কষ্টেরা অত:পর…

  •  
  •  
  •  
  •  
  • 0
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শিলা চৌধুরী

গত নভেম্বরের আগের নভেম্বর ….কোন এক সন্ধ্যায় হঠাৎই পা বেয়ে মনে হলো গরম স্রোতের মতো কি যেন শরীর থেকে খসে পড়ছে ।বুকটা মোচড়ে উঠেছিল অজানা আশঙ্কায়।সঙ্গে শরীরে অসহ্য যন্ত্রণা। আমার অনিবাবু আমার যন্ত্রণাকাতর অবস্থা দেখে কুঁইকুঁই করতে করতে কি করবে বুঝতে পারছিল না।তারপর ঘড়ির কাঁটার কিছু সময় কোথায় যেন হারিয়ে গিয়েছিল ।যখন তাকালাম আবছা শুধু দেখতে পেয়েছিলাম আমার মেয়ে অনি আমার মুখে কপালে তার  অমূল্য আদরের স্পর্শ বুলিয়ে দিয়ে যাচ্ছে ।মায়ের সঙ্গে আমার রচু পিসিমার মুখটাও অনেক অনেক বছর পর জ্বল জ্বল করে উঠছিল ।হাত বাড়ালাম ছুঁয়ে দেখতে. …! আর তখনি বাস্তবতায় ফিরে আসতে হয়েছিল অসহনীয় শারীরিক যন্ত্রণায় ।ছোটবেলা থেকেই পড়ালেখার খাতিরে বাড়ি থেকে দূরে ।একজন মেয়ের যেসব জানার তার অনেক কিছুই অজানাই রয়ে গিয়েছে।জানতে বা বুঝতে ও পারিনি কখন সন্তানসম্ভবা হয়েছিলাম ।বুঝতে আরো পারিনি কারন তার বছর খানেক আগে থেকে আমি অ্যানিমিয়ার কারনে অনিয়মিত মাসিক ঋতু সমস্যায় ভুগছিলাম ।ভেবেছিলাম হয়তো ওই একই সমস্যায় বন্ধ রয়েছে।আরো একটা কারণ ছিল সবচেয়ে বেশি …।তার কদিন আগে আমার এক আত্মীয়াকে নিয়ে এসপ্লানেড যাচ্ছিলাম আর  বেলগাছিয়া মেট্রো রেলে চড়ে পেছন ফিরে দেখি উনি তখনো সিঁড়িতে ।এদিকে মেট্রোর স্বনিয়ন্ত্রিত দরজা বন্ধ হবার উপক্রম দেখে নামতে গিয়ে পা ফসকে প্ল্যাটফরম আর মেট্রোর মাঝখানে এক পা সহ কোমর আটকে যায়।এক হাতে দরজার পাল্লা আটকে উঠার চেষ্টা করে যাচ্ছিলাম মুহূর্তের মধ্যেই, নয়তো একবার হাত ফসকাল তো দরজা বন্ধ হয়ে মেট্রো চলা শুরু করবে।মেট্রোর ভেতর থেকে কেউ এগিয়ে আসনি সাহায্যের জন্যে।মৃত্যুর আতংকে দিশেহারা হয়ে কাউকে বাইরে ডাকার জন্যে স্বর বেরোচ্ছিল না কোনও ।সবাই তখন বাইরে যাওয়ায় ব্যস্ত ।আমার আত্মীয়াকে ও এগিয়ে আসতে দেখলাম না ।হয়তো সৃষ্টিকর্তা চাইছিলেন অধমটা আরো কিছুদিন থাকুক পৃথিবীতে ।একটা স্কুল পড়ুয়া ছেলে পিছনে ফিরে তাকিয়ে স্কুল ব্যাগ ছুড়ে এক দৌড়ে ছুটে এসে আমায় টেনে তোলে। হাটু আর হাতের চোটেই আটকে ছিলাম প্রাথমিক  চিকিৎসার পরে ।পরদিন ডাক্তারের কাছে যাবার পর জানতে পারলাম সর্বনাশ যা হবার তা ঘটেই গিয়েছে ।মা হবার স্বপ্ন শেষ আমার। ভাবিনি তখনও হবে না আর আমার মা হওয়া ।মা আর পিসিমা বা ঠাম্মী পাশে থাকলে হয়তো বা বুঝতে পারতাম. …।পিসিমা দুরারোগ্য ক্যান্সারে অনেক আগেই. …আর ঠাম্মী ও তিন বছর নেই ।মা ঢাকায়. …পাঁচ পাঁচটা বছর দেখিনি ।কষ্টের ভাষা গুলো তাই ভেতরেই গুম হয়ে ফেরে ভীষণরকম ভাবে ।যখনি কেউ আমার অনিকে বলতো …মা কোথায় ? আমার আত্নজা নয় শব্দহীন চতুষ্পদ প্রানীটা যাকে আমি আর আমার স্বামী হাতের মুঠোয় করে পরিবারের সদস্য করেছিলাম ছ বছর আগে সে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে আদর করে দেখিয়ে দিতো আমিই ওর মা…..।অনুভূতিটা হয়তোবা অনেকেরই কাছে হাস্যকর কিন্তু সেই নির্ভেজাল প্রতিদান প্রত্যাশাহীন ভালোবাসার মূল্যের ছোঁয়ার পরশ মৃত্যুর আগে পর্যন্ত রয়ে যাবে ।রয়ে যাবে মা মেয়ের সুখ দুঃখের পরিভাষা গুলো ।আজ দু মাস আমার ঘর শূন্যতায় ঢেকে ।রয়েছে শুধু বুক চাপা কান্না ।কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না তার গুটিগুটি পায়ে পায়ে চলার স্পর্শ ।

রোজ রাতে নয়াপট্টির পাড়ায় শিবু পাগলাটা  পুরো পাড়ায় একাকী হেঁটে বেড়াবে আর উচ্চ স্বরে বকে যাবে । একটু ভালো করে কান পাতলেই বুঝতে বাকি থাকে না  পৃথিবীর তাবৎ জনগনকে উদ্ধার করে বেড়াচ্ছে সবকিছু থেকে । একবার সরকার কে গালি দিতে ব্যস্ত আবার তার ইশ্বরকে দোষারোপ ।নয়তোবা হেসে কুটি কুটি হয়ে কোন নাম না জানা মেয়ের উদ্দেশ্য প্রেমের বানী ছুড়ে দিতে  ব্যস্ত কখনোও বা আবার  রোমান্টিক গান গেয়ে ওঠায়।আমাদের ঘরের কোনের মন্দিরের ঘন্টাটাকে গুনে গুনে  এগারো বার বাজিয়ে যাবে । একটা কম ও না আবার বেশি ও না।তারপর পকেট থেকে  একটা বিস্কুটের প্যাকেট বের করে নিজে খাবে  আর রাস্তার সারমেয় গুলোকে খাওয়াবে ।তার পর খোল করতাল বাজাতে বাজাতে নগর কির্তনীয়ার দল কির্তন করতে করতে যাবেন । মন ভালো করা পাখিদের কলতানের সঙ্গে আস্তে আস্তে ভোরের  আলোর ফুটে ওঠার সঙ্গে  নিস্তব্ধ রাতকে বিদায় জানিয়ে যায় রাস্তার জলের কলে বাসন মাজার ঠুংঠাং আওয়াজ।বড়দের হাত ধরা ঘুম চোখে  স্কুলের পথে হেঁটে চলা ছোট্ট গুটি পায়ের মিঠে শব্দে ।নয়াপট্টি ছেড়ে চলে এসেছি  ছ মাস হতে চলেছে । এই সেদিন নতুন পাড়া থেকে সবজি বাজার যাচ্ছিলাম পেছন থেকে কে যেন হাত টেনে বল্লো মা কোথায় যাচ্ছিস তুই….।তাকিয়ে দেখি সেই শিবু পাগলাটা ।সঙ্গে সঙ্গে হেঁটে যাচ্ছে আর বলছে তোকে কতোদিন দেখিনা যে  কোথাও. ..!! চমকে গেছি শিবু পাগলাটার কথায় ।বল্লাম তুমি চেনো আমায়…?

হলদেটে দাঁতে  অট্টহাসিতে রাস্তায় বসে পড়লো।তুই আমার  মা তো ওই যে ওই বাড়ির আমার ।মা রে যাই বলে আধ ময়লা উসকো খুসকো লম্বা ঝাকড়া চুল ভর্তি  মাথা চুলকাতে চুলকাতে তার আপন পথ ধরলো….।বাজারের থলে হাতে এগুচ্ছি আর ভাবছি শিবু পাগলাটা কি এরই মধ্যে সুস্থ হতে শুরু করেছে ।মনে রাখলো কি করে. …।মনে মনে অদৃশ্য বিধাতাকে বল্লাম আর কতো….! অন্তত এই মা ডাকটার জন্যে ওকে ওর জগতটাকে অনুভব করতে দাও ।

ফেসবুকে বছর দুই হলো পিকুর সঙ্গে  পরিচয় ।দিদি কেমন আছো ,কি লিখছো,অনি কি করে তোমাকে নিয়ে এসব কথাতেই থেমে ছিল  বাকিটুকু । বেশ কিছুদিন ধরে বলে আসছিল আমি ভালো নেই, পড়তে পারছি না ।ওহ  আফ্রিকার একটা দেশে ওর সৎ মায়ের সঙ্গে থাকে ।বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে ।বাবা কুটনৈতিক পর্যায়ে কর্মরত এশিয়ার একটা দেশে ।এটুকুই জানতাম ।পাত্তা দেইনি তেমন ।একটা এসএমএস ….”তোমাকে মা ডাকলে কি আমার কথা শুনবে , আমায় বাঁচাবে ।” আর কি করে চুপ থাকা যায়. ..। পিকুর কথা শুনে দুদিন চোখের পাতা এক করতে পারিনি । কি জবাব দেবো ভেবে পাচ্ছিলাম না ।

পিকুর জন্ম দিতে গিয়ে বিধাতার  অশেষ কৃপায় ওকে একলা পথে ফেলে ওর মা মারা যান ।তারপর নতুন মম এর আগমন।চাকরির সুবাদে ওর বাবা নানা দেশ ঘুরে ফেরেন।জানতে ও পারেন না ওনারই সন্তান কতোটা কদর্য নির্মমতায় একলা কেঁদে ফেরে ।পড়াশোনার জন্যে পিকু ওর মম -এর সঙ্গে ।মম..!!! যিনি ওর মায়ের শূন্যতায় শ্রদ্ধার আসনে থাকার কথা আর সেই তিনিই কিনা পিকুকে যৌন হয়রানি করে আসছেন ।আর তার পরিনামে পিকু আজ নিজেকেই নিজে ভয়ে চার দেয়ালে ঘুমড়ে ফেরে ।বাইরের আলো থেকে একলা নিজের কাছেই মুক্তি খুঁজে । হায়রে শৈশব, হায়রে কৈশোর আর যৌবনের অভিশপ্ততা।ধিক্‌ সম্পর্কের সুতো. …।মনে মনে কখন হয়ে উঠেছি পিকুর মা জানতেই পারিনি ।আমার অদৃশ্য ছেলেটা অনেকটাই তার আলোয় ফিরে  আসতে পেরেছে এখন ডাক্তারের পরামর্শে ।গত পরশু ফোন করে আমায় বল্লো  – মা আমি ভলিবল খেলতে যাচ্ছি । কষ্ট গুলো ও আমার আলোর ভেলায় কাছে ফিরে কিছুটা মায়ের স্পর্শ দিয়ে যায় যখন মা দিবসে পিকুর এসএমএস আসে. …মা – বুঝতে পারলাম মায়েরা তোমারই মতো হয় । সেটা অনুভব করতে আমার এতো গুলো পেরিয়ে গেছে….!?

কলকাতা প্রতিনিধি

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com