এটলাস হয়ে সাহারায় রাত মারাকেশ-২

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
নিজামুল হক বিপুল

নিজামুল হক বিপুল

ভাবছলিাম এই সিরিজের দ্বিতীয় পর্ব লিখবো মারাকেশ শহরের ইতিহাস ও ঐতিহ্য এবং এখানকার সুলতানদের বিষয়ে কিছু তথ্য নিয়ে। কিন্তু অর্ধেক লিখার পর সিদ্ধান্তটা পাল্টালাম। লোভ সংবরণ করতে পারছিলাম না এটলাস পর্বতের চূড়া অতিক্রম করে মরক্কোর একেবারের সীমান্তক শহর জাগুরা ভ্রমণের সেই অ্যাডভেঞ্চার নিয়ে লেখার। শুধু তাই নয়, জীবনের প্রথম উট বা কেমেল’র পিঠে সওয়ার হয়ে সাহারা মরুভূমিতে যাবার গল্প লেখার।
জাগুরা হচ্ছে মারাকেশ থেকে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দূরের একেবারে প্রান্তকি শহর। এটলাস পর্বতসহ অসংখ্য পাহাড় ডিঙ্গিয়ে আলোর ঝলকানিতে একেবারে নিজের মত করে দাঁড়ানো এক পরিপাটি শহর জাগুরা। আমরা সেই শহরে নামার সুযোগ পাইনি। আমাদের গাইড কাম গাড়ি চালক শহরের শেষ প্রান্তে নিয়ে আমাদের নামালেন। সেখান থেকেই আমরা উট এর পিঠে সওয়ার হলাম। সেই গল্পে আসছি পরে।
১০ নভেম্বর রাত থেকে আমরা অবস্থান করছি মারাকেশ শহরে। এখানকার মানুষের জীবন যাত্রার সঙ্গে পরিচিত হচ্ছি আর আনন্দ পাচ্ছি। কিন্তু আমার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে শুধুই সাহারা মরুভূমি। আর জীবনে কখনও সাহারা মরুভূমি আসতে পারবো কি না, আসার সুযোগ পাবো কি না সেই চিন্তা থেকেই মাথায় ঢুকেছে যে করেই হোক সাহারা মরুভূমি দেখতে যাবো। বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে যোগ দেয়া জনকণ্ঠের উপ-প্রধান প্রতিবেদক কাওসার ভাই(কাওসার রহমান), ইউএনবি’র মাসউদ উল হকসহ অন্য সঙ্গীদের উৎসাহিত করলাম সাহারা ভ্রমণের বিষয়ে। সবাই এক বাক্যে রাজি। সিদ্ধান্ত নিলাম আমাদের (বাংলাদেশ) প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তৃতার পরদিন অর্থাৎ ১৭ নভেম্বর আমরা সাহারা’র পথে যাত্রা করবো। যোগাযোগ করলাম একটি ট্যুর অপারেটর প্রতিষ্ঠানের সাথে। প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক হাসান আমাদের যাত্রার বিষয়ে সব তথ্য দিয়ে আমাদেরকে যাত্রার দিন সকাল ৭টায় প্রস্তুত থাকতে পরামর্শ দিলেন। তাকে বুকিং এর টাকা দিয়ে আমরা ১৭ নভেম্বর ভোরের অপেক্ষা করতে থাকলাম।


১৬ নভেম্বর ঘুমাতে ঘুমাতে অনেক রাত। সকাল বেলা হঠাৎ হোটেল রুমের দরজায় শব্দ পেলাম। দরজা খুলে দেখি হাসান সামনে হাজির। তার তাড়াতে আমরা সবাই দ্রুত ঘুম থেকে উঠে মিনিট ত্রিশেকের মধ্যে রেডি হয়ে রওয়ানা হলাম। হোটেলের কাছেই অপেক্ষা করছে আমাদের গাড়ি। গাড়ির কাছে পৌঁছে দেখলাম আরও নয় জন ভিন দেশী গাড়িতে বসে আছেন। তারা প্রায় সবাই স্পেনের নাগরিক। এক তরুণ দম্পতি এসেছেন ইংল্যান্ড থেকে। সবাই আমাদের অপেক্ষায়। বলার অপেক্ষা রাখে না আমরাই দেরি করেছি। গাড়িতে উঠার আগেই ট্যুর অপারেটর হাসান আমাদের কাছ থেকে তার পাওনা সমুদয় টাকা নিয়ে গেলেন। জনপ্রতি ৫০০ দেরহাম (মরক্কো’র মুদ্রা)। আমাদের সবাইকে তুলে দিলেন গাড়ি চালক মোহাম্মদের হাতে। সাহারা’র পথে তিনিই আমাদের চালক কাম গাইড। সৌভাগ্যবশত আমি চালকের পাশের আসনে বসার সুযোগ পেলাম।
গাড়ি যাত্রা শুরু করলো সাহারা’র পথে। আমরা ধীরে ধীরে সকালের শান্ত-স্নগ্ধি মারাকেশ শহর ছেড়ে ছুটতে লাগলাম পাহাড়ের দিকে। পাহাড় মানে এটলাস পর্বতের দিকে। ধীরে ধীরে মারাকেশ শহর মিইয়ে গেলে। সমতল ছেড়ে ক্রমেই উঠতে থাকলাম উপরের দিকে।


ঘণ্টা খানেক চলার পর পাহাড় চূড়ায় এক স্থানে গাড়ি থামালেন আমাদের গাইড কাম চালক মোহাম্মদ। স্প্যানিশ আর আরবী ভাষা ছাড়া আর কিছুই বুঝেন না। ইশারায় বললেন, এখানে চা-নাস্তা করার জন্য ১৫ মিনিটের ব্রেক। আমরা হালকা নাস্তা সরেে কিছু ছবিও উঠালাম।
তারপর আবারো যাত্রা শুরু। আঁকাবাঁকা পাহাড়ী পথ। কখনও এক প্রান্তে খাড়া পাথুরে পাহাড়, আবার আরেক প্রান্তে ঢাল। চোখ যেতেই ভয়ে শিউরে উঠার মত অবস্থা। ভাবি একবার যদি গাড়ি খাদে যায় তাহলে কেউ জানতেও পারবে না আমার অবস্থান…। এমন ভয়ংকর গভীর খাদ…। আবার গাড়ি আঁকাবাঁকা পাহাড়ী পথ বেয়ে উঠে যাচ্ছে খাড়া পাহাড়ের চূড়ার দিকে। কখনও আবার নিচে নেমে আসছে এক পাহাড়ের সাথে আরেক পাহাড়ের উচ্চতার তফাৎ এর কারণে। এমন পাহাড়ী পথ দেখে একবারও চোখের পলক পড়লো না। ভয়ংকর সুন্দর এমন রাস্তা দেখে রাজ্যের সব ঘুম উবে গেলো আমার চোখ থেকে। অন্যরকম থ্রীল, অন্যরকম অ্যাডভেঞ্চার…উত্তেজনা কাজ করছে আমার মাঝে। তবে পিছনের আসনের লোকজনের কেউ কেউ দিব্যি ঘুমাচ্ছেন। সঙ্গে নাসিকা’র গর্জন…।


গাড়ি যতই গভীর পাহাড়ে প্রবেশ করছে ততোই নানা ভাবনা মনের মধ্যে উঁকিঝুকি দিচ্ছিল। তবে একটা ভাবনা যেন মাথা থেকে নামছিল না। কিভাবে এই পাথুরে পাহাড় কেটে সুপ্রশস্ত রাস্তা তৈরি করলো এখানকার সরকার। কতোটা ভালোবাসা আর আন্তরকিতা দিয়ে এমন মসৃণ রাস্ত তৈরি করেছে। চার লেনের সড়ক। কোথায় আবার দুই লেনের সড়ক দেখা গেলেও চোখে পড়েছে সেগুলো প্রশস্ত করার কাজও। সড়কে নেই কোন খানা-খন্দক। নেই গাড়ির ঝাকুনি। ভাবি এই দেশের পর্যটন ব্যবস্থার উন্নতি হবে না তো আমাদের দেশের হবে। এমন দিগন্ত বিস্ততি নানা ভাবনার মধ্যেই এক সময় আবিস্কার করলাম আমরা ক্রমেই এটলাস পর্বতের দিকে ছুটছি। দূর থেকে দেখছি এটলাস পর্বতের চূড়ায় সাদা সাদা বরফ…। তারমধ্যে সূর্য্যরে ঝিলিক- সে কী অপূর্ব এক সৌন্দর্য্য…।


সকাল গড়িয়ে দুপুর। আমরা ক্লান্তহিীন ভাবে ছুটছি। ভর দুপুরেই নিজেদের আবিস্কার করলাম এটলাসের চূড়ায়। সাপের মত আঁকাবাঁকা একটি পথ পাড়ি দিয়েই চালক কাম গাইড একটি স্থানে গাড়ি দাঁড় করালেন। আমাদের নামতে বললেন। গাড়ি থেকে নামতেই সৌন্দর্য্য হাতছানি দিয়ে ডাকছে। পাহাড় আর পাহাড়…সবুজ নেই তেমন একটা। তবু সৌন্দর্য্য যেন এখানে মোটেও মলিন হয়নি। হিমেল হাওয়া বইছে। শত শত পর্যটক ছবি তোলায় ব্যস্ত। আমরাও ঝাপিয়ে পড়লাম ক্যামেরার ক্লিক বাজিতে…। একের পর এক ছবি তুলতে লাগলাম। আর নিজে নিজে ভাবলাম যদি না আসতাম তাহলে কি মিস না করতাম। গাইড শুধু এইটুকু তথ্য দিলেন এটি এটলাস পর্বতের চূড়া।


এই চূড়া থেকেই দেখতে পেলাম পৃথিবীর সবচেয়ে আঁকাবাঁকা সড়কটির অবস্থান। এটলাস পর্বতের ভিতর দিয়ে পাথুরে পাহাড় কেটে দৃষ্টি নন্দন এই সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। আর এই সড়কটিই পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণ।
সড়ক দেখে সঙ্গিদের বললাম, এখন যদি সাহারা মরুভূমতিে না যাই তাহলেও জীবন সার্থক- এমন সুন্দর দৃশ্য দেখে।

ছবি: লেখক

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com