ্বাদশ শ্রেণীর জন্য ছেলেমেয়েদের দশ কিলোমিটার দূরে কৌশানি যেতে হয়। কলেজের জন্য যেতে হয় পঞ্চাশ কিলোমিটার দূরে আলমোড়া শহরে। মনে মনে ভাবলাম এই জন্যই আমাদের মেয়েরা পিছিয়ে পড়ছে। যখন গাড়ীর কাছে পৌঁছালাম তখন প্রায় অন্ধকার হয়ে গেছে। চায়ের দোকানটির নাম, “জঙ্গল জেনারেল স্টোর”। এখানে এক কাপ গরম চা খেয়ে আমরা চললাম হোটেলের দিকে।

 

কৌশানি ও তার চারপাশের সুন্দর জায়গাগুলো ঘুরে দেখতে কমপক্ষে ৫-৭ দিনের লেগে যাবে। কৌশানি থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরেই গোয়ালদাম। সেখানে গেলে মনে হয় যেন ত্রিশূল শৃঙ্গকে হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যাবে। ১৫০ কিলোমিটার দূরে মুন্সিয়ারি হলো পঞ্চচুলার পাদদেশে। পঞ্চাশ কিলোমিটার নীচে বিনসার একটি সুন্দর জঙ্গল। এবাদে আলমোড়া ও রানিক্ষেত তো রয়েছেই। সব জায়গাতেই KMVN (পর্যটন দপ্তর) এর হোটেল। এবাদে বেসরকারি হোটেলও আছে অনেক। যাতায়াতের ট্যাক্সি পাওয়াও বেশ সহজ। ভাড়াও মোটামুটি নির্দিষ্ট। বাসও চলে প্রায় সব জায়গাতে। মে-জুন’-জুলাই বৃষ্টি হয় বলে ঘুরতে অসুবিধা। আর অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ঠান্ডা। সবচেয়ে ভালো সময় আগস্ট-সেপ্টেম্বর বা মার্চ-এপ্রিল। তবে বরফ দেখতে হলে জানুয়ারিতেই আসতে হবে।

পাতাল ভুবনেশ্বর

পরদিন সকালে উঠেই মন ভালো হলে গেল। একদম পরিষ্কার আকাশ আর পরপর নয়টি শৃঙ্গ দাঁড়িয়ে রয়েছে আমাদের সামনে। মন গেয়ে উঠলো, “আরও প্রেমে আরও প্রেমে, মোর আমি ডুবে যাক নেমে”। পাহাড়ের শোভা দেখতে দেখতে চা-জলখাবার শেষ হলো। এবার আমাদের গন্তব্য পাতাল ভুবনেশ্বর, তারপর দিল্লি। আমরা গাড়িতে পথ চলতে লাগলাম। আর পাহাড়ও যেন চলল আমাদের পাশে পাশে।

পাতাল ভুবনেশ্বর, কৌশানি থেকে প্রায় ১২২ কিলোমিটার দূরে পিথোরাগঢ় জেলার অন্তর্গত এক প্রাচীন গুহা মন্দির। মাটির প্রায় ৯০ ফুট নিচে পাথরের গায়ে স্বাভাবিক ভাবেই তৈরি হয়েছে বিভিন্ন দেব দেবী মূর্তি। ঢোকা ও বাইরে যাবার একমাত্র রাস্তাটি খুবই সরু। তাতে শুধু মাত্র একজন মানুষই যেতে আসতে পারবেন। কিছু অংশে যেতে হয় প্রায় হামাগুড়ি
দিয়ে। নীচে অক্সিজেনের পরিমান কম থাকে। তাই নিঃশ্বাসের কষ্ট হওয়া স্বাভাবিক। আমাদের আগে যে ভদ্রলোক নেমেছিলেন তার নাকি প্রেসমেকার আছে। এক এক পা নামতে তিনি পাঁচ মিনিট সময় নিচ্ছিলেন। সামনে উনি পথ আটকে আছেন আর পিছনে অন্য লোক চলুন চলুন করছেন।
এক জায়গায় থাকতে থাকতে আমারও বেশ অস্বস্তি বোধ হচ্ছে তখন। হঠাৎ মলয়দা বলল, ‘বেরিয়ে চলো দীপারুণ আর এক মুহূর্ত নয়’। কি জানি কি ভেবে বলল মলয়দা। আমি তার ডাকে সাড়া দিয়ে, উপরের লোকেদের ঠেলে বাইরে এলাম।
– ‘ওই লোকটার যদি কিছু হয়ে যায় তাহলে গুহার মধ্যে আমরা সবাই ফেঁসে যেতাম’; মলয়দা বলল।
ভেবে দেখলাম কথাটা ঠিক। কিন্তু আর দেরি করা সম্ভব নয়, অন্ধকার নামছে খুবই দ্রুত।

না দেখা পাতাল ভুবনেশ্বর পড়ে রইলো পিছনে। বাকি আছে বিনসারে রাত্রিবাস। কৌশানি থেকে মাত্র ৯২ কিলোমিটার দূরে রয়েছে পিন্ডার গ্লেসিয়ার (হিমবাহ)। সেখানেও যেতে হবে একবার। সব মিলিয়ে যাত্রা শেষ হলেও আশা মিটলো না। তাই আবারও আসবো এই কৌশানিতে। আপনারাও আসুন।

ছবি: লেখক

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com