একটু একটু করে রুল টানা খাতা ভরে ওঠে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শেখ রানা (নিউবুরি পার্ক, লন্ডন)

লিরিক লিখতে লিখতে আমি একবার মুক্তগদ্য লেখা শুরু করেছিলাম। গভীর রাতের দিকে লেখা শুরু হতো। খুব ভালো কিছু হতো না হয়তো, কিন্তু লিখতে লিখতে কেমন একটা ঘোরের ভিতর চলে যেতাম। দৃশ্যকল্পগুলো আমার চারপাশে একটা কল্পনার বাতাবরণ তৈরি করতো। আমি ভেবে নিয়েছিলাম যে লিখছে সে আসলে আমি না। আমি তো গীতিকার, সংরাইটার। যে মুক্তগদ্য লিখছে তার নাম আশফাক সমাদ্দার। সেই ভদ্রলোক পাহাড়ে থাকে। অনেক দূরের নাম না জানা একটা পাহাড়ে। সেই পাহাড়ে তার একটা কাঠের বাড়ি আছে। ভদ্রলোক মুক্তগদ্য লেখে। আর অনেক দিন পর পর সমতলে ফিরে আসে। এসে আমার সঙ্গে দেখা করে বুকপকেট থেকে মুক্তগদ্যগুলো দিয়ে যায়। কোথাও ছাপা হবার তাড়া নেই। তাড়না নেই। তারপর সমতল থেকে আবার পাহাড়ে ফিরে যায়। এই সমতলে আশফাক সমাদ্দারের একমাত্র বন্ধু হলাম আমি।

 আজ ফেইরি পুলস এর পাহাড় আর ঘুর্নি মেঘ দেখে মনে হলো, আশফাক সমাদ্দার বুঝি এই পাহাড়েই থাকে। এখান থেকেই সমতলে আমার কাছে মাঝে মাঝে আসে। মুক্তগদ্যের লেখা নিয়ে।

ফিরে যাবার দিন চলে আসে। আজ আমরা ইনভার্নেস হয়ে এডিনবার্গে ফিরে যাবো। আইল অফ স্কাই দর্শন হলো ভালো। এবার আর এক প্রান্ত ইনভার্নেস হয়ে প্লডা ফলস দেখে ফিরে যাবো রাজধানীতে।

কটেজে খুব বেশি সময় কাটাইনি। তবু এই গ্লেনেলগ কটেজ ছেড়ে যেতে বিষাদাক্রান্ত হই। চারপাশে মনোরম সবুজ আর  নরম পাহাড়ের মাঝে এক চিলতে কাঠের  তৈরি এই কটেজ। ছবির মত সুন্দর। স্বপ্ন স্বপ্ন লাগে এখানে। স্বপ্নের চরিত্র হওয়া নিখুঁত অনুভূতি। একদম নিখুঁত এর আসলে কোনো অস্তিত্ব আমাদের অবয়বে নেই। তাই খুব নিখুঁত, বা খুব বেশি সুন্দর দেখলে আনন্দ আর দুঃখের একটা কেলেঙ্কারী ঘটে যায় ভিতরে ভিতরে। যাবার সময় কটেজে দাড়িয়ে সে রকমই ঘটে মনে মনে।

প্লডা ফলস এর পথ ধরে যাত্রা শুরু হয়। টমটম বলছে প্লডা ফলস ম্যালা দূর। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আবার সেই ঝর্ণা দেখবো? আচ্ছা যাই, দেখা যাক। স্বগোক্তি করে নিজেকে প্রবোধ দেই।

ইনভার্নেস আসতেই চারপাশের দৃশ্যপট পরিবর্তিত হতে থাকে। এই কদিন পাহাড় আর লেক দেখেছি। এখন দেখছি বনাঞ্চল। পাশাপাশি ঠায় দাড়িয়ে থাকা  ঘন গাছের পত্রপল্লব আর তারই ফাক গলে উঁকি দেয়া রোদ্দুর।

আমরা টমিচ (নাকি টমিক!) গ্রামে ঢুকি। রোড সাইন বলছে এখান থেকে ৫ মাইল পরে প্লডা ফলস। একসময় সেই পথও শেষ হয়। আক্ষরিক অর্থেই পথ শেষ হয়। এর পর আর পিচ ঢালা পথ নেই, মেঠো রাস্তা ধরে প্লডা ফলস এর গাড়ি পার্কিং এ চলে আসি। তিন-চারটা গাড়ি চোখে পড়ে। আর কর্ণকুহরে প্রবেশ করে গম্ভীর স্বরে একটা লো ফ্রিকোয়েন্সির শব্দ।

নেমে দেখি চারপাশে বড় বড় গাছ। এগুলো ডগলাস গাছ। স্কটল্যান্ডের বন অধিদপ্তর যত্ন করে এই সুগন্ধী গাছগুলোকে বাঁচিয়ে রেখেছে। এমনিতে নন নেটিভ গাছের ফলন না বাড়ালেও এই গাছগুলোকে এখানে বিশেষ যত্ন করা হয়। এর সুগন্ধীর জন্যই বোধ করি। গাছের বাকল কাটলেই ম্যান্ডারিন ফলের সুবাস।

বাকল কেটে সুগন্ধ নেয়া হয় না। আমি তাকিয়ে তাকিয়ে গাছ আর চারপাশের বন দেখি। হাইল্যান্ডে এসে বনও দেখতে পাবো তা তো ভাবিনি। পর্যটকদের জন্য এখানকার সব স্থাপনাতেই একটা তথ্য ফলক আছে। কাছে গিয়ে দেখি এই ফলস প্রায় ১৫১ ফিট উঁচু থেকে পতিত হয়।  হেঁটে হেঁটে খুব কাছে চলে যাওয়া যায়। আমরা বনের ভিতর ঢুকে যাই। যত ঢুকি আওয়াজ তত নিকটবর্তী হয়। ঘন গাছের ভিতর দিয়ে সরু রাস্তা চলে গেছে বনের ভিতর। সেই রাস্তা ধরে সামনে যেতে থাকি। একসময় প্লডা ফলস আমাদের অভ্যার্থনা জানায়। এত বড় ঝর্ণা আগে কখনও দেখিনি। বিস্ময়াভূত হই।

সবাই গেছে বনে। বনে ঢুকে সবাই উদাস হয়ে গেছে। আমাদের দল ভেঙে যায়। যে যার মত ঘুড়ে বেড়ায় এদিক সেদিক।

ঝর্ণার খুব কাছে চলে আসি। কাঠের পাটাতন দিয়ে দর্শনার্থীদের জন্য সুন্দর করে দেখার ব্যবস্থা করা আছে। পাটাতনে দাড়িয়ে শরীর ঝিম ঝিম করে আমার। প্লডা ফলস এর বন্য সৌন্দর্য প্রায় নিখুঁত। আমি নিচে তাকাই। নিচে পাথরের উপর জলরাশি আছড়ে পরে এক ধরণের বর্ণালী তৈরি করেছে। রংধনুর মত একটা আবহ। বিভ্রম জাগানিয়া।

কাঠের পাটাতন থেকে আমি নিচে নেমে আসি। নেমে আসার পথ  বেশ কন্টকপূর্ণ। ঢালু মেঠো পথ, কখনও বা পাথুরে ঢাল। একদম নিচে নেমে দেখি মিশু দাড়িয়ে আছে। দূরে সুমনকেও এক ঝলক দেখতে পাই। নিচে সশব্দে ঝর্নার পানি পাথরে আশ্রয় নিচ্ছে। বছরের পর বছর ধরে একই ধারায় পানির পতনে পাথর ক্ষয়ে গেছে খানিক।

প্লডা ফলস এর নিখুঁত বন্য সৌন্দর্যে সবাই অভিভূত বোঝা যায়। খুব একটা কথা হচ্ছে না গাড়িতে। পেছনেই মফিজ ভাইদের গাড়ি। নিঃশব্দে অনুসন্ধান করছে আমাদের। সন্ধার আগেই এডিনবার্গ ফিরে যেতে হবে।

হাইল্যান্ড পরিভ্রমণ শেষ হয় অতঃপর। পার্থ শহর হয়ে আমরা এডিনবার্গে ফিরে আসি। পার্থে কফি পান বিরতিতে এক রেস্তোরা মালিকের সাথে পরিচয় হয়। ভদ্রলোক বাঙালি। স্কটিশ মেয়ে বিয়ে করে দিব্যি সংসার পাতিয়ে সুখে আছেন। বাংলাদেশী শুনে কিছুতেই বিল নেবেন না। ধন্যবাদ জানিয়ে আমরা পার্থ থেকে হাইওয়ে ধরে শহরে পৌঁছে যাই একসময়। সন্ধ্যা নেমেছে। ঘড়ি বলছে নয়টার কাছাকাছি। কিন্তু আকাশে এখনও আলো। আলো আর আসি আসি করা আঁধার।

স্কটল্যান্ডে এখন সামার। জুলাই এর শেষ প্রান্ত। সুর্য অনেক ধীরে আর সময় নিয়ে বিদায় নেয়। যাওয়ার কোনো তাড়া নেই যেন। রাত দশটার দিকে আঁধার নেমে আসে চরাচরে। লম্বা এক এক দিন।

সেই সব দিনে সওয়ার হতে আমরা আবার প্রাত্যহিক জীবনে ফিরে যাই। এর ফাঁকে ফাঁকে আমি লিরিক লিখি আর ভ্রমণ গল্পের পাতা সাজাই। মিশুকে পাশে নিয়ে।

একটু একটু করে রুল টানা খাতা ভরে ওঠে শব্দে। দৃশ্যে। শব্দপাখির দলে।

ছবি: লেখক

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com