ও আমার প্রিয়তমা মহীয়সী গন,তোমাদের পেয়ে আমি ধন্য

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শিল্পী কনকচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখছেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো।

কনকচাঁপা বার বার ভাবি, ভেবে আপ্লুত হই,গর্বিত হই,কিন্তু অহংকার আমাকে ছোঁয় না,কারণ আমি আমার মহীয়সীদের কাছ এভাবেই গর্ব আর অহংকার আলাদা করতে শিখেছি।

মা আমার খুব সচ্ছল পরিবারের বড় আদুরে কন্যা ছিলেন।বাবা তার নামকরা শিক্ষক, তাঁর কাছ থেকে পড়াশোনা, নৈতিকতা, নিয়মানুবর্তিতা, সময়ানুবর্তীতা, সব শিখেছেন।আর মায়ের কাছ থেকে শিখেছেন বন্ধু বাৎসল্য, দান-খয়রাত। অপূর্ব শিক্ষার সম্মিলন আর অপরূপ সৌন্দর্যময় অবয়বে মা আমার যেন দুর্লভ দুর্লঙ্ঘ এক নারী,ধীরেধীরে মহীয়সী হবার পথে এগিয়েছেন।সৎ কর্মকর্তা বাবা তাঁকে কখনওই সচ্ছলতা দিতে পারেন নি।ঢাকা শহরে বৌ হয়ে এসে শহুরে জীবনে অভ্যস্ত হয়ে সেই মানুষই স্বামীর হিমসিম খাওয়া সংসারের হাল ধরতে মাদারটেকের মত অজপাড়াগাঁয়ে জমি কিনে বাড়ি করলেন।হাঁসমুরগী পালন,ধান চাষ,কাদামাটির সঙ্গে,বন্যার পানিতে ভেসে গ্রাম্য পরিবেশে সংসার গুছিয়ে ফেললেন।তাতে আমার মায়ের ছিলোনা বাবার সৎ উপার্জনের প্রতি কোন কটাক্ষপাত।

শাশুড়ি মা’র সঙ্গে

আমি সব দেখেছি,বুঝেছি,গভীরতায়,অনুভবে।গান শেখাতে গিয়ে বাবা পুরো সংসারের অর্ধেক টাকা আমার পেছনে ঢালতেন।তাতে যে ঘাটতি হতো তা মা কিভাবে সামলাতেন তা বোঝতেই পারতাম না।তদুপরি তিনি তাঁর ননদ দেবর তাঁদেরকেও মানুষ করা,চাকরী হওয়া পর্যন্ত লালন পালনের ভার হাসিমুখে নিতেন।এখনো আমার মা তাঁর এলাকায় মহিলাদের যে কোন সমস্যায় সবার আগে এগিয়ে যান।রাত বিরাতে মহিলাদের লাশ ধোয়ান।পথের ভিখারি, পাগলী সবাই আম্মার আশ্রিতা।এই মানুষই আবার সমান তালে শেক্সপিয়র পড়ছেন,পড়ছেন জরাসন্ধ,আবার আখতারুজ্জামান ইলিয়াস।আমার মা আমার কাছে চলমান ডিকশনারি। কোন বানান না পারলে এখনো তাকে স্মরণ করি।

 আমার শাশুড়ি, তিনি আমার চলন্ত জীবনপথ। রোকেয়া সাখাওয়াত মেমোরিয়াল এর ছাত্রী তিনি,জীবনের গভীরতা, গভীর ভাবনা,ন্যায়পথ এর চলন,সৌখিন সেলাই,দারুন রান্না থেকে হারমোনিয়াম বাজিয়ে কাননবালার তুফানমেল এর গল্পের উপাখ্যান এর অতীত স্মৃতিচারণায় তিনি ছিলেন আমার অসমবয়সী বন্ধু।তিনি আমার কাছে মেলে ধরেছেন গভীরতম জীবনবোধ,

মায়ের সঙ্গে

বাস্তবতার করাঘাতের কাব্য,গল্প,অভাববোধের গভীরতা সবকিছুকে সহজলভ্য অনায়াস করার গল্পকে তিনি গভীরতম বোধ দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে জীবন আসলে নিজের মত করেই কাটানোর বাস্তবিক উপলব্ধির উপাখ্যান। আমি তাঁর অনর্গল আগল খোলা গল্প শুনে ঋদ্ধ হয়েছি,শুদ্ধ হয়েছি,তাঁর গান শুনে, তার সেলাই,তাঁর রান্না দেখে বুঝেছি এমন মানুষকেই মহীয়সী আখ্যা দেয়া সহজ,উচিৎ এবং অবশ্য কর্তব্য।

আমার মা এবং আমার শাশুড়ি দুজনই আমার দেখা শ্রেষ্ঠজন, শ্রেষ্ঠতম মানবী, এবং পরিপূর্ণ মানুষ। তাঁদের না দেখলে আমি নিজে পরিপূর্ণ হতে পারতাম না।জীবনকে এভাবে সহজ করে ভাবতে পারতাম না।আমার মা বন্ধুবৎসল, কিন্তু আমার শাশুড়ি অন্তর্মুখী। আমার মা সমাজসেবক কিন্তু আমার শাশুড়ি ভীষন একাকী ধরনের মিতবাক মানুষ। অথচ তাঁদের নীতি তাঁদের ভাবনা,তাঁদের বইপড়া, তাঁদের স্মৃতিশক্তি,তাঁদের উদারতা আমাকে আকাশের রঙ আঁকতে সাহায্য করেছে।আকাশী আকাশে সাদার পবিত্রতা, ক্রোধের লাল চোখ আর প্রেমের আবীর মাখাতে আমি তাঁদের দেখেই শিখেছি।কাকতালীয় ভাবে তাঁরা দুজনই ছিলেন অপরূপ সৌন্দর্যময়। একই সঙ্গে বিদ্যাধর, সুন্দর, ধৈর্য শীল, মানুষ আমি আমার জীবনে দেখিনি এবং দেখবোওনা। তাঁরা আমাকে ভেতরে ভেতরে সম্বৃদ্ধ করেছেন,শক্তিশালী করেছেন,শাড়িচুড়ি পড়া নারী হতে বের হয়ে আসতে সাহায্য করেছেন।তাঁদের ভালবাসায় আমি ধন্য বলে তাঁদের অবদান খাটো করবোনা।তাঁরা আমাকে গানের কনকচাঁপা হতে বের হয়ে মানুষ কনকচাঁপা হতে সাহায্য করেছেন সরাসরি। আমি আমার শাশুড়ি এবং আম্মা কে এমন ভাবে এমন সুরে আম্মা ডাকি যে তাঁরা দুজন পাশাপাশি থাকলে কেউ বুঝতে পারেন না আমি কাকে ডাকছি।কারণ এই পৃথিবীরর পারিবারিক কুটকচাল ছেড়ে বের হয়ে আমার মা তো মা ই আমার শাশুড়ি ও আমার মা হয়ে গেছেন।এখানেই তাঁদের বিশালতা এবং আমার পরম পাওয়া। হে মহীয়সী, তোমাদের পদতলে আমাকে ঠাঁই দিও।আমি তোমাদের মত হতে চাই।

ছবি: লেখক

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com