ও বন্ধু আমার…

  •  
  •  
  •  
  •  
  • 0
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

অ্যাডভোকেট দিলরুবা শরমিন

আমাদের ছেলেবেলায় বন্ধু হতো স্কুলে, পাড়ায়। তাদের সঙ্গেই কাটতো দিনের বেশীরভাগ সময়। খেলাধূলা, গল্প-স্বল্পের শেষে মাগরিবের আজান পড়তেই ধূলি মাখা ক্লান্ত শরীরে ভয়ে ভয়ে বাসায় ফেরা। ভয়ে ভয়ে এই কারনে যে এই ধূলি মাখা ক্লান্ত শরীর এখুনি ঘুমিয়ে পড়তে চাইবে । কিন্তু সেই উপায় ছিলো না । আমাদের যশোরের ষষ্টীতলা পাড়ার সুরেন্দ্রনাথ রোডের সেই একতলা বাড়ীতে শান বাধানো চমৎকার কল-পাড় এ গিয়ে ঝপাঝপ বালতি বালতি পানি কল চেপে বের করে একসঙ্গে হুল্লোড় করে জয়ন্তী আমি আশীষ এর গোসল করে নেয়া ছিলো নৈমিত্তিক ব্যাপার । মাঝে মাঝে দূরন্ত জয়ন্তী ও আশীষ আমাদের বাধানো বিশাল পুকুরে ঝাপিয়ে পড়ে পুকুরের এমাথা ওমাথা সাঁতার কেটে গোসল সেরে নিতো । আমি পারতাম না । পুকুর আর পানি আমার কাছে খুব ভয়ের ব্যাপার ছিলো । তাছাড়া আমি একটু শূচিবাই গোছের সেই শিশুকাল থেকেই ।
পাড়ার বন্ধুদের সঙ্গে ডাং-গুলি খেলা, গোল্লাছুট , দড়িয়াবান্দা , রিক্সা বা সাইকেলের বাতিল রিং কে চাক্তি বানিয়ে সেটা ছুড়ে ছুড়ে চাড়া খেলা , সিগারেটের পুরানো প্যাকেট কে টাকা হিসাবে গণ্য করা , বুড়ি ছোয়া , হাডুডু, এক্কা দোক্কা এই রকম কত নামের আকর্ষণীয় মজাদার নির্মল আনন্দদায়ক খেলাই না ছিলো ! এর পর একটু বড় বেলায় এলো ফুটবল , ভলি বল, ব্যাডমিন্টন, এমন কি ক্রিকেটও । এই গুলো হলো আমাদের সময় ‘জাতে ওঠার খেলা’ খ্যালা জাতে ওঠা মানে বয়সে বড় হয়ে যাওয়া। এর পর আরেক ধাপ এগিয়ে খেলা থমকে দাড়ালো দাবা , ক্যারাম বোর্ড আর তাস-এ ।
স্বাধীনতার পর পর আমাদের শৈশব শুরু হয়েছিলো। তাই আমরা ছোটদের মুক্তিযুদ্ধর খেলাও খেলতাম । গাছের শুকনা , মরা , ভেঙ্গে পড়া ডাল দিয়ে নানা হাতিয়ার বানিয়ে চলতো মুক্তিযুদ্ধ খেলা আমাদের।
তাই বলে পুতুল আমরা খেলি নি বা পুরানো কাপড় দিয়ে পুতুল বানাই নি এমন খারাপ ছিলাম না । মায়ের সঙ্গে দরজি বাড়ী গিয়ে টুকরো কাপড় কুড়িয়ে এনে তৈরী করতাম পুতুলের নিত্য নতুন পোষাক ! মনে হতো যেন আমিই সেই পোষাকের নায়িকা ! ম্যাচের খালি বাক্স রঙ্গিন কাগজে মুড়িয়ে তার উপরে ছবি একে টেলিভিশন বানানো , সেভেন আপ ব্লেডের সাদা ধবধবে খাপ কে ফ্রিজ বানাবো , বাটার জুতোর কাগজের বাক্সকে নানা আকার দিয়ে একতলা বা দোতলা বাড়ী বানানোয় ছিলো আমাদের আনন্দময় ভূবন ।
পাড়ার সকলেই ভাইবোন নয়তো বন্ধু । মায়ের বন্ধুরা সব খালা আর মামা । বাবা ছিলো না তাই কাউকে চাচা বা ফুপু ডাকতে হয় নি । প্রচন্ড দুর্ভিক্ষের সময় আমরা কিছুই বুঝি নি । মা- পাড়ার খালা মামারা স্বউদ্যোগে বড় হাঁড়ি ভরে ঢ্যালা খিচুড়ি রেঁধে সকলের জন্য খাবার এর ব্যবস্থা করতো । মা ব্যস্ত ছিল রেড ক্রস, ইউনিসেফ, স্যালভেশন আরমির হয়ে কাজ করা নিয়ে। আমরা যখন খবর পেতাম আজ যশোর রেল স্টেশনে গরীব মানুষদের জন্য রিলিফের খাবার দেয়া হবে পাড়ার দলবল নিয়ে ছুটে যেতাম সেই সব টিন জাত বিস্কিট, জুস, দুধ বা শুকনা খাবারের আশায় ।
হতাশ হয়ে ফিরে আসতাম ! ভয়ংকর অগ্নিমূর্তিধারী আমার দেবী মাকে দেখে ব্যর্থ মনে ফিরে আসতাম । পাড়ার সকলে তখন আমাদের তিন ভাই বোন কে সমানে দোষ দিতো। হায়রে সেই যে রিলিফের খাবার না খেতে পারার দুঃখ আজো বড্ড ব্যথা দেয় মনে । তারচেয়েও ভয়ংকর মুহূর্ত অপেক্ষা করতে আসন্ন সন্ধ্যাতে ! মা ফিরে এলে যে কি হবে আমাদের !!!
অসাধারন শৈশব শেষ হয়ে গেলো আমার লৌহ কঠিন মায়ের জন্য । কেবল গোল্লাছুটে তো আর প্রাণ ভরবে না তাই বাধ্যতামূলক যশোর পাবলিক লাইব্রেরীতে বৈকালিক যাতায়াত করা হয়ে গ্যালো “ ফরজ -এ –আইন”। শুধু কি যাওয়া আসা ? শুধুই স্রোতে ভাষা ? সে চলবে না । যুক্ত হয়ে গেলো রাতের খাবারের টেবিলে কে কি পড়লাম সেই জিজ্ঞাসাবাদ । কার কোন বই ভালো লাগলো এই সব গল্পে গল্পে পরীক্ষা নীরিক্ষা । আমাদের পড়াশুনার কোন বাছ বিচার ছিলো না । সব পড়তে হবে । ভালো মন্দ পড়ে আগে তো পড় । পাঠাভ্যাস হোক । সেই যে নেশা ধরিয়ে দেয়া তারপর পড়ার জগতে আর কিছু বাছ বিচার করে দেবার দরকার হয় নি ।
কোন সময়ে যে ধরে নিয়ে গিয়েছিলো সুরবিতান সঙ্গীত একাডেমীতে সেও মনে নাই । একের পর এক শুধু যুক্ত হয়েছে পরিধি । কখন যে খেলা ধূলা ছেড়ে বই বন্ধু হয়েছে জানিনি । কখন বা গান বাজনা সঙ্গী হয়েছে সেটাও বুঝিনি । এইভাবেই আমার বন্ধু পরিধি বেড়েছে । আজ অব্দি শত্রু খুজে পাই নি । সকল মানুষকে বন্ধুই মনে হয়েছে । ক্লাস সেভেনে পড়ার সময় হঠাৎ করেই রাজনীতির মাঠে ঠেলে পাঠানো । সময় তখন ভালো না । জিয়াউর রহমানের আমল । তবে ব্যাক্তি জিয়াউর রহমান সাহেব আমার মা’কে বেশ সম্মান করতেন তাই খুব যে ঝামেলা পোহাতে হয়েছে সেটা নয় বরং বঙ্গবন্ধুর আমলে রক্ষীবাহিনীর অত্যাচারে আমার ভাইয়েরা অনেক কষ্ট করেছে ।
এইভাবে আমার বন্ধু রাজনীতিও হয়ে গিয়েছিলো । যশোর – ছোট্ট মফস্বল শহর – সরু রাস্তার জীবন – সুরেন্দ্রনাথ রোডের একতলা বাড়ীর চারিদিকে কেবল আলো ঝলমল করতো যার জন্য সে আমার বন্ধু। বাড়ীর চারপাশের যে সবুজ মাঠ সেও আমার বন্ধু । টলমলে ঝকঝকে জল ভরা যে পুকুর সে আমার বন্ধু । মাঝরাতে যে রিক্সাওয়ালা শীষ দিয়ে দিয়ে রিক্সা নিয়ে তার খুপড়িতে ফিরতো সেই না দ্যাখা রিক্সাওয়ালার সুর আমার বন্ধু । অথবা হাওয়াই মিঠা বিক্রী করতে বা বায়োষ্কোপ দেখাতে যে খুনখুনে বয়ষ্ক ভদ্রলোকদ্বয় পাড়ায় ফি সপ্তাহে আসতো তিনিও আমার বন্ধু । সন্ধ্যাবেলায় ঘটি গরমের শব্দ শোনার জন্য যেভাবে উৎকন্ঠিত হয়ে থাকতাম সেই শব্দ আমার বন্ধু । অথবা আধা বাংলা – আধা হিন্দি আধা উর্দূতে গান গেয়ে মাঝ রাতে রোযার মাসে ঘুম ভাঙ্গাতো যেই সব অচেনা / না দেখা মানুষ গুলো ও তাদের সুর আমার বন্ধু ।
পাড়াতেই রামকৃষ্ণ মিশন । বিশাল সবুজ মাঠের মাঝে সাদা ধবধবে মঠ । মন্দির । সন্ধ্যে নাগাদ শুরু হতো পূজা পার্বনের টুংটাং শব্দ ধূপের ধোয়া আর একটা মিষ্টি গন্ধ । সেই শব্দ – সুর – গন্ধ আমার বন্ধু । অথবা পূজোর মেলার গজা – খাজা – কটকটি বা মাটির যত সামান্য খেলনা বা ভীড় অথবা হঠাৎ পাওয়া পূজোর প্রসাদ আমার বন্ধু । এইভাবে ক্রমাগত আমার বন্ধু বেড়েছে । বন্ধু কেবল মনুষ্য শরীর নয় বন্ধু অনুভবে !!!

ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com