এখন অনেক কাঠবেড়ালী

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

বিমোচন ভট্টাচার্য

আমাদের আবাসনের চারিদিকে কোন বাউন্ডারি ছিল না। আর আমাদের ব্লকটা একেবারে বড় রাস্তার ওপর। ফলে রাজ্যের মানুষ হিসি তো করতেনই আমাদের ঘরের দেওয়ালে। ভোরে প্রাতঃকৃত্যও করতেন কেউ কেউ। সে এক প্রাণান্তকর অবস্থা ছিল। মনে করুন কেউ বাসের লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন হঠাৎ তার মনে হল হিসি করতে হবে। নেমে পড়লেন ওপর থেকে। আমিও হয়তো সেই লাইনেই দাঁড়িয়ে। হাসিমুখে

“ঝিঙ্গে নাড়িয়ে”( এই কথাটির জন্যে বন্ধু তপন দাস Tapan Dasএর কাছে কৃতজ্ঞ) হাসিমুখে উঠে আবার লাইনে দাঁড়িয়ে পড়তেন।

একবিংশ শতাব্দীর প্রথমে আমাদের আবাসনে পাঁচিল উঠলো। আধুনিক তার দিয়ে সেই পাঁচিলের ওপর ফেন্সিং করা হল। পাঁচিলের ওপারে একটা পার্ক করে দেওয়া হল। আমরা বাঁচলাম।
এমনিতেই অনেক গাছ ছিল আমাদের আবাসনে। শিউলি, জারুল, গন্ধরাজ, ছাতিম, টগর। আম, পেয়ারা, বাদাম। এছাড়া শিমুল পলাশ, কৃষ্ণচুড়া, রাধাচুড়া,ইউক্যালিপ্টাস। (আর ইয়ে আমাদের আবাসনটি কিন্তু কলকাতার বৃহত্তম সরকারী আবাসনের একটি।। দুশো আশীটি ফ্লাট রয়েছে। বিশাল জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে গাছগুলি) কিন্তু সেগুলি কোনদিনই আমাদের চোখে পড়তোনা। এত বাইরের লোক ঢুকতো আমাদের আবাসনে। ধুলোয় ধুলো হয়ে থাকতো চারিদিক।
পাঁচিল হয়ে যাবার পর ভেতরটা নির্জন হয়ে এল। আস্তে আস্তে পাখী আসা শুরু হল। এখন আমার দিন শুরু হয় বুলবুলির শীষে। কত নাম না জানা পাখী আসে সামনের পেয়ারা গাছটাতে। আর আসে কাঠবেড়ালী।
এই একটা প্রাণী ছোটবেলা থেকে আমার ভীষন প্রিয়। সেটা মনে হয় “শকুন্তলার পতিগৃহে যাত্রা”র এফেক্ট। আমাদের পাঠ্য ছিল ক্লাস এইটে। ছবিটা ছিল কন্ব মুনীর আশ্রমে শকুন্তলা, অনুসূয়া আর প্রিয়ংবদা আর চারপাশে অনেক অনেক কাঠবেড়ালী। গল্পেও উল্লেখ ছিল কাঠবেড়ালীর।
আমাদের লেনটায় এখন অনেক কাঠবেড়ালী। বারান্দায় বসি মাঝে মাঝে। ওদের দেখতে পাই। ছোটাছুটি করছে। এ বাড়ির পাঁচিল থেকে ও বাড়ির পাঁচিল। এ গাছ থেকে ও গাছ। খুব একটা ফ্রেন্ডলি নয়। দু একদিন বাদাম দিয়ে দেখেছি। কেমন সন্দেহের চোখে দেখে। কাক, শালিখ এসে খেয়ে নেয়। আগে কোনদিন কাঠবেড়ালীর ডাক শুনি নি। এখন শুনতে পাই প্রায়ই। কিট কিট কিট কিট করে ডেকেই চলে ওরা।
পরশু সন্ধেবেলা বাইরের ডাইনিং স্পেসে কি রকম বিদঘুটে এক আওয়াজ শুনলাম। দিদির দেখাশোনা করে রাধা তাকে বলাতে সে দেখে এসে বললো শম্পাকে- ও দিদি, বাড়িতে ছুঁচো ঢুকেছে।
আমাদের বাড়িতে ছুঁচো ঢোকার জায়গা নেই আর। তবু রাধা দেখেছে দিদির ঘরে ঢুকেছে। শম্পা খাট থেকে নামছে না আর। দিদি আমাকে ডেকে বললো – ও বাসু কি হবে রে? আমি বললাম কি আর হবে, তোমাকে বা রাধাকে কামড়ালে ইঞ্জেকশন দিতে হবে।কিন্তু দুশ্চিন্তা একটা হচ্ছিলই। কি করে বের করবো ছুঁচোটাকে। রাত্তিরে ঘুমোতে পারলাম না।রাত্তিরে অদ্ভুত ভাবে কোন ডাকাডাকি করলো না ছুঁচোটা।
সকালে তাড়াতাড়ি উঠে পড়লাম। কিছু পরে বাইরে কাঠবেরালীর কিট কিট ডাকের সংগে সংগে শুনি দিদির ঘরের আলমারির নীচ থেকে কে উত্তর দিচ্ছে কিট কিট করে!!
ও বাবা! উনি তাহলে ছুঁচো নয়! কাঠবেড়ালী!! দিদির ঘরের দরজাটা খুলে দিতেই পোঁ পোঁ করে লেজ তুলে ছুট্টে সামনের মাঠটায় গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো সংগীদের সাথে। কিচমিচ করে কি সব বোঝালো সংগীদের। আমি নিশ্চিন্ত মনে ঘরে এসে কাগজ পড়তে শুরু করলাম।
একটু পরে রাধা এসে বললো – ও ছোড়দা, একটা বাচ্চা কাঠবেড়ালী এখন আছে বাড়ির ভেতর!
সর্বনাশ!! ঘরের বাইরে বেড়িয়ে দেখি সত্যি একেবারে শিশু একটি কাঠবেড়ালী ছোটাছুটি করছে দিদির ঘরময়। আমি আর রাধা দুটো দরজা আটকে দাঁড়ালাম। এবার ওর আর যাবার যায়গা নেই। দিদির ঘর থেকে বারান্দায় বেরিয়েই ও বাইরে বেরোবার রাস্তাটা পেয়ে গেল। ছুট্টে গিয়ে যোগ দিল ওর সংগীদের সংগে। বারান্দায় বেরিয়ে আমি দেখছিলাম ওদের আনন্দ। হঠাৎ সেই খুদেটা এগিয়ে এসে আমার দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে থাকলো। আমি ভাবলাম মনে হয় এক্ষুনি আমায় বলবে – ‘তুমি দুষ্টু লোক”। আমি হাসলাম আর তক্ষুনি ওর মা এসে দাঁড়ালো ওর কাছে। অন্তত আমার তাই মনে হল।
তারপরেই ল্যাজ তুলে মুখে কিটকিট আওয়াজ করতে করতে কিছু উঠলো একেবারে সামনের জারুল গাছটায় আর বাকি কটা একটু দুরের পেয়ারা গাছটায়।
আমি দেখলাম মা দুহাত দিয়ে তার সন্তানদের ঘিরে থাকেন সর্বদা। সে আমার মা হোক বা কাঠবেড়ালীর মা।?
কোন তফাৎ নেই……

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com