একাকীত্বটাই টেনে নিল আমাদের

  •  
  •  
  •  
  •  
  • 0
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ফেইসবুক এর গরম আড্ডা চালাতে পারেন প্রাণের বাংলার পাতায়। আমারা তো চাই আপনারা সকাল সন্ধ্যা তুমুল তর্কে ভরিয়ে তুলুন আমাদের ফেইসবুক বিভাগ । আমারা এই বিভাগে ফেইসবুক এ প্রকাশিত বিভিন্ন আলোচিত পোস্ট শেয়ার করবো । আপানারাও সরাসরি লিখতে পারেন এই বিভাগে । প্রকাশ করতে পারেন আপনাদের তীব্র প্রতিক্রিয়া।

রাজা ভট্টাচার্য্য

বিয়ের পর লোকজন আজকাল কাহাঁ কাহাঁ মুল্লুকে বেড়াতে যায়। আমরা গিয়েছিলাম দীঘা। একে তো টাকা ছিল না, তায় ছুটির অমিল। কিন্তু যেমন আমার, তেমনি আমার গিন্নির – যাকে বলে পায়ের তলায় শর্ষে। কাজেই গরমের ছুটির তিনমাস আগে থেকে আমরা মাথা খাটাতে শুরু করলাম – কোথায় যাওয়া যায়। জ্যাঠতুতো ছোট বোনটা তখন স্বামীর চাকরিসূত্রে থাকত ভাইজাগে। জানা গেল – সেই ভারি সুন্দর শহরটিতে ওই সময়ে – মানে জুন মাসে বেজায় গরম হবে বটে, কিন্তু কাছেই আর একটা জায়গা আছে। নাম তার আরাকু ভ্যালি। সে নাকি অপূর্ব জায়গা, এবং রীতিমতো ঠাণ্ডাও। কাজেই ফোনে কথা হয়ে গেল – একদিন বোনের বাড়িতে থেকে আমরা চলে যাব আরাকুতে। মহা উৎসাহে চেন্নাই মেল এবং কিরন্ডুল প্যাসেঞ্জারের টিকেট কেটে ফেললাম। হোটেলও বুক করা হয়ে গেল।
এখন ফিরে তাকালে দুটো কথা খুব মনে হয়। একে তো তখনও দীপুদার বাইরে কিছু দেখিনি। কাঁচা দৃষ্টি। তারচেয়ে বড় কথা – সেই সতেরো বছর আগের আরাকু ছিল আজকের তুলনায় প্রায় অনাবিষ্কৃত, অনাঘ্রাত। বড় হোটেল বলতে সেই ময়ূরী – যেখানে ওঠার সাধ্য ছিল না আমাদের ; আমরা উঠেছিলাম একেবারে বাজারের মধ্যে অতি ছোট, অতি সাদামাটা একটা হোটেলে। কিন্তু যা ছিল – তাকে বলা চলে ‘প্রাকৃতিক কৌমার্য’। ছিল অনিবার সবুজ মাঠ, নীলাভ অনুচ্চ পাহাড়, ছিল সেই পাহাড়ের সানুদেশ আলিঙ্গন করতে আসা মেঘ -‘মেঘমাশ্লিষ্ট সানুম্’। ছিল রাঙা টালি দিয়ে ছাওয়া ছোট্ট ইশকুল-বাড়ি, প্রাচীন সব সরলরেখার মতো গাছ; নন্দলালের ছবির মতো আমাদের ছোট নদী সত্যি আঁকাবাঁকা পথে চলত। একপশলা বৃষ্টি হলেই তাতে লাল-টুকটুক জলের স্রোত বইত। 
মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম আমরা দু’টি প্রাণী। সারাদিন দু’টিতে ঘুরঘুর করে বেড়াতাম আরাকুর বুক চিরে চলে-যাওয়া ঝকঝকে ঢেউ-খেলানো রাস্তাটি ধরে, বসে থাকতাম ছোট্ট নদীর উপরের ক্ষুদে সাঁকোর উপর, ক্কচিৎ নেমে যেতাম ধু ধু মাঠের দিকচিহ্নহীন প্রসারতায়। সন্ধ্যের পর আকাশ পরিষ্কার হয়ে চাঁদ উঠত; দু’জনে হেঁটে বেড়াতাম জ্যোৎস্না আর ছায়ার কাটাকুটি-খেলা রাস্তা দিয়ে। আর কেবলই বলাবলি করতাম – এ যেন ঈশ্বরের খেলাঘর।
একদিন বিকেলে অমনই এলোমেলো ঘুরে বেড়াচ্ছি। পথের ডানদিকে অনেক দূরে, পাহাড়ের কোল ঘেঁষে রেললাইন দিয়ে চলে যাচ্ছে অনন্ত মালগাড়ি – কালভার্টে বসে দেখছি তাই। এমনসময় চোখে পড়ল – রাস্তার বাঁদিক দিয়ে একটা ছোট্ট পাকদণ্ডি উঠে গেছে দুটো পাহাড়ের খাঁজ বেয়ে। এমনিই হাঁটা দিলাম দু’জনে সেই কাঁচা রাস্তা ধরে। একটু এগোতেই চোখে পড়ল একটা অদ্ভুত দৃশ্য।
বাঁ দিকের পাহাড়টার গায়ে, পথের পাশে একটি আদিবাসী মেয়ে কাজ করছে গভীর মনোযোগ দিয়ে। পরনে তার খুব মলিন, খুব পুরনো একটা শাড়ি, কুচকুচে কালো শরীরে ঝলসে উঠছে বিকেলের পড়ন্ত রোদ্দুর। অনেক কাঠকুটো আর গাছের ডাল জোগাড় করে সে যা বানাচ্ছে – তা একটা বাড়ি। গাছের ডাল দিয়ে বানানো হয়েছে কাঠামোটা, এখন কাঠকুটো দিয়ে তাকে ভরাট করার কাজ চলছে। 
এমন কোনও অভূতপূর্ব দৃশ্য নয় যে, আমরা কত্তা-গিন্নিতে হাঁ করে দাঁড়িয়ে যাব। যেতামও না, যদি না আমাদের চোখে পড়ত – বাড়িটা বানাচ্ছে সে একাই। সম্পূর্ণ একা। আর কেউ নেই সেখানে।
আদিবাসী সমাজ সম্পর্কে আমি বা আমার গৃহিনী ততটুকুই জানি – যতটা জানি থিওরি অফ রিলেটিভিটি সম্পর্কে। কিন্তু দৃশ্যটা, বলা ভাল ওই একাকীত্বটাই টেনে নিল আমাদের। সসংকোচে এগিয়ে কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম দু’জনে। দুই অনাহূত দর্শকের এই অনাবশ্যক কৌতুহলে সে বেচারি কাজ থামিয়ে তাকাল আমাদের দিকে। তারপর শুরু হল এক আশ্চর্য কথোপকথন। সে যে ভাষা জানে, তার একবিন্দু আমাদের আয়ত্তাধীন নয়। উল্টোদিকে, তার হিন্দি-জ্ঞান অতি-সামান্য। তবু কথা হল। আর সেই কথাটুকুই জমে গেল আমাদের মগজে।
বাপ-মায়ের একমাত্র মেয়ে এ। এই রাস্তা ধরে আরও মাইল-টাক এগোলে এদের বাড়ি ছিল। ছিল – কেননা গত বর্ষায় সেই জীর্ণ বাড়িটি পড়ে গিয়েছে। আপাতত তারা আছে এক আত্মীয়ের বাড়িতে; কিন্তু সেখানে বেজায় স্থানাভাব। সে তাই ঠিক করেছে – এবার বর্ষা আসার আগেই বাবা-মা-কে সে নিয়ে আসবে তাদের নিজেদের বাড়িতে। সঙ্গীসাথী তেমন কেউ না-থাকায় সে নিজেই কাজটা শুরু করেছে মাস-খানেক আগে। এখন চলছে শেষ পর্যায়ের কাজ। আশা – বর্ষা আসার আগেই নতুন বাড়িতে সে নিয়ে আসতে পারবে বাপ-মা-কে। সারাদিন তাকে কাজ করতে হয় কফির বাগানে, এই বিকেলটুকু সে খাটে নিজের স্বপ্নের পিছনে।

‘বাড়ি’ নামক জিনিসটা মেয়েরাই সৃষ্টি করে এ দেশে। নিজের নিজের বাড়ির দিকে তাকান মশাই – তাহলে আর দ্বিধা থাকবে না এ কথা বলতে – ‘হাসব্যান্ড’স নেম’ বা ‘কেয়ার অফ’ – ফর্মের এই জায়গাগুলো দেখলে আসলে আমাদের লজ্জা হওয়া উচিত!

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com