কাদম্বরী দেবী’কে খোলা চিঠি

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

বাবলু ভট্টাচার্য

আজ আমার মন ভালো নেই। বিষন্নতা ভর করেছে। কিছুই ভালো লাগছে না। এইমাত্র একটা বই পড়ে শেষ করলাম- ‘কাদম্বরী দেবী’ নামের বইটা এখনও আমার কোলের উপর পড়ে আছে।

এখন অনেক রাত। আমি সাধারণত রাত জাগতে পারি না। আমার সব কাজ খুব সকালে শুরু হয়। কিন্তু আজ, এখন অনেক রাত হওয়া সত্বেও ঘুম আসছে না। অনেকদিন ধরে কাদম্বরী দেবীকে নিয়ে পড়ছি। তিনি আমার মনের গভীরে একটা জায়গা করে নিয়েছেন। তাঁর জন্যেই মনটা জলভরা মেঘের মত ভারাক্রান্ত হয়ে আছে।

মাত্র ন’বছর বয়সে বিয়ে হয়েছিলো তাঁর, উনিশ বছরের ছেলের সঙ্গে। তিনি না হয় কচি একটা মেয়ে ছিলেন তখন, কিছুই বোঝেন নি, কিন্তু ভেবে দেখুন তো ছেলেটার কি কষ্ট, কি অসোয়াস্তি! আজকাল আমরা এ ধরণের ঘটনাকে বিয়ে বলে ভাবতে পারি না। রীতিটাকে মনে হয় পাগলামি, একটা যুগের পাগলামি। জীবন নিয়ে পুতুল খেলা। ঐ পুতুলখেলা নিয়েই খুশি থাকতে হতো তাঁদের। কিন্তু তাঁরাও তো মানুষ ছিলেন। তাঁদেরও তো ছিল ঋতুর রক্ত, কৌমার্যের ছেদন, টিন-এজ এর বুক টনটন করা রোম্যান্টিক যন্ত্রণা।

আচ্ছা, আপনাকে যে আমি কি বলে সম্বোধন করি … দিদি নাকি নতুন বৌঠান? আপনি তো আমার কোন আত্মীয় নন, তবে কি ম্যাডাম বলবো? নাহ, আপনি কাদম্বরী দেবী হয়েই থাকুন।

মাতৃহারা যে দেওরটিকে স্নেহ দিয়ে ভালোবাসা দিয়ে লালন করেছিলেন, পাকস্থলীতে আফিম নিয়ে আপনি যখন চলে গেলেন, ভেবে দেখুন তো, তখন আপনার আদরের দেওরটির অনাথ অবস্থার কথা। তখনও তেইশ পূর্ণ হয়নি তাঁর― কয়েকদিন বাকি আছে― লাজুক, সংবেদনশীল, গভীর, রোম্যান্টিক, শিল্পী প্রকৃতির একটি ছেলে। তেইশ বছরের হাহাকার কার সাথে শেয়ার করবে সে?

আপনার আত্মহত্যা ওঁর চোখকে খুলে দিয়েছিল জীবনের রুদ্ধ কান্নাগুলির দিকে। আর ওঁর প্রবল শোককে কবিতায় উৎক্ষিপ্ত করে উনি বড় কবি হয়ে গেলেন।

শ্রদ্ধেয় কাদম্বরীদেবী,

আমি জানি আপনাকে কোনও মতেই বাঁচান যেত না। না, আপনার মৃত্যুর জন্যে আমি কোনো বিশেষ পরিবার বা ব্যক্তিকে দোষী করছি না। তাঁর জন্যে দায়ী গোটা একটা সমাজ ব্যবস্থা। একশ আঠাশ বছর আগেকার কলকাতায় একটি সম্ভ্রান্ত সুসংস্কৃত বৃহৎ একান্নবর্তী পরিবারের অভ্যন্তরে আপনার যে আত্মহত্যা, যার ধাক্কা সামলাতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ রবীন্দ্রনাথ হয়ে উঠলেন, তা হচ্ছে আমার কাছে, সেকালের সমাজ নির্দিষ্ট রোল-প্লেয়িং-এর বিরুদ্ধে একটি বুদ্ধিমতী, সংবেদনশিলা, অত্যন্ত অভিমানিনী মেয়ের নিঃশব্দ প্রতিবাদ। শত প্রসাধন সামগ্রী দিয়ে সেই কলঙ্ককে ঢেকে রাখা যাবে না। রবীন্দ্রনাথ তা বুঝতে পেরেছিলেন এবং তাঁর শিল্পের মাধ্যমে আজীবন তাঁর জন্যে প্রায়শ্চিত্ত করেছিলেন।

আমি বইপত্র ঘেঁটে জানতে পেরেছি, আপনার স্বামীর সঙ্গে আপনার মনোমালিন্য হয়েছিল। আপনি নিজেকে অনাদৃত-অবহেলিত বোধ করেছিলেন। কে জানে কেমন ছিল আপনাদের বিবাহিত জীবন। আমি তো কেবল বাইরের দিকটার খবর পেয়েছি, ভিতরের দিকটা চাঁদের উল্টো পিঠ। আপনাদের যৌন জীবন কেমন ছিল, কেন আপনাদের বাচ্চাকাচ্চা হয়নি, আপনাদের মধ্যে মানসিক অন্তরঙ্গতা কতটা ছিল, আপনারা আপনাদের মনের কথা পরস্পরের কাছে খুলে বলতেন কিনা; এসব জানবার কোন উপায় নেই।

আমি শুধু এইটুকু বুঝতে পেরেছি যে, জ্যোতিদাদার উপরে আপনার খুব অভিমান ছিলো। বুঝতে পারি যে, উনি যখন মেজদা সত্যেন্দ্রনাথ ও মেজবৌদি জ্ঞানদানন্দিনীর কাছে গিয়ে আড্ডা দিতেন, রাত্রে আপনার কাছে ফিরে আসতেন না, তখন আপনার খুব কষ্ট হতো, একা লাগতো। সে ব্যথার কথা কাউকে খুলে বলার কোন উপায় ছিল না আপনার।

কার কাছে মন খুলবেন? একান্নবর্তী পরিবারের জীবনযাত্রা তো ব্যক্তি মানুষকে তেমন কোন মর্যাদা দিত না, যে দুটো মানুষের মধ্যে কমিউনিকেশন সে স্তরে পৌঁছবে। ননদের কাছে তো আর তাদের ভায়েদের সম্পর্কে মুখ ফুটে কিছু বলাও সম্ভব ছিলো না।

এক ছিলেন রবি-ঠাকুরপো। কিন্তু আপনারা যদিও পরস্পরকে খুব ভালোবাসতেন, তবুও আপনার বিবাহিত জীবনের বেদনার কথা কি তাঁকে খুলে বলতে পারতেন, নাকি তা নিয়ে কি তাঁর সাথে কোন আলোচনা করতে পারতেন? মনে তো হয়না আপনাদের মধ্যে আদান প্রদান সে স্তরে পৌঁছেছিলো।

এক পর্যায়ে তাঁর তো বিয়েই হয়ে গেলো। তখন রবি আর কেবল আপনার ছোট্ট দেওরটি নন, তাঁর নিজস্ব বালিকা বঁধুর পতিদেবতাও বটে। তাঁকে কিছু বলে কি লাভ?

জেনেছি, আপনি খুব ভালো রাঁধতে পারতেন, সেলাই-ফোঁড়াই পারতেন, গৃহসজ্জার দিকে আপনার মন ছিলো, তেতলার ছাদে আপনি বাগান করেছিলেন ইত্যাদি। কিন্তু জীবনে সংকটের লগ্ন এসে উপস্থিত হোলে এসব তো আর মনের ভাঙনকে আটকে রাখতে পারে না।

আমি আরও জানতে পেরেছি যে, আপনার জীবনে গানবাজনা, সাহিত্য চর্চা, ঘরোয়া নাটকে অভিনয়— এ সমস্তরও একটা স্থান ছিলো। আপনি সমকালীন সাহিত্য পড়তে এবং তা নিয়ে আলোচনা করতে খুব ভালোবাসতেন। বিহারীলালের কবিতা আপনার বিশেষ প্রিয় ছিল এবং আপনি রবিকে খোঁটা দিয়ে বলতেন যে, তিনি কোনোদিন বিহারীলালের মতো ভালো কবিতা লিখতে পারবেন না। আপনি ভালো গান গাইতে পারতেন, রবি ঠাকুরপোর কাছে দুপুরে ইংরেজি পড়তেন, ‘ভারতী’ সংক্রান্ত বৈঠকে উপস্থিত থাকতেন। কিন্তু তবুও আপনাদের সময়ে সংস্কৃতি চর্চাকে মেয়েদের রাখতে হতো একটা শৌখিন স্তরে; সেটাকেই জীবনের মুল কেন্দ্র করে ফেলার কোন উপায় ছিলো না। জীবনের দুঃখ-কষ্টকে শিল্পচর্চা বা জ্ঞানচর্চার সাহায্যে অতিক্রম করতে হোলে ওগুলোকেই জীবনের বৃত্তি করে নিতে হয় এবং তা করবার কোন প্রশস্ত পথ আপনাদের সামনে খোলা ছিল না। আপনাদের মতো মেয়েদের গুণাবলির কোন প্রকৃত বহির্গমন প্রণালী বাঙালি সমাজে তখনও তৈরি হয়ে উঠতে শুরু করে নি। রাস্তা খোঁড়া সবেমাত্র আরম্ভ হয়েছে। হয়তো আরেক প্রজন্ম পরে জন্মালে আপনি আরও কিছু দূর এগিয়ে যেতে পারতেন।

যদি আপনার ধর্মে মতি হতো, যদি পূজা-আর্চা বা গুরু নিয়ে থাকতে পারতেন! কিন্তু হয়তো ঠাকুরবাড়ির ব্রাহ্ম পরিবেশে আপনার মধ্যে সে প্রবণতা বিকশিত হয়ে ওঠেনি। বরং তার শৌখিন সংস্কৃতিচর্চার পরিবেশে বিকশিত হয়ে উঠেছে আপনার মধ্যেকার রোম্যান্টিক মেয়েটি। বঙ্কিমের উপন্যাস এবং বিহারীলালের কবিতা পড়ে, গীতিনাট্যে গান গেয়ে, অভিনয় করে আপনার মধ্যে পূর্ণতা পেয়েছে একটা তীব্র রোম্যান্টিক প্রেম চেতনা, জীবনের কাছ থেকে রোম্যান্টিক প্রত্যাশা।

কিন্তু আপনি তেতলার আসরগুলোর মধ্যমণি হলেও জ্যোতিদাদা আর আপনার মধ্যে বয়সের একটা ব্যবধান ছিল। তিনি আপনার চাইতে দশ বছরের বড় ছিলেন এবং তিনি নিজে একজন অত্যন্ত গুণী এবং খামখেয়ালী যুবক ছিলেন। হয়তো তাঁর এমন কতগুলো প্রয়োজন ছিল যেগুলো আপনি মেটাতে পারেন নি বা পারতেন না। হয়তো সেই কারনে তিনি খানিকটা সরে গেছেন। বিলেত ফেরত মেজবৌদি জ্ঞানদানন্দিনীর সঙ্গে আড্ডা মেরেছেন। তাঁর সে অমনোযোগের অবকাশে পূর্ণ যৌবনা আপনার মধ্যে পুঞ্জিভূত হয়ে উঠেছে রোম্যান্টিক হাহাকার। আপনার সমবয়সী, শৈশবের খেলার সাথী, রোম্যান্টিক, সংবেদনশীল, সুপুরুষ ছোট দেওরটির চিত্তাকর্ষক সান্নিধ্য ও সাহচর্য সে হাহাকারকে কেবল আরও তীব্র করে তুলেছে, কিন্তু তাঁর কোন নিরসন করতে পারে নি, করতে পারত না। তাঁর কোন উপায় ছিল না। আপনাদের সম্পর্কটার কোন পরিণতি সেকালের, সে সমাজের কাঠামোর মধ্যে সম্ভব ছিল না। আপনার চোখের সামনে আপনার দেওরটি পর হয়ে গেল, সে আর একজনের হয়ে গেল। একদিকে জ্ঞানদানন্দিনী, অন্যদিকে ভবতারিণী; দুই জায়ের মাঝখানে আপনার নিজেকে মনে হলো উপেক্ষিতা। কষ্টটা গুমরে গুমরে উঠতে লাগল বুকের মধ্যে, মন ছেয়ে গেল গভীর বিষাদ ও নৈরাশ্যে। কেউ সেটা লক্ষ্য করল না, আপনি কাউকে কিছু বুঝতে দিলেন না। নবোঢ় সরল যুবকটির ঈষৎ অন্যমনস্কতা ও আত্মমগ্নতার অবসরে আপনার সে ডিপ্রেশন চরম শিখরে পৌঁছলো। তারপর জ্যোতিদাদার সাথে একটা তুচ্ছ ভুল বোঝাবুঝিকে উপলক্ষ্য করে ভেঙে পড়ল আপনার মন। আপনার মনে হল, না না না, এ বাড়িতে আমাকে কেউ ভালবাসে না। এখানে আমার কেউ নেই। পৃথিবীতে আমার কেউ নেই। এই সংসারে আমার কোন প্রকৃত ভূমিকা নেই। তবে আমি কেন এখানে পড়ে আছি, এখনই চলে যাই না কেন? আপনি বিশুকে দিয়ে লুকিয়ে আফিম আনালেন।

মনের কষ্টে মানুষ যে আত্মহত্যা করতে পারে তা তো তখনকার লোকেরাও জানতো, কিন্তু বিষাদের যে একটা ক্লিনিক্যাল মাত্রা আছে, সেটা থেকে মানুষকে যে চিকিৎসার সাহায্যে টেনে তোলা যেতে পারে, সেসব ধারণা তখনও গড়ে ওঠে নি। আমরা আজকে যাকে সাইকায়াট্রি বলি তা তখনও উদ্ভাবিত হয়নি। হবে কি করে, আধুনিক মনোবিজ্ঞানের উন্মেষ যাঁর নামের সঙ্গে জড়িত তিনি যে আপনাদের প্রজন্মের। সীগমুণ্ড ফ্রয়েড (১৮৫৬-১৯৩৯), কাদম্বরী দেবী (১৮৫৯-১৮৮৪), রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১)। অর্থাৎ আপনার মৃত্যুর সময়ে মহামতি ফ্রয়েড সাহেবের বয়েস মাত্র আঠাশ বছর। নাঃ, সাইকায়াট্রির কলকাতা শহরে পৌঁছতে তখনও অনেক দেরি। আপনার ডিপ্রেশনের কোনো রকমের ডাক্তারি চিকিৎসা সম্ভব ছিল না। তবে আপনি সকলের চোখের সামনে শুকিয়ে যেতে থাকলে হয়তো বা ডাক্তার ডাকা হতো এবং তিনি আপনাকে সমুদ্রের ধার অথবা পার্বত্য অঞ্চলে হাওয়া বদল করতে যেতে বলতেন। কিন্তু সেটি করতেও তো ‘ওঁর’, মানে জ্যোতিদাদার সহযোগিতা লাগতো।

ঘুরে ফিরে সেই একই কথা দাঁড়াচ্ছে; জোড়াসাঁকোর সম্মানীয় শ্বশুরবাড়ির অভ্যন্তরে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের নিঃসন্তান স্ত্রী হিসেবে আপনার যে জীবন সেখানে আপনার মানসিক সংকটের সঙ্গে লড়াই করে সেই সংকটের ভিতর থেকে বেরিয়ে আসার কোন উপায় আপনার ছিল না, অথবা জানা ছিল না। যাঁর অনাদরে আপনার বিষাদ, বিষাদের ভিতর থেকে বেরিয়ে আসতেও তো তাঁরই সাহায্য লাগবে। স্বামীর সাহায্য ছাড়া আপনি জীবনের কোনো দিকে এক পা এগোবেন কি করে? যতদিন তাঁর দাক্ষিণ্য ততদিনই আপনার মনের আনন্দ ও শান্তি। আপনার যৌন জীবন। আপনার ছাদের ‘নন্দন কানন’। আপনার সাহিত্য চর্চা এবং গান-বাজনা। তিনি দূরে সরে গেলেই সব শেষ।

শুধু একটিই জিনিস আপনাকে বাঁচাতে পারত। কিন্তু সেইটিই আপনার ছিল না। সন্তান। হায় বৌদিমনি! বাচ্চাকাচ্চা থাকলে আপনি বেঁচে যেতেন।

মা হওয়া, বিশেষত ছেলের মা হওয়া হচ্ছে হিন্দু নারীর জীবনের সব থেকে বড় পদমর্যাদা, তাঁর সব থেকে বড় গৌরব। মাতৃত্বই তাঁর মূল বৃত্তি। আচ্ছা, আপনার বন্ধ্যাত্ব নিয়ে কেউ কি কখনও আপনাকে খোঁটা দিয়েছিলেন? কেউ আপনার মনে ঐ বিষয় নিয়ে সামান্যতম আঘাত দিয়ে থাকলেও আপনার প্রচণ্ড ব্যথা লেগে থাকবে। তাছাড়া আপনি হয়তো নিজেই নিজেকে দোষী করতেন আপনার সন্তানহীন অবস্থার জন্যে।

সন্তানহীনাদের প্রতি প্রাচীন হিন্দু সমাজের প্রতিন্যাসটি বর্বর এবং বন্ধ্যাত্ব নিয়ে মেয়েরাই মেয়েদেরকে সব থেকে বেশি খোঁটা দিত মনে হয়!

নিঃসন্তান আপনি আপনার হৃদয়ের স্নেহ ঢেলে দিয়েছিলেন শ্বশুরবাড়ির অন্যান্য শিশুদের উপরে। অনেকেরই মাতৃসমা হয়ে উঠেছিলেন। ননদের ছোট মেয়েটিকে মানুষ করতেন, কিন্তু সে মারা গেলো। তার মৃত্যুতেও আপনার গভীর ডিপ্রেশন হয়ে থাকবে।

মা হতে পারলে আপনার জীবনটা অন্যরকম হতো গো বৌঠান। অন্যদের কাছ থেকে আরও বেশি সম্মান পেতেন, হয়তো স্বামীর কাছ থেকে আরও মনোযোগ পেতেন এবং সব থেকে বড় কথা, আপনি নিজের অস্তিত্বকে নিজে আরও বেশি মূল্য দিতেন। অন্য বাচ্চাদের নতুন কাকিমা, অথবা নতুন মামিমা― নিজেরই সন্তানের মা হতে পারলে আপনার জীবন আপনার কাছে মহা মূল্যবান হয়ে উঠত, আপনি সব দুঃখ সামলে উঠতে পারতেন। স্বামীর অবহেলা অথবা রবির বিয়ে অত বড় হয়ে দেখা দিত না। বাচ্চাকাচ্চাদের নিয়ে আপনি অন্যান্য দুঃখগুলোকে ভুলে থাকতে পারতেন। অভিমান তখন প্রধান হয়ে উঠত না। এমন কি সন্তানদের মুখ চেয়ে মরতেও পারতেন না। আপনার ডিপ্রেশনের কেস হিস্ট্রিতে আপনার সন্তানহীনা একটি নিশ্চিত তথ্য, একটি ক্রুশ্যাল ফ্যাক্টর বলে আমার মনে হয়েছে।

আপনার আত্মহত্যা রবীন্দ্রনাথের জীবনের টার্নিং পয়েন্ট। সেইযে আপনি চলে গেলেন, তারপর থেকে একটি চলে যাওয়া মেয়ের ইমেজ তাঁর বাণীকে ছাড়তে চায়নি, বারে বারে তাঁর উপরে ভর করেছে। আমরা বাঙালীরা তাঁকে সব থেকে ভালো করে জানি তাঁর গানের মাধ্যমে। এবং তাঁর কত গানের মধ্যেই না ঐ রকম একটি মেয়ের ছায়া দোলে। সে বিদায় গোধূলি লিখনে শ্যামল তমালবনের পথ দিয়ে চলে যায়, বারে বারে ফিরে তাকায়। ঘাসে জড়িয়ে থাকে সেই চলে যাওয়ার কষ্ট। স্বপ্নে উড়তে থাকে তাঁর কেশরাশি― পুরব পবন বেগে। তাঁর ছায়া আকাশে ভাসে। বিদায় কালে তাঁর কিছু একটা বলার ছিলো কিন্তু সে বলতে পারেনি, মনে দ্বিধা রেখে চলে গেছে। সে স্বপ্নে ঘা দেয় তাঁর দ্বারে। তাঁর প্রতীক্ষায় তিনি বসে থাকেন, তাঁর ডাক তিনি শুনতে পান― কত রাতে, কত প্রাতে, কত গোধূলি লগনে, কত বাদলের দিনে। সে কিছুতেই ধরা দিতে চায় না, পালিয়ে বেড়ায়। আমার তো মনে হয় তাঁর ভালবাসার গানগুলির মধ্যে, তাঁর বর্ষার গানগুলির মধ্যে আপনি একেবারে ওতপ্রোত হয়ে আছেন।

আপনার সাথে মিলিয়ে নিতে না পারা পর্যন্ত তিনি নারীকে তাঁর অন্তরের মধ্যে গ্রহণ করতে পারতেন না; আপনিই ছিলেন তাঁর কাছে নারীর প্রথম সংজ্ঞার্থ, নারীত্বের প্রথম প্রতীক। আপনার দীর্ঘ কেশ, আপনার বড় বড় কালো চোখ— তাঁর মনের মধ্যে গেঁথে গিয়েছিল। ‘তুমি কি কেবলই ছবি শুধু পটে লিখা’; সে তো আপনার ছবিকে লক্ষ্য করেই লেখা।

১৯ এপ্রিল, ১৮৮৪ সালে আপনি মৃত্যুবরণ করলেন, কলকাতার একটি সম্ভ্রান্ত ঘরের অভ্যন্তরে। তাঁর ছ’বছর বাদে, ৭ এপ্রিল, ১৮৯০ তারিখে সুদূর বুয়েনোস আইরেসের একটি সম্ভ্রান্ত গৃহে জন্ম নিলেন ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো। কিছুটা প্রাথমিক দ্বিধা সত্ত্বেও আপনার ভাবমূর্তির সঙ্গে এই মহিলাটিকে মিলিয়ে নিতে পেরেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। আপনার ছায়াঘন কালো চোখের উপরে ভিক্টোরিয়ার উজ্জ্বল নীল চোখকে তিনি সুপারইমপোজ করে নিয়ে ছিলেন। তাঁর শেষ জীবনের চিত্রশিল্পে হানা দেয় যে বিশেষ ধরণের নারি মুখ― চিন্তাগ্রস্ত, ঈষৎ বিষণ্ণ, বড় বড় ভাবুক চোখ― তার মধ্যে কি আপনারা দুজনেই মিশে নেই? ‘মন জানে, এসেছে সে এসেছে।’ ‘বোলো তারে, বোলো- এতদিনে তারে দেখা হল’― মনে হয় রবীন্দ্রনাথের ভিতরে আপনার যে প্রেতসত্তাটা ছিল সেটা ভিক্টোরিয়ার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক স্থাপনের পরে তাঁর সাহিত্যকে খানিকটা রেহাই দিয়ে চলে যায় তাঁর চিত্রশিল্পের দিকে।

ভিক্টোরিয়ার সাথে আপনার মিল ছিল অনেক জায়গায়। আপনার মতো ভিক্টোরিয়াও নিঃসন্তান ছিলেন এবং নষ্টনীড়ও। ওঁরও ছিল ‘ভিতর মহলের ব্যথা’। কিন্তু সে জন্যে তাঁকে মরতে হয়নি। উনি নিজেকে বাঁচিয়ে দিতে পেরে ছিলেন কর্মে, প্রেমে, বন্ধুত্বে। আপনাদের দুজনার মধ্যে স্বভাবের, দেশ কালের, প্রজন্মের, শিক্ষা দীক্ষার, সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিপাশ্বের যে ব্যবধান, সেটা তাঁকে বাঁচিয়ে দিয়েছিল।

ওঁকে তো আর ন’বছর বয়সে বাপের বাড়ি ছেড়ে শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে বড় হয়ে উঠতে হয়নি। ধনী ঘরের আদরিণী প্রথমা কন্যা, তিনি আরামে বড় হয়ে উঠেছিলেন আপন পরিবারের মধ্যে। অনেক দূর লেখাপড়া শিখেছিলেন। ইউরোপ ভ্রমণ করেছিলেন। বান্ধবির সঙ্গে দীর্ঘ চিঠিপত্রে কিশোরী হৃদয়ের গোপন কথাগুলি বিনিময় করার সুযোগ পেয়ে ছিলেন— তাতে কেউ বাধা দেয়নি। ডিভোর্স সম্ভব না হলেও তিনি অন্তত তাঁর নষ্টনীড়ের ভিতর থেকে শারীরিকভাবে বেরিয়ে আসতে পেরেছিলেন। আপনার সমাজ আপনাকে যেভাবে কোণঠাসা করে ফেলেছিল, ভিক্টোরিয়ার সমাজ রক্ষণশীল হলেও তাঁকে ততটা কোণঠাসা করেনি― পালিয়ে যাবার জন্যে অন্তত একটা খিড়কি-দুয়ার খোলা রেখেছিলো, মানুষের মনুষ্যত্বকে এবং ব্যক্তির ব্যক্তিত্বকে আপনার সমাজের চাইতে আরেকটু বেশি মর্যাদা দিয়েছিলো। তাই আপনাকে চলে যেতে হল অসময়ে, নিজের উপরে প্রলয় করে।

রবীন্দ্রনাথ আমাদের বড় আপন, ভীষণ কাছের এবং আশ্রয়ের জায়গা। তাঁর জন্যেও খুব কষ্ট হয়। চক্রবৃদ্ধি হারে বর্ধিত শোকের ভার তাঁকে ক্রমশ ঠেলে দিয়েছে প্রগাঢ়তর আধ্যাত্মিকতার দিকে। আপনি তাঁর ‘নতুন বৌঠান’ ছিলেন। আমি আপনাকে একবার বৌঠান বলে সম্বোধন করলাম।

‘বৌঠান’ বিদায়! ভোর হয়ে আসছে। বিষণ্ণ আলো নিয়ে জাগছে চরাচর। একটু পরেই আমার দরজায় কড়া নাড়বে কাজের মাসি। যাই, একটু হেঁটে আসি। আজ আমার অনেকটা ভালো লাগছে। বেশ ভালো।

ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com