কানাডায় ঈদের আনন্দ

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আন্জুমান রোজী, কানাডা থেকে

বিদেশ বিভুয়ে ঈদ যেন, ঘোলে দুধের স্বাদ নেওয়ার মতো। সেই আনন্দ , সেই আবেগ উচ্ছ্বাস প্রকাশের পরিবেশ কী আর বিদেশের মাটিতে পাওয়া যায়? ‘রমজানের রোজার শেষে এলো খুশীর ঈদ’, সেই গানের সুরও আর আন্দোলিত করে না মনকে। ঈদে নতুন জামাকাপড় পরার আনন্দ, চাঁদরাতে হাতে মেহেদি পরা,  রসনাবিলাসের জন্য বিশেষ বিশেষ রান্না, ঘরবাড়ি পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করে  রাতজেগে নতুনভাবে্ সাজানো, আলপনা এঁকে এঁকে বাড়ির উঠোন-বারান্দা ভরে ফেলা, অতিথি আপ্যায়ন, ঈদ উপহার বা বখশিশ পাওয়ার আনন্দ; এমনসব আমেজ কোথায় পাবো? এ যে অন্যদেশ, এতো আমার বাংলাদেশ নয়!

প্রথমবছর কানাডার ঈদ ছিল মর্মবেদনার, ছিল হাহাকারের গুঞ্জরনে মোড়া।ভালোমন্দ কিছু রান্না করলেও পরিচিতের গন্ডী সীমাবদ্ধ থাকায় লোকজন আসেনি বা আমাদেরও কোথাও যাওয়া হয়নি। তবে কম্পিউটারের স্ক্রিনে ছিল বাংলাদেশের ঈদ আনন্দের ছোঁয়া । স্কাইপেতে পরিবারের লোকজনদের সঙ্গে সারাদিন ধরে চলেছিলো কথোপকথন, দেখেছি তাদের ঈদের আয়োজন। এভাবেই কেটে গেলো বেশ কটি বছর। তবে ঈদের জন্য সরকারী কোনো ছুটি না থাকাতে অনেকেরই ঈদের দিনে কাজ করতে হয়। অনেকের কাজ এমন যে দিন আনে দিনে খাওয়ার মতো, তখন  ছুটি নেওয়াতে বিড়ম্বনার শিকার হতে হয়। তাই বাধ্য হয়ে ছুটতে হয় কাজে। যার ফলে ঈদের আনন্দ ম্লান হতে শুরু করে। তারপর এখানে মুসলিম কমিউনিটি দিনে দিনে বেশ বড় আকার ধারণ করলো। বিশ বছর আগের ঈদ এখন আর নেই, এখন মনে হবে বাংলাদেশের একটি ক্ষূদ্র অংশ এই বিদেশে ঈদ আনন্দ উৎসবে মেতে উঠেছে।

বাংলাদেশের আদলেই এখানে ঈদ উদযাপন করা হয়। পুরো রোজার মাসব্যাপী  ঈদের জন্য চলতে থাকে ঈদ বাজার। ঈদ মেলা নামে বিভিন্ন সংগঠনের নানা আয়োজন সমাবেশ। যেখানে শাড়ি-চুড়ি থেকে শুরু করে ঈদের সবরকম পণ্যসামগ্রীর সমারোহ থাকে। হাতে মেহেদি পরানোও হয় সেখানে, আর কিছু কেনাকাটা না করলেও অনেকে হাতে মেহেদি পরার জন্য ছুটে যান মেলাতে। সেইসঙ্গে বাঙালির ঘরে ঘরে ঈদের প্রস্তুতিও চলতে থাকে।

বাঙালি  অধ্যুষিত এলাকা ভিক্টোরিয়াপার্ক এন্ড ড্যানফোর্থ এরিয়ায় ঈদের রমরমা ভাব চোখেপড়ার মতো। বাঙালি পসরাগুলিও ঈদের সাজে সেজে থাকে। ঈদের দিন সকালে  দফায় দফায় জামাতে নামাজ পড়ার ব্যবস্থাও থাকে। নামাজ শেষে একে অপরের সঙ্গে কোলাকোলির দৃশ্য বাংলাদেশের ঈদ জামাতের কথা মনে করিয়ে দেয়।

বিভিন্ন দেশের মুসলি্মরা ঈদ উদযাপনের আয়োজন শুরু করে রোযার শুরু থেকে। পুরো একমাস রোযা শেষে ঈদের আনন্দ উপচে পড়ে মুসলিম কমিউনিটিতে। অন্যান্য মুসলিম কমিউনিটির লোকজন মসজিদ কেন্দ্রিক ঈদ উদযাপন করে থাকে। নারীপুরুষ সবাই মসজিদের গিয়ে নামাজ আদায় করে ঈদ কোলাকোলি পর্ব শেষে বিশাল খাবারের আয়োজনে অংশগ্রহণ করে। এরমধ্যে সোমালিয়া জ্যমাইকা, সৌদি আরব, সাউথ আফ্রিকার মুসলিম সম্প্রদায় এমন কি মিডল ইস্টের মুসলিম উম্মাহর লোকজনও অংশগ্রহণ করে থাকে। তবে বেশিরভাগ  বাঙালি চলে যায় বাংলাটাউনে। ঈদকে ঘিরে হয় বাঙালির পূনর্মিলন।

মিশ্র জাতি গোষ্ঠির দেশ কানাডা। সমগ্র পৃথিবী থেকে আসা প্রায় সবদেশের মানুষের সমাগম এখানে। ভিন্নভিন্ন  শিল্প, সংস্কৃতির সংমিশ্রণে গড়ে উঠেছে এই দেশ, যেখানে রয়েছে সৌহার্দ, সম্প্রীতির নিবিড় বন্ধন। তারমধ্যে মুসলিম উম্মাহর ঈদ আনন্দ সংযোজন বিশেষ দৃষ্টিকাড়ে। যেহেতু সমঅধিকারের দেশ কানাডা, তাই জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবরকম সুযোগসুবিধা পাওয়ার আইন প্রয়োগের পাশাপাশি বিভিন্ন অর্গানাইজেশনেরও ব্যবস্থা আছে। ঠিক সেভাবে মুসলিম উম্মাহর মানুষদের জন্যও সুবন্দোবস্ত রয়েছে, রয়েছে ধর্ম, অধর্ম পালনের অবাধ স্বাধীনতা। এখন ঈদের দিন বিশেষভাবে ছুটি দিতে বাধ্য, তাই যার ইচ্ছে সে ছুটি নিয়ে ঈদ উদযাপন করছে। তবে যেহেতু ঈদ একদিনে হচ্ছেনা বা বছরে একই দিনে পালিত হচ্ছেনা সেই কারণে ঈদের দিন সরকারীভাবে ছুটি ঘোষণাও সম্ভব হচ্ছেনা। শিয়া,সুন্নির মতবাদের কারণে অনেকসময় একই দিনে ঈদ উদযাপিত হয় না।এ ব্যাপারে পার্লামেন্টে কথা উঠলে ঘোষণা দিয়েছিল,  বছরের যে কোনো একদিন ঈদের জন্য নির্দিষ্ট করলে সরকারী ছুটির ব্যবস্থা করা যেতে পারে যেভাবে ক্রিসমাসের ছুটি আছে।

কানাডায় ঈদ আনন্দ এখন বেশ সমাদৃত। যেভাবে আমরা বলি, ধর্ম যার যার, উৎসব সবার। ঠিক একই মানসিকতায় ঈদের আনন্দ অনেক ভিন্ন জাতি গোষ্ঠির মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে। । যার ফলে, কানাডা সরকার প্রধানের ঈদ শুভেচ্ছা পাই আমরা।এমনকি বিভিন্ন ঈদ- আনন্দেও কানাডার প্রধানমন্ত্রীকেও অংশগ্রহণ করতে দেখা যায়। যে কোনো আনন্দ উচ্ছ্বাসে জাতি, ধর্ম, বর্ণের কোনো বালাই থাকেনা। আনন্দ যেন সংক্রমিত হতে থাকে তার নিজ ইচ্ছায় প্রকৃতির মতো।

ছবি: লেখক

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com