কুড়ি জন নকল বিমল মিত্র

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

বিমল মিত্র

একবার মুর্শিদাবাদের লালগোলার মহারাজা ধীরেন্দ্রনারায়ণের ছেলের বিয়েতে গিয়েছিলেন সাহিত্যিক বিমল মিত্র। বিয়ে বাড়ির হইচইয়ের মধ্যে তাঁর জন্য কিন্তু অপেক্ষা করছিল বড় একটা চমক। খাবার টেবিলে ধীরেন্দ্রনারায়ণ পুত্রবধূর সঙ্গে বিমল মিত্রের আলাপ করাতে গিয়ে বললেন, ‘এই হলেন আসল বিমল মিত্র। আর এই হলেন নকল বিমল মিত্র!’ বলে পা‌শে বসা এক ব্যক্তিকে দেখিয়ে দিলেন। নকল বিমল লজ্জায় খাবারের প্লেট ফেলে ছুটে পালালেন।
হওয়ার কথা ছিল এমনটাই। কিন্তু হয়নি। বরং নকল বিমল মিত্রের অট্টহাস্য শুনে লজ্জায় লাল হয়ে গিয়েছিলেন আসল বিমল। ‘বেগম মেরী বিশ্বাস’, ‘কড়ি দিয়ে কিনলাম’, ‘সাহেব বিবি গোলাম’-এর মতো আরো সব বিখ্যাত ও বহুল পঠিত উপন্যাসের লেখক বিমল মিত্র। সেই সময়ে তার জনপ্রিয়তাও ছিলো আকাশ ছোঁয়া। তার এই জনপ্রিয়তাকে বিক্রি করে ফাঁকে দুই টাকা কামিয়ে নিতে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল নকল বিমল মিত্রের দল। জানা যায়, বিমল মিত্র নামে তখন বাজারে ছিলেন এমন ২০-২৫ জন ভূতুড়ে লেখক। মজার ব্যাপার হচ্ছে বেশ কিছু প্রকাশক সে সব লেখা প্রকাশও করতেন। রমরম করে বিক্রি হয়েছে সে সব বই। পাঠক ধরতেই পারেননি।
এতে অবশ্য আসল বিমল মিত্রের আর্থিক ক্ষতি হয়েছিল অনেক। কপালে জুটেছিল সমালোচনাও। চেন্নাইয়ের ভেনাস পিকচার্স স্টুডিয়োর নানু ঘোষ বিমল মিত্রের মুখের উপর বলেছিলেন, তাঁর পাঠানো গল্পটি এক কথায় রাবিশ। শুনে আকাশ থেকে পড়েছিলেন লেখক। কারণ তিনি কোনও দিনই কোনও পরিচালককে তাঁর গল্প থেকে ছবি করার জন্য সুপারিশ করেননি। ঘোষবাবুর থেকে বিমলবাবু জানলেন, তাঁকে নকল বিমল মিত্র লিখেছিলেন, ‘‘আমি ‘সাহেব বিবি গোলাম’-এর লেখক, আমার নতুন বই ‘কড়ির চেয়ে দামী’ সিনেমা করার জন্য পাঠাচ্ছি।’’
নকল লেখকের উৎপাতে বিদেশ থেকেও নিন্দা শুনতে হয়েছিল তাঁকে। ফিলাডেলফিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে বিমল মিত্রের বই পড়ে তাঁর বন্ধু দিলীপ ঘোষ বিমলবাবুকে লিখে জানিয়েছিলেন, তাঁর ‘কড়ির চেয়ে দামী’, ‘বসন্ত মালতী’, ‘মানস সুন্দরী’ বইগুলো অপাঠ্য। ১৯৭১ সালে ‘ফুল ফুটুক’ উপন্যাসটির নিবেদন অংশে জাল বইয়ের জন্য তাঁর বিড়ম্বনার প্রসঙ্গে এই ঘটনার উল্লেখ করে তিনি লিখেছিলেন, ‘‘সে সব যে আমার নামে প্রকাশিত জাল বই, দুঃখের সঙ্গে তাঁকে সে কথা জানাতেও ঘৃণা হল।’’
১৯৭০ সালে এক দিন। স্টেট লটারি ডিপার্টমেন্ট থেকে ফোন এলো বিমল মিত্রের কাছে। কথা বলতে চাচ্ছেন রাইটার্স বিল্ডিংয়ের লটারি ডিপার্টমেন্টের অফিসার। তারা বিমল মিত্রকে অনুরোধ করছেন লটারির বিচারক হওয়ার জন্য। বিমলবাবু লটারির টিকিট বিক্রির বিরোধী ছিলেন। কিন্তু বারংবার অনুরোধে রাজি হতে হল। নির্দিষ্ট দিনে অনুষ্ঠানে পৌঁছে জানতে পারলেন, তাঁকে নিয়ে প্রবল সমস্যায় পড়তে হয়েছিল অফিসারটিকে। অফিসার ফোন গাইড দেখে বিমল মিত্রকে ফোন করতেই তিনি সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে যান। বিমল মিত্রের মতো মানুষ সঙ্গে সঙ্গে রাজি হচ্ছেন, সন্দেহ হয় ওই অফিসারের। কারণ তিনি লেখকের স্বভাব কিছুটা জানতেন। তখনই তিনি ফোন গাইড দেখে ফোন করেন আরেক বিমল মিত্রকে। ফোনে তাঁর বারংবার আপত্তিতেই বুঝে যান, আসল বিমল মিত্রকে পেয়েছেন।
জানা যায় সত্তরের দশকে এই নকল লেখক বাহিনী তৈরী করেছিল কলকাতার কলেজ স্ট্রিটের কয়েকটি ছোট প্রকাশনা সংস্থার প্রকাশক। এই জাল লেখকদের মধ্যে বাজারে চাহিদা বেশী ছিল রবীন্দ্রনাথ চক্রবর্তী নামে একজন ব্যক্তির। এই ভদ্রলোক কলকাতারই একটি পত্রিকায় দেয়া সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, বিমল মিত্র ছিলেন তাঁর প্রিয় লেখক, সাহিত্যচর্চার গুরু। নিজের বই প্রকাশের ইচ্ছে নিয়ে এক প্রকাশকের কাছে গেলে সেই প্রকাশক তাঁকে একটা টোপ দেন। তিনি শ্রীচক্রবর্তীর বই ছাপবেন, যদি বিমল মিত্রের নামে তিনি একটা উপন্যাস তাঁকে লিখে দেন। ওই প্রকাশকের ক্ষমতা ছিল না বিমল মিত্রের মতো বড় লেখকের বই প্রকাশ করার। টোপটা নকল লেখক গ্রহণ না করলেও মনে মনে চ্যালেঞ্জটা নিয়েছিলেন। দেখি তো পারি কি না বিমল মিত্রের মতো লিখতে! লিখলেন তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘রক্ত পলাশ’। প্রকাশককে পড়ালেন। প্রকাশক বুঝলেন, তিনি লোক চিনতে ভুল করেননি। রবীন্দ্রনাথ চক্রবর্তী প্রথমে পাণ্ডুলিপি দিতে অস্বীকার করলেও প্রকাশকের চাপাচাপিতে রাজি হয়ে যান। ‘রক্ত পলাশ’ খুব হিট করে বইয়ের বাজারে। ১৯৬৮-’৭৩-এর মধ্যে তিনি একাধিক বই লিখেছেন ‘বিমল মিত্র’ হয়ে। লিখতে-লিখতে ভুলেই গিয়েছিলেন, তিনি বিমল মিত্র নন। আজ অবধি তার নিজের নামে একটি বইও প্রকাশ পায়নি। বিমল মিত্রের নামে চিঠি এলে তিনিই উত্তর দিতেন। সতর্ক থাকতেন যাতে তাঁর লেখা বইয়ের রিভিউ ছাপা না হয়, তা হলেই আসল বিমলের নজরে এসে যাবে। ১৯৭৩-এ ‘চতুরঙ্গ’ প্রকাশের পর ধরা পড়েছিলেন নকল বিমল। ঘটনা গড়ায় আদালতের দরজা অবধি। নকল বিমলকে বাঁচাতে সেই প্রকাশক রাতারাতি জাল রেশন কার্ড, কর্পোরেশনের সার্টিফিকেট বের করে ফেলেছিল। তার দাবি ছিল একই নামে দু’জন লেখক থাকতেই পারেন। আইনত কিছু করা যায় না। মামলাটি হেরে যান আসল বিমল মিত্র!
১৯৭৮ সালে ‘যা ইতিহাসে নেই’ উপন্যাসে এক বিশেষ বিজ্ঞপ্তিতে বিমল মিত্র জানিয়েছিলেন, ‘আমার পাঠক-পাঠিকাবর্গের সতর্কতার জন্য জানাচ্ছি যে, সম্প্রতি দুই শতাধিক উপন্যাস ‘বিমল মিত্র’ নামযুক্ত হয়ে প্রকাশিত হয়েছে। পাঠক মহলে আমার লোকপ্রিয়তার ফলেই এই দুর্ঘটনা ঘটা সম্ভব হয়ছে। …. একমাত্র কড়ি দিয়ে কিনলাম ছাড়া আমার লেখা প্রত্যেকটি গ্রন্থের প্রথম পৃষ্ঠায় আমার স্বাক্ষর মুদ্রিত আছে।’

সাহিত্য ডেস্ক
তথ্যসূত্রঃ ইন্টারনেট
ছবিঃ গুগল

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com