ও মা, এক দিন বিকেলে গান নিয়ে বসবে…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ফেইসবুক এর গরম আড্ডা চালাতে পারেন প্রাণের বাংলার পাতায়। আমারা তো চাই আপনারা সকাল সন্ধ্যা তুমুল তর্কে ভরিয়ে তুলুন আমাদের ফেইসবুক বিভাগ । আমারা এই বিভাগে ফেইসবুক এ প্রকাশিত বিভিন্ন আলোচিত পোস্ট শেয়ার করবো । আপানারাও সরাসরি লিখতে পারেন এই বিভাগে । প্রকাশ করতে পারেন আপনাদের তীব্র প্রতিক্রিয়া।

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

প্রায় দিনই কমলা বিকেলগুলো নিভে আসার মুখে কালো বাক্সটা বেরোত খাটের তলা থেকে…। ডালা খুলে ভেতর থেকে বার করা হতো তাকে…। ভারী, তাই একটু কোলকুঁজো হয়ে যেত মা…। দেখে যেন মনে হতো, বুক দিয়ে আগলে, অতি আদরে, সন্তর্পণে জিনিসটাকে বার করা হচ্ছে…।

হারমোনিয়াম…।
কালো…।
সিঙ্গল-বেলো…।

ওই কুঁচি কুঁচি বেলোর হারমোনিয়ামগুলো দেখতে ভাল লাগত খুব, কিন্তু আমাদের বাড়িরটা ওমনি ছিল না…। একটাই বেলো…। মা সব ক’টা রিড চেপে বেলোটা টেনে হারমোনিয়ামের পেট থেকে হাওয়া বার করে নিতো এক বার…। তার পর সামনের ছোট ছোট বোতামগুলো টেনে টেনে লম্বা করতো…। তার পর…..
মায়ের আঙুলগুলো হেঁটে বেড়াত সাদা-কালো রিডগুলোয়… চোখ বন্ধ, গলায় সুর-শব্দের স্বতঃস্ফূর্ত মেলবন্ধন…সামনে কোনও স্বরলিপি নেই, শব্দ নেই, কিচ্ছু নেই…। রিডের দিকে চোখও নেই…। তখন আমার অপার বিস্ময় ওটাই, না-দেখে কী করে ঠিক জায়গায় ঠিক আঙুল ফেলে মা…!

আমার খেলে ফেরা আর বাবার অফিস থেকে আসার মাঝখানের সময়টুকুতে এই ছিল আমাদের দু’জনের অনুরোধের আসর…।

পাশে বসা আমার হাতে গীতবিতান…। একটা একটা করে পাতা উল্টোচ্ছি, যে গানের প্রথম লাইনটা ভাল লাগছে, মাকে বলছি…। মা গাইছে একের পর এক…

তোমারও অসীমে…
আমি কেবলই স্বপন…
আমার প্রাণের মাঝে সুধা…
আজি ঝরঝর মুখর বাদর…
প্রাণ ভরিয়ে, তৃষা হরিয়ে…
কত বারও ভেবেছিনু…
তুমি রবে নীরবে….. আরও কত কী…

মাঝে মাঝে বদমাইশি করতাম…। মনে মনে মাকে চ্যালেঞ্জ করে, প্রতিটা পাতা থেকে একটা করে এলোমেলো গান বলে দিতাম…। যা খুশি তাই।
প্রতিটা গান দু’লাইন করে হলেও গেয়ে দিতো মা, তা-ও হারমোনিয়াম বাজিয়ে…।

জগতের সব সুর মা কী করে ওই সাতটা রিডে বেঁধে ফেলতো ঘুরিয়ে ফিরিয়ে…!

শুধু রবীন্দ্রসঙ্গীত নয়, অতুলপ্রসাদ, দ্বিজেন্দ্রনাথ, রজনীকান্তকেও সমান সাবলীলতায় গেয়ে যেত মা…।
একা মোর গানের তরী…
বঁধুয়া নিদ নাহি আঁখিপাতে… তুমি মধুর ছন্দে…
কবে তৃষিত এ মরু…
আমি অকৃতী অধম…

কী ভাল লাগতো গানগুলো ওই অত ছোটবেলাতেও…!!

আমার গাইতে ভাল লাগতো না… শুধু শুনতাম…। গাইতে গাইতে কখনও মায়ের বন্ধ চোখের তলা দিয়ে জল পড়তো…। দেখতাম…। তার পর বাবা এলে, মা চা করতে উঠলে, হারমোনিয়ামটাকে নিয়ে প্যাঁ প্যাঁ করতাম খানিক, ওটুকুই…। কখনও অনেকটা শুধু শুধু বেলো করে তার পর রিডগুলো চেপে চ্যাঁ করে আওয়াজ বার করতাম, কখনও বা পেটের বোতামগুলো ইচ্ছেমতো বার করে, ঢুকিয়ে আওয়াজের তফাৎ বুঝতে চাইতাম…। তার পর মা এসে বকত, হারমোনিয়াম নিয়ে না খেলে সরগমটাও তো সাধতে পারিস…!
কী করবো…! ভাল লাগত না আমার সারেগামা, সারেগা-রেগামা, সাগারে-রেমাগা….এই একঘেয়ে ওঠাপড়া…।

আমি তো গান শোনার জন্য বা গাওয়ার জন্য ঠিক নয়….. মাকে দেখতাম শুধু…

তার পর এক সময় প্রতিটা মধ্যবিত্ত বাড়ির বালিকার মতোই পুরনো ডায়েরি (বুকে চেপে নয়, রীতিমতো লোফালুফি করতে করতে) নিয়ে পাড়ার গানের স্কুলে যাওয়া শুরু করেছিলাম… ওই যাওয়াই হলো বছর চারেক…।
আমার ক্লাসিক্যাল গাইতে ভাল লাগতো রবীন্দ্রসঙ্গীতের চেয়েও…। প্রতিটা রাগকে এক একটা নতুন অঙ্ক মনে হতো… স্টেপ বাই স্টেপ বিস্তার দিয়ে শুরু করে দ্রুত লয়ে তান দিয়ে শেষ করার তৃপ্তি পেতাম…।
রবীন্দ্রসঙ্গীতে মজা পেলাম না…। পাব কী করে, চার বছর ধরে শিখেও মায়ের মতো করে বাঁধতে পারিনি যে একটা সুরও…।

আসলে, সুর শিখে বাঁধা যায় না…। ওটা ভেতরেই থাকে…। আমার নেই…। অনেক পরে বুঝেছি…।

রবীন্দ্রসঙ্গীত ভাল লাগতে শুরু করে, ‘গানের ওপারে’ দেখতে শুরু করার পর থেকে…। এই জায়গাটায় এসে অনেকেই খিস্তি করবেন, কিন্তু আমার কিছু করার নেই, ভাল লাগতো…। নিজের মতো করে, গলা খুলে, হাত ছড়িয়ে রবীন্দ্রসঙ্গীত আমার ভাল লাগতো…। আজও লাগে…। ওই একটা সিরিয়ালই বোধ হয় অমন গোগ্রাসে দেখেছি এই জীবনে…। প্রথমে গোরা মানে অর্জুনের প্রেমে পড়লাম, পরে স্যমন্তকের…।

এখন বিকেল নেই জীবনে…। সিরিয়ালও নেই…। গান নেই…।
ভুল বললাম… গান আছে মোবাইল ভরা, সময় নেই শোনার…।

ছোটবেলার প্রতি বিকেলে গান-পর্ব সারা হওয়ার পর মা ফের যত্ন করে ঢুকিয়ে রাখত বৃদ্ধ হারমোনিয়ামটাকে…। প্রথমে সব রিড চেপে, বেলো করে হাওয়া বার করে দেওয়া… তার পর পেটের বোতামগুলো ঢুকিয়ে দেওয়া… তার পর একটু কোলকুঁজো হয়ে… বুক দিয়ে আগলে… অতি আদরে… সন্তর্পণে…।

শেষের দিকে কালো কাঠের বাক্সটায় ঘুন ধরেছিল…। ফেলে দিতে হলো…। দরজার পুরনো পর্দা কেটে হারমোনিয়ামটার একটা জামা বানিয়ে পরিয়ে রাখা হল…। ওমনিই আছে এখনও … খাটের তলায়…। বার করা হয় না…।

এখনকার স্মার্ট বিকেলে সে বেমানান…।

আমার নিজের রবীন্দ্রনাথ বলতে ওই বেমানানটুকুই…।

আর এই লেখাটার মতোই, আমার রবীন্দ্র জয়ন্তী আর মাতৃদিবস ঘেঁটে যায় প্রতি বছর…:)

ছবি: গুগল

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com