কত সে স্বপ্নের দিন…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ফেইসবুক এর গরম আড্ডা চালাতে পারেন প্রাণের বাংলার পাতায়। আমারা তো চাই আপনারা সকাল সন্ধ্যা তুমুল তর্কে ভরিয়ে তুলুন আমাদের ফেইসবুক বিভাগ । আমারা এই বিভাগে ফেইসবুক এ প্রকাশিত বিভিন্ন আলোচিত পোস্ট শেয়ার করবো । আপানারাও সরাসরি লিখতে পারেন এই বিভাগে । প্রকাশ করতে পারেন আপনাদের তীব্র প্রতিক্রিয়া।

লুতফুন নাহার লতা

এসো হে বৈশাখ….
কত না অনাদি কালের কত সে স্বপ্নের দিন। আমাদের শুভ নববর্ষ। আমাদের পয়লা বৈশাখ। এই দিনে কত না আশা আনন্দের ঝর্ণাধারা বয়ে গেছে এই বাংলার নদী ছুঁয়ে ছুঁয়ে। মানুষের প্রানে জেগেছে নতুন চর নতুন আশা স্বপনের। পুরনো মলিনকে ধুয়ে মুছে পেছনে ফেলে জীবনের অমল ধবল পালে আবারো লেগেছে মন্দ মধুর হাওয়া। এই তো আমার দেশ। এই আমার সংস্কৃতি। এইই আমার সভ্যতা।

আমাদের মা বাড়ীতে সবসময় এই দিনটি একটু আলাদা করে পালন করতেন। আগের দিন দুটো ব্যাস্ত থাকতেন চৈত্র সংক্রান্তি নিয়ে। ধোয়া মাজা কাচাকাচি চলতো খুব। আমাদের নানা রঙের ঘুড়ি কিনে দিতেন। কিভাবে ঘুড়িতে মাঞ্জা দিতে হয় মা শিখিয়েছিলেন। আমার ভাই মানিক সেই মাঞ্জা দেয়া নিয়ে বাড়ীতে হুলুস্থুল শুরু করে দিত। আটার মত কি সব রান্না করে সারাদিন রোদে ফেলে সুতোয় মাঞ্জা দেয়া। সুশীল কাকার বাড়ীর সামনের মাঠে সেই ঘুড়ির ভো কাট্টা চলতো। নারকেল, তিলের নাড়ু, মুড়ির মোয়া চিড়ের মোয়া খাওয়া চলত সারাদিন।কত্ত রকম রান্না যে করতেন মা। তেতো, শুক্তো, বড়ি দিয়ে ডালনা, টক , ঝাল, মিষ্টি। ফেরিওয়ালা ডেকে ছাপার কাপড় কিনে আমার মামীকে দিয়ে বানাতেন আমাদের নতুন কাপড়। সারা বছর ধরে এসব প্রস্তুতি চলত মায়ের। মনে পড়ে ঘোষেদের ভিটেতে পুকুর পাড়ের বিশাল মাঠে সেদিন আড়ঙের মেলা হত। মা সেখানে সঙ্গে করে নিয়ে যেতেন। অথবা কারো সঙ্গে পাঠাতেন। মাটির ব্যাংক ভেঙে সারা বছর জমানো টাকায় কেনা হত মাটির পুতুল। মুখে তুলোর দাড়ি লাগানো স্প্রিঙের গলা কাঁপানো দাদু। খেলার হাড়ি পাতিল, বাঁশের ভেপু, পাতার বাঁশি কাগজের ফুল। আমার ভাই মানিকের জন্যে রাংতা দেয়া টিনের তলোয়ার। কী আনন্দ! কী আনন্দ! বাবা সঙ্গে করে নিয়ে যেতেন ধর্মসভার মোড়ে, বড় বাজারে আর শহরের বড় বড় মিষ্টির দোকানে হালখাতা করতে। মিষ্টি খেতে খেতে পেট ফুলে যেত আমাদের। বাবা আগের পাওনা টাকা মিটিয়ে দিয়ে নতুন খাতা খুলে আসতেন।

সব সময় এদিনে আমিও মায়ের মত প্রান ভরে আনন্দে থাকি। নতুন শাড়ি পরে সবাইকে নিয়ে মেলায় ঘুরি। কিছু না কিছু টুক টাক কেনাকাটাও করি। নিজের পছন্দ মত এটা সেটা রান্না করি। বন্ধুরা সবাই জানে অনেক পদে রান্না করতে খুব ভালবাসি আমি। এবার পয়লা বৈশাখে রান্না করবো খেজুর গুড়ের পায়েস। দুধ চিতই পিঠা অনেক নারকেলে ডোবানো। রান্না করবো গরম ভাত, নিজের হাতে বানানো ঘি, আলু ভর্তা,শুকনো মরিচ দিয়ে পোস্তোর ভর্তা। নিম পাতা ভাজি, (ফ্রীজারে আছে, দেশ থেকে এনেছিলাম) কাঁচা করল্লার ভরতা, মচমচা আলু চিংড়ি করল্লা ভাজি। একটা কোন মাছ আর বেগুন তো ভাজতেই হবে। বাজারে সজনে ডাটা পেলে লম্বা আলুর ফালি দিয়ে শর্ষে মেখে রাঁধব। নারকেলের দুধ দিয়ে শোল মাছের বিরেন করব। কৈ মাছ কুমড়ো বড়ি টমেটো আলু দিয়ে কমলা রঙের ঝোল করব। লেবু পাতা দিয়ে কেচকি মাছ। মুগ ডাল আর মার্কের প্রিয় ডিমের কোরমা। অনেক আইটেম হল। তা হোক এদিন আমার অনেক বড় দিন।

বাচ্চা ইলিশ আর ভয়াবহ দাম দেখে অনেক দিন হল ইলিশ খাই না। এবারেও খাবনা। এবারে বোধ হয় ইলিশ বাঁচাও বলে একটা সোর উঠেছে, তা বেশ, সত্যিই তো কেবল বৈশাখেই পাগল হয়ে ইলিশ খেতেই হবে সেই অযৌক্তিক কাজটি আমি করব না। ইলিশ খাব যখন মনের মত বড় সড় ইলিশ পাব রিজনেবল প্রাইসে, তখন। এতো বাচ্চা ইলিশ খেতে মায়া হয়। আবার ডিমওয়ালা ইলিশ খেতেও মন কেমন করে। দু এক বছর ইলিশ না খেতে পারলে ভাল হতো ইলিশের বিস্তারের জন্যে। আসলে বাচ্চা বা ডিমওয়ালা ইলিশ ধরার উপরে একটা বিধান নির্ধারন করা উচিত এবং কঠিন ভাবে তা পালন করাও দরকার।

ছোট্ট বেলা থেকে একটা স্বপ্ন ছিল। ভাবতাম, যখন বড় হব তখন বিয়ে করবো পয়লা বৈশাখে। জীবনের যে স্বপ্ন পূরণ হয় নি এক জীবনে, আমার এই অন্য জীবনে মার্ক আনন্দে তা পুরন করতে এগিয়ে এসেছে। পয়লা বৈশাখ আমার বিয়ের দিন। এদিন আমার বাসায় সবার জন্যে দুয়ার খোলা। সারা দিন চলবে খাওয়া, গল্প, কবিতা গান আর বিকেলে মেলায় যাওয়া। মাথায় ফুল গুঁজে দিয়ে পরবো সুতির শাড়ী আর সারা দিন হাসবো। মার্ক আর সিদ্ধার্থ পরবে পাঞ্জাবি।

এদিন অনেক বড় দিন। আমার সংস্কৃতি আমার সভ্যতার দিন। আমি এই আকাশ আলোক বায়ু সৌরমণ্ডলীর কাছে, এর সৃষ্টির আদি রহস্যের কাছে আমার প্রনতি জানাব। জানাব আমার কৃতজ্ঞতা প্রকৃতির প্রতিটি উৎসের কাছে, সকল অন্ধকারের বুক চিরে আসা মুক্তির আলোয় অবগাহন করবো। প্রার্থনা করবো সবার মঙ্গল। সবার ভাল। আমার দিন শুরু করবো একটি গান নিজের কন্ঠে গেয়ে। সে গান আমার প্রার্থনার গান।

‘আলোকের এই ঝর্ণাধারায় ধুইয়ে দাও….. আপনাকে এই লুকিয়ে রাখা ধুলার ঢাকা.. ধুইয়ে দাও…. যেজন আমার মাঝে জড়িয়ে আছে ঘুমের জালে, আজ এই সকালে ধীরে ধীরে তার কপালে, এই অরুণ আলোর সোনার কাঠি ছুঁইয়ে দাও……..’

লেখাটি আগের কিন্তু এর আবেদন সকল সময়কে ছুঁয়ে যায়। আর এইই আমার প্রানের কথা এমন দিনে। চৈত্র সংক্রান্তির ভেতর দিয়ে কেটে যাক সকল মলিনতা। জেগে উঠুক আবার বাংলার নূরলদিন। আবার একবার এই কালপূর্ণিমা দিক ডাক, জাগো বাহে … কোনঠে সবাই….।

ছবি:গুগল

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com