এবার কি হবে মানুষের…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ফেইসবুক এর গরম আড্ডা চালাতে পারেন প্রাণের বাংলার পাতায়। আমারা তো চাই আপনারা সকাল সন্ধ্যা তুমুল তর্কে ভরিয়ে তুলুন আমাদের ফেইসবুক বিভাগ । আমারা এই বিভাগে ফেইসবুক এ প্রকাশিত বিভিন্ন আলোচিত পোস্ট শেয়ার করবো । আপানারাও সরাসরি লিখতে পারেন এই বিভাগে । প্রকাশ করতে পারেন আপনাদের তীব্র প্রতিক্রিয়া।

কাজী তাহমিনা

আমার দেখা সবচেয়ে বড় বন্যার বছরটা স্পষ্ট মনে আছে। তখন ক্লাস টেনে পড়ি-থাকি প্রায় গ্রামের মত ছোট্ট একটা মফস্বল শহর শরীয়তপুরে-সালটা ১৯৯৮। আর এর আগের বড় বন্যা, ৮৮এর বন্যায় বেশ ছোট ছিলাম- আবছা আবছা কিছু স্মৃতি ছাড়া তেমন কিছু মনে নেই।

টানা কয়েকদিনের বৃষ্টিতে কমবেশি সবাই ঘরবন্দী। স্কুলঘর আগেই বন্যাদুর্গতদের জন্য ক্যাম্প হয়ে আছে,স্কুলও বন্ধ। তাও আমরা স্কুলে যাই , স্কাউট মিটিং করি, বন্যার্তদের সাহায্যের জন্য ফান্ড রেইজ করি।কিন্তু নিজেদের বাসাটা বেশ উঁচুতে থাকায় তখনো হাতেকলমে বন্যার ভয়াবহতা বুঝতে পারিনা।

এরমধ্যে যথারীতি শোনা গেলো, বন্ধুদেশ থেকে লাখ লাখ কিউসেক জল উপহার দেয়া হয়ে গেছে। ‘বন্যা কাকে বলে, কত প্রকার ও কী কী’- এবারে হাড়েহাড়ে টের পেতে শুরু করলাম।

সেদিনের কথা মনে আছে। বাসায় বসে আছি বৃষ্টিবন্দী – রাত থেকে একটু একটু করে পানি বাড়ছে। বাড়তে বাড়তে পায়ের পাতা, হাঁটু পেরিয়ে কোমর ছুঁচ্ছে, বিকেল বেলা তখন।

ঘরের ভেতর নোংরা কাদাজল, পানিতে থইথই!

প্রথমে চারখানা, পরে ছয়খানা করে ইট দিয়ে খাটের পায়া, বইয়ের আলমারি, পড়ার টেবিল সব উঁচু করে দেয়া হলো। ঘরের ভেতর বেঞ্চি, চেয়ার দিয়ে খাট থেকে খাট, ঘর থেকে বারান্দা সাঁকো করে দেয়া হলো।

স্টোভটাসহ রান্নাবাড়ার সরঞ্জামাদি একটা বড় জলচৌকিতে রেখে কোনমতে বাঁচানো হলো।

এদিকে চারপাশে হুড়োহুড়ি, ব্যস্ততা। সব কিছু একটু উঁচুতে নিরাপদে রাখতে হবে। বেশ কয়েকদিন দোকানপাট বন্ধ থাকতে পারে, তাই যতটা সম্ভব জিনিসপত্র কিনেও রাখা দরকার। যাদের মাঠের ধারে ঘর, সব কিছু নিয়ে স্কুল কিংবা অন্যের বাড়ির ছাদে আশ্রয় নিতে হবে, গরু-ছাগল গুলোকে ঠিকমত রাখতে হবে। চারদিকে পাগল পাগল পরিবেশ!

চারিদিকে জল থই থই, যেন সব ডুবে গিয়ে সমুদ্র হয়ে গেছে।
আমরা তো তাও আধা শহরে পাকা ঘর/বিল্ডিং এর বাসিন্দা ছিলাম। ছোট্ট একটুখানি শহরের চারপাশে সব কটা গ্রামে ভয়ানক দুরবস্থা। আমরা ভেলা করে, জলকাদা ঘেটে স্কুলের ক্ষুদে ত্রাণকর্মীদল টিচারদের সাথে ত্রাণ বিতরণে যাই। আর দেখি, দলে দলে ছেলেবুড়ো, জীর্ণ শীর্ণ, মলিন পোষাকের লোকজন, গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগী মিলেমিশে হট্টগোল- হাহাকার চারপাশে!
মাঝেমাঝে যখন বাড়ি ফিরতে বিকাল কি সন্ধ্যা হয়ে যেত, বেশ ভয় লাগতো, পানিতে মাছের পাশাপাশি আশপাশ দিয়ে কত সাপ ভেসে যেত!

এমনকি আমাদের ঘরের ভেতর দুইদিন সাপ ঢুকেছিল,আমরা ভয়ে কাঁটা হয়ে সব বিছানার একপাশে সেঁধিয়ে ছিলাম।

এরমধ্যে একদিন আমাদের সবচেয়ে ছোট বোন অনন্যা, যে কিনা তখন মাত্র দেড় বছুরে, রাতেরবেলা খাট থেকে গড়িয়ে পানিতে পড়ে গেলো। তখন রাত আড়াই বা তিনটা বাজে-আমি অংক করছিলাম পাশের ঘরে। হঠাৎ করে ঝপাং শব্দ শুনে দৌড়ে বেঞ্চির সাঁকো পেরিয়ে এসে দেখি-বন্যার পানিতে সে হাবুডুবু খাচ্ছে। তাড়াতাড়ি তাকে উদ্ধার করলাম। এতো দ্রুত সাঁকো +টেবিল পেরিয়ে দৌড়ে এসেছিলাম, আরেকটু হলেই ঘুরতে থাকা ফ্যানের ব্লেডে নিজেই আহত হতাম!

পানিকাদার ভেতর থেকে থেকে সবারই পায়ে প্রায় ঘা হয়ে গেলো। সবচেয়ে কষ্ট ছিল বাথরুম যাওয়া আর পরিষ্কার পানির অভাব। খাবার পানি, গোছলের পানি-সবকিছুতে হাহাকার।

অবস্থা যখন আরো খারাপ হলো, আমরা বড় তিন ভাইবোন গিয়ে আশ্রয় নিলাম গৌরীদের বাসায়। টানা কতদিন যে চিরবালা আপা আমাদের রেঁধে খাইয়েছেন, এখনো সেইসব খাবারের স্বাদ মনে আছে আমার!

আমাদের তো তাও খাওয়া দাওয়ার কষ্ট ছিলনা। কিন্তু আশপাশের গ্রামগুলোয় অবস্থা ছিল অবর্ননীয়। ফসলের/ ধানের প্রায় চিহ্ন পর্যন্ত মুছে গেলো। গরীব লোকজন /কৃষক সব নিঃস্ব হয়ে গেলো।
তখন বন্যা সাধারণ মানুষের জন্য সারাবছরের ধান-চাল কেনার দুঃস্বপ্ন নিয়ে বন্যা আসতো। একটু নীচু জায়গায় যাদের মাটির বাড়ি, তাদের বাড়ি ধসে পড়তো, জিনিস-পত্র সব ভেসে যেত। বন্যার পরপর গ্রামে সাপের উপদ্রব ও দেখা দিত। পেটের রোগও বাড়ত।
তবে ‘খাই-দাই’ পার্টির লোকেদের জন্য বন্যা আশীর্বাদ হয়ে আসতো। লুটে-পুটে খাওয়ার সুবর্ণ সুযোগ, মহোৎসব বয়ে যেতো চারপাশে। চিঁড়া-গুড়, চাল-ডাল, ত্রিপল ও ঘর পড়ার টাকা নিয়ে কত রাজনীতি, কত টাকা নয়ছয় হতো, শুনেছি। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে ত্রাণ পৌঁছাতো যৎসামান্যই।

এখন অবস্থার উন্নতি হয়েছে কিনা কে জানে!

অনেকটা সময় পেরিয়ে গেছে, পড়াশোনা ও চাকরি সূত্রে বেশ অনেক বছর মফঃস্বল ছেড়ে শহরে আছি। কিন্তু বন্যার সেই স্মৃতি এখনো তাজা।

শহরে যারা বড় হয়েছে তারা বন্যার এই দৃশ্যগুলো কল্পনাই করতে পারবে না হয়ত। ভারী বৃষ্টিতে রাস্তায় পানি জমে, ড্রেনের পানি চারিদিকে ছড়িয়ে যায়- তাই বিরক্তি ছাড়া শহুরে মানুষকে বন্যার সেই অভিজ্ঞতা কোনোদিন দিতে পারবে না বৃষ্টি।

দিনের পর দিন পানিবন্দী থাকা, ঘরবন্দী থাকা! উফফ!
যারা থাকেনি,তারা কোনদিন বুঝবেনা -কী সেই আজাব!

এবার যে কি হবে মানুষের- ভেবে কোন কূলকিনারা দেখতে পাচ্ছিনা।

ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com