কেউ যদি ডাকে!

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মাহবুব রেজা

ফেইসবুক এর গরম আড্ডা চালাতে পারেন প্রাণের বাংলার পাতায়। আমারা তো চাই আপনারা সকাল সন্ধ্যা তুমুল তর্কে ভরিয়ে তুলুন আমাদের ফেইসবুক বিভাগ । আমারা এই বিভাগে ফেইসবুক এ প্রকাশিত বিভিন্ন আলোচিত পোস্ট শেয়ার করবো । আপানারাও সরাসরি লিখতে পারেন এই বিভাগে । প্রকাশ করতে পারেন আপনাদের তীব্র প্রতিক্রিয়া।

পরিবারের সঙ্গে আমি

অনেক বছর পর আজ লুনা আর ছেলেমেয়েকে নিয়ে গিয়েছিলাম ফেলে আসা ২৪, বসুবাজার লেনে।
সকাল থেকে আকাশে বৃষ্টির ছিটেফোঁটা।এর মধ্যে নিয়ন্ত্রণহীন রোদ্দুরের আনাগোনায় সরু গলির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা বাড়িটা যেন রূপোর মতো ঝিকমিক করছে।
আহা! কতকাল পর দেখলাম!
সেই দোতলা বাড়ি, অবিকল যেন সেই ১৯৭৮ সালের মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে।
এই বাড়ি ঘিরে আমার, আমাদের ভাইবোনদের কত শত স্মৃতি!
২৬ সেপ্টেম্বর,৭৮ সালে মা মারা গেলেন-লাশ এলো বসুবাজার।
১৬ নভেম্বর,৭৮ সালে বাবা মারা গেলেন-লাশ এলো বসুবাজার।
আমার বয়স কত আর!
৯ বছর, ছোট দুই ভাই, আর বোনের বয়স আরও কম।
বড় আরও তিন ভাই।
মাস শেষে বাড়ি ভাড়ার টাকা দেয়ার সামর্থ্য আমাদের ছিল না।
অগত্যা কয়েকমাস পর এক ধূসর রঙা বিকেলে বসুবাজার লেন ছেড়ে আমাদেরকে পালিয়ে আসতে হয়েছিল।
তারপর অনেক কাল দিনের আলোতে আমার বসুবাজার লেনে যাওয়ার সাহস হয়নি।
ব্যাপারটা কেনো হতো? জানি না।
বাবা-মার মৃত্যুদিনে,নিজের জন্মদিনে আবার কখনো কখনো মন খারাপ হলে সন্ধ্যের পর একা একা বসুবাজার লেনে গিয়েছি।
দাঁড়িয়ে থেকেছি।
আমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে ঘুরে এসেছি।
দোতলা বাড়ির একতলায় যেখানে আমরা থাকতাম সেদিকে ভিখিরির মতো তাকিয়ে তাকিয়ে দেখেছি।
ওই তো ঝলমল করছে আমাদের বৈঠকখানা!
কলেজ পড়ুয়া আমার বড় দুই ভাইয়ের বিশাল
সবুজ রেক্সিনে মোড়া পড়ার টেবিল।
ষ্টীলের ফাইল কেবিন।
বুকসেলফে বাবার আইন শাস্ত্রের মোটা চামড়ায় লাল-নীল- হলুদ রঙের বাঁধানো বই।
মাঝে একটা ঘর।
তারপর আরেকটা ঘর।
একদম পেছনে একটা ‘এল’ টাইপ বারান্দা।
বারান্দার একপাশে মাটির চুলার রান্নাঘর।
কিছুটা দূরে লাগোয়া গোসলখানা, বাথরুম।
পাশে এক চিলতে উঠোন।
কোনার সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে গেলে রেলিঙ ঘেরা দিগন্ত বিস্তৃত ছাদ- সেই ছাদ থেকে দূরের রেল লাইন দেখা যেত। ফুলবাড়িয়া হয়ে, দয়াগঞ্জ হয়ে, গেণ্ডারিয়া- ঘণ্টিঘর- জুরাইনের ওপর দিয়ে রেল চলে যেত নারায়ণগঞ্জের দিকে।
যতবার গিয়েছি বসুবাজার লেনে, আমাদের পুরনো বাড়ির সামনে কেনো যেন বেশীক্ষণ থাকতে পারতাম না।
কেনো যে এরকম হতো!
আজ সবাইকে নিয়ে একরকম জোর করেই গেলাম।
ওরা বাড়ি দেখে বলল, এই সেই বাড়ি! এত্ত ছোট্ট বাড়িতে তোমরা ছোটবেলা থাকতা!
ওদেরকে আমি কিভাবে বলি, আমাদের ছোটবেলা যে অ-নে-ক বড় ছিল রে।
মেয়েকে বললাম, মা-রে, বাড়িটার একটা ছবি তোল তো।
ক্লিক।ক্লিক।ক্লিক।

বসুবাজার থেকে চলে আসার সময় আমি বার বার পেছনের দিকে তাকিয়ে ছিলাম আমাদের ঘর থেকে কেউ বেরিয়ে এসে আমাকে ডাক দেয় কিনা,
‘এই ছাবু কই যাছ?’
কই? কেউ তো বেরিয়ে আসে না।
আমাকে ডাকেও না।
আমি পেছনে কান ফেলে সামনের দিকে পা ফেলতে থাকি আর অপেক্ষা করি যদি কেউ ভুল করে বেরিয়ে এসে একবার আমাকে ডাক দেয়!
শুধু একবার।
একবার।
একবার।
একবার।
একবার…

ছবি: লেখক ও গুগল

 

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com