এখন মনে হয় যেকোন সময় খসে যাবো

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
শামীম আজাদ

শামীম আজাদ

(ইংল্যান্ড):আব্বার সরকারী চাকুরীর সূত্রে আমরা বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা শহরে থেকেছি। সেভাবেই বারো তেরো বছরে নারায়ঞ্জের পাট যাচনদারের হাঁকাহাকি ও উত্তেজনার শহর ছেড়ে বাস গড়েছিলাম শান্ত জামালপুর শহরে। হীমসাগর আম গাছের নিচে মড়া ব্রম্মহপুত্রের পাড়ে টিন শেড বাংলো মার্কা বাড়িতে। ফ্রিজ নেই মিটসেফ আছে। আছে লম্বা মূলিবাঁশের মাথার সঙ্গে এরিয়েল কানেক্টেড একটা বিশাল সাইজের রেডিও। সেটি আবার একটি কাঠের বাক্সের ভেতর থাকে এবং বাড়ি থেকে সবাই কোথাও গেলে ওটার দরোজা বন্ধ করে তালা দেয়া যায়। আমরা বড়দের পছন্দের অনুষ্ঠান শুনি। কিন্তু সুযোগ পেলেই ভাইয়া খালি নব ঘোরায় আর কড়ুই ভাজার শব্দের সঙ্গে বিদেশী ভাঙ্গা ভাঙ্গা গান বাজায়। আম্মা মহা বিরিক্ত। কিন্তু আমি শুনি সে গানের ফাঁকে হারমনিকার মিষ্টি শব্দ। ভাইয়ার ও একটা আছে। কিন্তু তা দিয়ে বিদেশী মানে ইংরাজী গান বাজাতে পারে না। সে বাজায় দেবানন্দ ও ওয়াহিদা রেহ্‌মানের প্রেমের হিন্দি ছবি সোল্‌বা সালের ‘হায় আপনা দিল তো আওয়ারা।‘ আর আব্বার বকা খায়। ওর সব বন্ধুরাই এক কিসিমের।
বহু বছর পরে বুঝেছি, সেই সব না বোঝা গানগুলো ছিল বব ডিলানের বা জন লেনন বা নেইল ইয়াংয়ের। সেটাই তখন তরুনদের ক্রেইজ। আমার যখন বব ডিলানের গান মনে লাগলো তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি। খন্‌খনে কন্ঠস্বর ছাপিয়ে উঠতো সে গানের কথা। যেন এক চারন কবি। হারমনিকা বা গিটার বাজিয়ে ঐ দূরে পৃথিবী নদীর ধার দিয়ে চলে যাচ্ছে তার কথাগুলো বলে। এ হচ্ছে কবিতাগীতি। আসলে কবিতাই। কোনরকম ভানবিহীন কিন্তু ভারময়। তার গায়ে মাথায় যা এসে ঝাপ্‌টা লাগাচ্ছে সেগুলোকে বকে বকে কখনো কৌতুক করে তাড়িয়ে দিতে দিতে গেয়ে চলেছে। বিকার ও অভিব্যক্তিহীন উস্‌কো কোকড়া চুলে যাতা পোশাকে যেন এক কাক তাড়ুয়া।সে কথাগুলো কঠিন কিছু না। কখনো সতর্কবানী। কখনো মৃদু তিরষ্কার। যা কিনা রাজনৈতিক না বলে সমাজনৈতিক। এক বিষয় না হলেও ভাবখানা সেই নৈব্যার্ক্তিক। কারে কি বলবেন! একটা তাগাদা ফুটে উঠছে তার গানের মাধ্যমে আর পাগলের দল তার পেছনে লাইন দিচ্ছে হ্যামিলনের বংশীবাদকের মত। আর বংশীবাজানো সেই কবিতা-গানের কবিই পেয়ে গেছেন এবারের ২০১৬ এর নোবেল সাহিত্য পুরষ্কার!
এর আগেও বেশ কয়েকবার নোবেলের জন্য তার কথা উঠে এসেছে। কিন্তু পাবার পর কিছু মানুষ অবাক। আমি অবাক না। শান্তি ও সাহিত্য এবং তা গীত হবার সাহিত্যতো আমাদের জাতীয় সংগীত রচয়িতা রবীন্দ্রনাথের গীতবিতানই প্রমান। সে সংকলনের ইংরাজী নামান্তরই ছিলো সংকলন ‘সং অব অফারিংস’। এমূহুর্তে মনে পড়ছে সেরকমই চিলির কবি গাব্রিয়েল মিস্ট্রালের ও নোবেল পাবার কথা। ইতালির কবি সালভাতর কোয়াসিমোডো এবং গুগুলে খোঁজে আরো পেয়ে যাবো নিশ্চেই। সেটা কথা না, কথা হল এই ৭৫ বছর বয়সী ডিলান মার্কিন সংগীতে নতুন এক কাব্যিক ধারা নিয়ে আসেন। এত মৌলিক ও এত নতুন এক ব্যাপার যে মানবতার পক্ষে ও যুদ্ধের বিপক্ষে মানুষের সামাজিক অবস্থান, ধর্ম, রাজনীতি এবং ভালোবাসা নিয়ে এমন গান মাখানো কবিতা আর কেউ এ যাবৎ লেখেনি। তার গান শুনে সে সময়ে তরুন প্রজন্ম কবিতামুখী হয়ে ওঠে। মাত্র দুদিন আগেই ব্রিটিশ পোয়েট লোরিয়েট ক্যারল এ্যান ডাফি বলছিলেন, কবিতার নিমিত্তই পাঠ অথবা পারফর্ম করা। সত্যিতো, নাটক যেমন সাহিত্য হলেও তা অভিনয় ছাড়া মূর্ত হয় না। কবিতা তেমনি নিরবে মনের মাঠে নিরানী দিয়ে বীজ থেকে বৃক্ষ করে ফল এনে দিচ্ছে ভাবা যায় না।
bishobangla_n-4জামালপুরে আমার ভাই ও তার বন্ধুরা তখন আরো একটা কান্ড করতো। ওরা আমাদের পড়ার ঘরের যে বড় টেবিলটাতে আমরা চারজন মিলে সুর করে পড়তাম সেটাকে দিনের বেলা ভারি বিছানার চাদরে ঢেকে তার নিচে তাদের অন্ধকার ফটো ল্যাবেরটরি বানাতো। তারপর কোথা থেকে কি কি সব রাসায়নিক পদার্থ এনে তার নিচে ঢুকে ফটোর নিগেটিভ থেকে ব্ল্যাক এ্যান্ড হোয়াইট ফটো ওয়াশ করতো। আর সেই ভেজা ছোট্ট একটুরো ছবি হাতে ‘ইউরেকা , ইউরেকা’ বলে নাচতো।
সেই ব্ল্যাক এ্যান্ড হোয়াইট মুভি যুগটা ছিলো ষাটের দশক। যাকে কিনা এখনো বলা হয় মূল্যবোধের দশক। ‘পিওর’ টাইম অব দ্যা ওয়ার্ল্ড। তাহলে কি তখন অন্যায় হয়নি। রাজনৈতিক চালিয়াতি হয়নি? খাদ্যে পড়েনি খাদক ভালুক? সবই ছিলো তখন তবে যেনো পিওর মানুষের সংখ্যা দৃশ্যমান ছিলো বেশি। বব তারই একজন। বড়, ভাল ও অ-জটিল। আমি তার জন্য বিশ্বলোকে ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেনে গানে গানে একাত্তরে অশ্রুপাত করতে পেরেছি। তখন যে আমেরিকা বাংলাদেশের অভ্যূদয়ের অগ্নি সময়ে সপ্তম নৌবহর পাঠিয়ে আমাদের গোড়াতেই মেরে ফেলতে চেয়েছিলো সে দেশে ও সেখানে থেকেই তিনি আমেরিকান হয়েও ব্রিটিশ বিটল জর্জ হ্যারিসন ও ভারতীয় সঙ্গীত সাধক রবিশংকরের সঙ্গে গান এয়েছিলেন। সেদিন একাত্তরের বাংলাদেশের বন্ধু হিসেবে বাংলাদেশের নির্যাতীত মানুষের কাছে এক আপনজন হয়েছিলেন। সেই কনসার্টে তারা কেউই টিকিটের অর্থে ভাগ বসাননি। সব পাঠিয়ে দিয়েছেন আমাদের মুক্তিসংগ্রামের জন্য। একাজটা তিনি আমাদের শান্তির জন্য করেছিলেন। তার কবিতা দিয়ে। তার গান দিয়ে।
বব ডিলানের নাম ছিলো রবার্ট অ্যালেনজিমারম্যান। নিজেই কবি ডিলান থমাসের অনুসরণে নিজেই নাম মেরামত করে নাম নেন বব ডিলান। তিনি শুধু লোকগান কিংবা উন্মাতাল রক গানের শিল্পী নন—তিনি ফোক ও রককে একত্র করে হয়ে ওঠেন অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে এক অবিস্মরনীয় প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। এ সময় দীর্ঘদিনের সঙ্গী জোয়ান বায়েজ আর ডিলান সক্রিয়ভাবে অংশ নেন বিভিন্ন নাগরিক অধিকার আন্দোলনে। ২৮ মার্চ ১৯৬৩ তাঁরা অংশ নেন মার্চ অন ওয়াশিংটন নাগরিক অধিকার রক্ষার আন্দোলনে। তিনি মার্টিন লুথার কিং জুনিয়ারের পাশে গেয়ে গেয়ে বলেন, আমরা সবাই আসলে দাবার ছকে একটি গুটি মাত্র। তাঁর তৃতীয় অ্যালবাম দ্য টাইমস দে আর আ চেঞ্জিং-এ ডিলান পুরোপুরি হাজির হন এক রাজনীতিসচেতন, কিন্তু নৈরাশ্য ও হতাশার গায়ক হিসেবে। এ সময়ের ডিলানের রচিত সব গানে আমরা অনায়াসে এই বর্তমান নৈরাজ্যের সময়ের সঙ্গে মিল পাই বলে তিনি এখনো প্রাসঙ্গিক। যেমন নজরুল। সংকটে, সংগ্রামে ও সংস্থিতি অন্বেষনে কাজী নজ্রুল ইসলামকে আমাদের লাগবেই। আমাদের জাতীয় কবির সেসব গানগুলো সুর ও সংগীতের সংগে তার বানী বা তার অক্ষর ও অস্ত্র হয়ে উঠে। দাবী আদায়ে আমাদের সম্মিলিত হতে বলে। প্রতিষ্ঠানে থেকে প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শিল্পসম্মত উপাচারে বিপ্লবী চেতনা জাগিয়ে তুলে।
বব ডিলানের সমসাময়িক বিষয়াবলি, ব্যক্তিগত গল্প এবং সমাজের নানা অসংগতি নিয়ে গানের কথা বললেই মনে হয় ‘ওনলি আ পন ইন দেয়ার গেম’, ‘দ্য লোনসাম ডেথ অব হেটি ক্যারল’, ‘ব্যালাড অব হোলি ব্রাউন আর নর্থ কান্ট্রি ব্লুজ’ এর কথা মনে আসছে। তাঁর অতি ব্যক্তিগত প্রেমের গানেও এ সময় দ্রোহ, রাজনীতি থেকে মুক্ত ছিল না: ‘বুটস অব স্প্যানিশ লেদার’ এবং ‘ওয়ান টু ম্যানি মর্নিংস’। এরকম প্রায় ছয়’শ গানের মধ্যে আমি শুধু একখানাকেই, ‘ভাত একটি টিপলেই হয়’ কথাটা মনে করে দেখতে চাইলে তাঁর, ‘ব্লোই’ন ইন দা উইন্ড’ দেখলেই চলবে। এর শব্দগুলো কাটা ছেঁড়া করে দেখতে পারেন।
যুদ্ধের পর শান্ত সময়ে একদিন এক চৈত্রের দুপুরে বুজানের এলিফেন্ট রোডের বাসায় সবাই বেড়াতে গেলে তাদের আধুনিক রেডিও গ্রামে রবীন্দ্রনাথের কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি ২৬ বার শুনেছিলাম। বিলেতে এখন পাতা ঝরার কাল। শেক্সপীয়ারে সনেট নম্বর ৭৩ এর মত বাইরেটা। যেখানে হলদে পাতা বা শূন্যতা কিছুই আর ঝুলছেনা।
মানুষের আর্তনাদে এখন মনে হচ্ছে যেকোন সময় খসে যাবো। আর পারি না।
হিন্দু নিধন, সাঁওতাল নিধন এখন চলছে রোহিঙ্গা নিধন। ববের গানের সব সুখ স্মৃতি উবে গিয়ে খালি এলাইনগুলো কানে বাজছে
বব নোবেল পাবার পর আমি ৩৬ বারের মত শুনছিঃ এখন যন্ত্রে না বাজালেও অন্ত্রে শুনছি দিনরাত।

হাউ মেনি রোডস্ মাস্ট এ্যা ম্যান ওয়াক ডাউন/ বিফোর ইউ কল হিম এ্যা ম্যান?
হাউ মেনি সী’জ মাস্ট এ্যা হোয়াট ডাভ সেইল/ বিফোর শি স্লিপ্স ইন দ্যা স্যান্ড?
হাউ মেনি টাইম্‌স মাস্ট দ্যা ক্যানোন বল্‌স ফ্লাই/ বিফোর দে আর ফর এভার ব্যান্ড?

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com