এখানে বাঙলার মুখ…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

কাওসার চৌধুরি

সেদিন গিয়েছিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনে; এক বন্ধুর কাছে।
বন্ধুটি একটি ডিপার্টমেন্টের শিক্ষক। চারতলায় বসেন। ওঁর কামরার দিকে যেতেই করিডোর থেকে নজরে পড়লো কৃষ্ণচুড়ার দিকে। কলাভবনের বাম কোনায় গুরু দুয়ারের পেছনেই কৃষ্ণচুড়ার সারি। কৃষ্ণচুড়ায় ফুল এসেছে। রঙ ছড়িয়েছে আকাশে! ক’দিন পরে রঙ ঢালবে রাধাচুড়া, পলাশ আর শিমুল। আকাশ হয়ে ওঠবে রঙিন ক্যানভাস!

আমার আসলে প্রায়ই নিজের জন্মকে ভীষণ ধন্য মনে হয়, বাঙলাদেশে জন্ম নিয়ে।
এমন টকটকে উজ্জ্বল রঙ আর কোন দেশের আকাশকে এমন কাব্যময় করে তোলে আমার জানা নেই। আর যদি কোথাও এ রকম আকাশ থেকেই থাকে- তাতে আমার কি; আমার বাপের কি! আমি আমার আকাশ আর আমার দেশ নিয়েই সুখী; ভীষন সুখী।

জানি, আমার দেশের কোন এক ধানক্ষেতে হয়তো আজো ‘চাপ চাপ রক্ত, ……বাজারে ক্রুরতা, গ্রামে রণহিংসা’! কিন্তু পাশাপাশি আবার ‘বাতাবি নেবুর গাছে জোনাকীর ঝিকমিকি খেলা, ……রাত্রির শিশিরে ঘাসফুলে’র কাঁপুনি দেখে প্রাণটি জুড়িয়ে যায়। ভালোমন্দ মিলিয়ে এইতো আমার ‘সাড়ে তিন হাত ভূমি’। এটাকে ভালো না বেসে আমি কোথায় যাবো!

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কলা ভবনে গেলেই মনটা অন্যরকম হয়ে যায়। 
অহংকারে বুকটা ফুলে ওঠে, চোখে ধরা দেয় উজ্জ্বল আলো! বিশ্ববিদ্যালয়ের এখানে ওখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অনেক ভাষ্কর্য, অনেক স্মৃতির ‘টুকরো ইতিহাস’। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, অপরাজেয় বাংলা, বেগম রোকেয়া, বেগম শামসুন্নাহার, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, মহামতি বুদ্ধ, স্থাপনা স্মৃতি চিরন্তনসহ আরো অনেক স্থাপনা আর ভাষ্কর্য।

এই ভাষ্কর্যগুলো আমাদের পূর্ব-পুরুষের কথা বলে, আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্যের কথা বলে। আমাদের ত্যাগ তিথিক্ষা, লড়াই সংগ্রাম আর বিজয়ের কথা বলে।

ঢাকা বিশ্ব্ববিদ্যালয়ের এই ভাষ্কর্যগুলো নিয়ে আমি একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করছি গত বছরের মাঝামাঝি সময় থেকে। প্রামাণ্যচিত্রটির নাম দিয়েছি- ‘এখানে বাঙলার মুখ’। এই ক্যাম্পাসের অসংখ্য ভাষ্কর্যগুলোর ‘জন্মের ইতিহাস’ আমার প্রামাণ্যচিত্রের অন্যতম প্রতিপাদ্য। আশাকরছি আগামী ডিসেম্বরে কিংবা আগামী ২৬ মার্চে এই প্রামাণ্যচিত্রটির প্রিমিয়ার করবো। এরমাঝে সরকারী অনুদানে ‘বধ্যভূমিতে একদিন’ আর মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রযোজিত তাদের নিজেদের প্রামাণ্যচিত্রটির কাজ তো চলছেই।

ফিরবার সময় হঠাৎ নজরে এলো-
কলা ভবনের গাড়িবারান্দার উল্টোদিকে নতুন একটি স্থাপনা নির্মাণের কাজ চলছে। স্থাপনাটি বেশ সুন্দর হবে বলেই অনুমান করি। মাঝখানে একটি গাছ, আর চারিদিকে পাথুরে স্তরগুলো তরঙ্গের মত আবহ তৈরী করছে। অবশ্য পুরো কর্মটি সম্পর্কে না জেনেই মন্তব্য করাটা ঠিক নয়! কালই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে স্থাপনাটি সম্পর্কে জেনে- আপনাদের জানিয়ে দেবো।

ঢেঁকি মক্কা গেলেও বারা বান্দে!
কলা ভবনে গেলাম, আর অপরাজেয় বাঙলার ছবি তুলবোনা এমনটি কি হয়! নানান এঙ্গেলে কয়েকটি ছবি তুলে রাখলাম। আমি জানিনা, এখন যে সব ছাত্রছাত্রীরা অপরাজেয় বাঙলার পাশে গোরাঘুরি করেন তারা এই ভাষ্কর্যের নির্মাণ-ইতিহাস জানেন কী না!

১৯৭২ সালে ডাকসু’র তৎকালীণ সাংস্কৃতিক সম্পাদক ম. হামিদের তাড়নায় এই ভাষ্কর্যের নির্মাণ কাজ শুরু হয় (ম. হামিদের ভাষ্য) এবং ভাষ্কর্যটি নির্মাণ শেষে উদ্বোধন করা হয় ১৯৭৯ কিংবা ’৮০ সালে (যতটা মনে পড়ে)। সৌভাগ্যবশত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের কিয়দংশ বিটিভির জন্য আমিই উপস্থাপনা করেছিলাম। আমি তখন ঢা.বি’র মোটা্মুটি ‘পরিচিত মুখ’!

ভাষকর্যটির ভাষ্কর আব্দুল্লাহ খালিদ। তিনি এবারে স্বাধীনতা পুরষ্কার অর্জন করেছেন।

ছবি: কাওসার চৌধুরি

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com