এক বন্ধু হারালাম…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

 

রেজাউর রহমান

সেই ৮০’র দশকে বাংলাদেশ টেলিভিশনের ক্যান্টিনে তার সঙ্গে আমার প্রথম দেখা I অনুষ্ঠান সম্পাদনার বিরতির সময় দ্রুত নাস্তা সেরে নেয়ার জন্য যখন ক্যান্টিনে বসেছি ,তখনি তিনি হাসি মুখে এগিয়ে এলেন I করমর্দনের জন্য হাত বাড়িয়ে বললেন ” স্লামালেকুম , আমি আনিস …” আমি দাঁড়িয়ে তার সঙ্গে করমর্দনের সময় আমার পরিচয় দিলাম আর তখনি তিনি চমৎকার ভাবে হেসে বললেন “আপনাকে আমরা সবাই চিনি , পরিচয়ের কোনো প্রয়োজন নেই …” কথায় কথায় জানলাম তার একটি নতুন অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করার সম্ভবনা আছে তাই তিনি আলোচনার জন্য টেলিভিশন ভবনে মাঝে মাঝে আসছেন I তখন বাংলাদেশ টেলিভিশনের স্বর্ণযুগ চলছে নাটক, ম্যাগাজিনে অনুষ্ঠান শিক্ষামুলুক অনুষ্ঠান সব মিলিয়ে দারুন এক সময় I সেই সময়ে টেলিভিশনে কোনো গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানের উপস্থাপক হওয়ার ক্ষেত্রে অল্প বয়স একটা বিরাট বাধা ছিল I তখন টেলিভিশনের ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানের মহানায়ক হচ্ছেন আমার অতি প্রিয় ফজলে লোহানী, তিনি তখন ষাটোর্ধ , প্রফেসর আব্দুল্লা আবু সায়ীদ আর প্রখ্যাত সাংবাদিক হেদায়েত হোসাইন মোর্শেদ চল্লিশোর্ধ I ১৯৮৩ তে আমি যখন “আইন আদালত ” অনুষ্ঠান শুরু করি তখন আমার বয়স ২৫ I তখন যদি বাংলাদেশ টেলিভিশনের অনুষ্ঠান পরিচালক খালেদা ফাহমি , আমার জন্য এগিয়ে না আসতেন তাহলে আমাকেও হয়তো বহু বছর অপেক্ষা করতে হতো উপস্থাপক হওয়ার জন্য I আনিস ভাই কেও অনুষ্টান করার সুযোগ করে দিয়েছিলেন খালেদা আপা I

এই ছবিটি ১৯৯০ সালে ব্যাংকক এয়ারপোর্টে তোলা I ছবিতে আনিসুল হকের সাথে আমি ও সুরমা I এর পরের দিন আনিস ভাই আমাদের একটা নামকরা হোটেলের দামি রেস্তোরায় আপ্যায়িত করে ছিলেন

পরিচয়ের অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই আনিস ভাইয়ের সঙ্গে আমার উষ্ণ বন্ধুত্বের সম্পর্ক সৃষ্টি হলো, কারণ আমরা তখন তরুণ ও একই চিন্তাধারার অনুসারী I তার তারুণ্য, প্রাণবন্ততা দেখে আমি ধরেই নিয়ে ছিলাম তিনি আমার চেয়ে বয়সে ছোট I আর আমার ভাব ভারিক্কি দেখে তিনিও ধরে নিয়ে ছিলেন আমি তার বয়োজ্যেষ্ঠ, তারপর একদিন যখন তিনি জানলেন যে তিনি আমার চেয়ে ৫ বছরের বড় তখন হাসতে হাসতে তার পেটে খিল ধরার মতো অবস্থা I তিনি বলেলন ” আরে আপনিতো সাংঘাতিক মানুষ ! এতদিন আপনার হাব ভাব দেখে আমি তো আপনাকে ভাই ভাই করতে করতে অস্থির !” আমি বললাম “আমরা না হয় ভাই হয়েই থাকি ” ব্যাস সেই থেকে আমরা আরো আপন হয়ে গেলাম I তিনি ছিলেন দারুন উপস্থাপক, তার কথায় দর্শক মন্ত্রমুগ্ধ হতো I

হ্যা, তিনি একজন অসাধারণ মানুষ ছিলেন, বিশাল হৃদয়, উদার, পরোপকারী, অপরের প্রশংসায় অকুণ্ঠিত I তিনি স্বপ্ন দেখতে পারতেন আর সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেয়ার অসীম ক্ষমতা তার ছিল I

গত বছর মে মাসে হঠাৎ করে ঢাকায় গেলাম মা কে দেখার জন্য I মা একটু সুস্থ হয়ে ক্লিনিক থেকে বাসায় ফেরার পর প্রতিদিন তার সঙ্গে অনেক বিষয়ে গল্প করতাম I একদিন মা ঢাকার কথা বলতে বলতে মেয়র আনিসুল হকের খুব প্রশংসা করলেন , আমি বললাম ঠিক আছে এখনই কল দিচ্ছি I কল করে পেলাম না , ওনার ব্যাক্তিগত সেল ফোনে টেক্সট দিলাম , উত্তরে জানালেন আমি ঢাকায় এসেছি জেনে তিনি খুবই খুশি হেয়েছেন , দেখা হলে ভালো হতো কিন্তু উনি তখন লন্ডনে যাওয়ার জন্য এয়ারপোর্টে অপেক্ষা করছেন I তিনি প্রায় দু’সপ্তাহ পরে ফিরে আসার পর আমার ফোন পেয়ে খুবই খুশি হলেন বললেন দ্রুত দেখা করতে, তাহলে অনেক গল্প হবে কিন্তু দেখা আর হলোনা কারণ তখন আমার কানাডায় ফিরে আসার সময় হয়ে গেছে।

আজ আনিস ভাইয়ের তিরোধান লক্ষ লক্ষ মানুষ তাদের হৃদয়ের বেদনা প্রকাশ করছেন , আমি তাদের মধ্যে একজন I আমি ব্যাক্তিগত ভাবে একজন অসাধারণ বন্ধুকে হারালাম I আনিস ভাই আপনি আমাদের হৃদয়ে, স্মৃতিতে অবিনশ্বর একটি জোতিস্ক

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com