একটি পিঁড়ি ও কাসার থালার গল্প..

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

জসিম মল্লিক

(টরন্টে থেকে):এলেবেলে গল্প দিয়ে শুরু করা যাক। সেদিন দুপুরের দিকে একটা ফোন আসে আমার কাছে। অচেনা নম্বর থেকে ফোন আসলে সাধারণতঃ ধরিনা কিন্তু সেদিন ধরলাম । আমাদের কথপোকথনঃ
আমি কী জসিম মল্লিকের সাথে কথা বলতে পারি?
আমি মিষ্টি করে বলি, জ্বী পারেন।
আপনি জসিম মল্লিক বলছেন!
আমি ততোধিক মিষ্টি করে বলি , বলছি।
আমি আপনার লেখা খুউব পছন্দ করি। টরন্টো আসলেই আমি ভোরের আলো পত্রিকাটা সংগ্রহ করি।
আমি আমার স্বভাবসুলভ হাসি ( অবশ্যই মিষ্টি করে)। বলি আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
তিনি বললেন আপনার এবারের লেখাটার সাথে আমি খুউব একমত। ‘সবাই খুউব কৌশলী হতে চায়’।
আমি বলি, জ্বী। আসলে আমার লেখা পড়লে আমাকে চেনা যায়।
আচ্ছা আপনার বয়স কত?
আমি বয়স বলি।
তিনি বললেন, তাহলে আপনি আমাকে মাসী, পিসী অথবা বৌদি বলতে পারেন।
আমি বৌদি বলতে রাজী হলাম। বললাম আপনি কোথায় থাকেন?
আমি কোলকাতায় থাকি। ছেলের কাছে বেড়াতে এসেছি।
ও তাই নাকি! ব্যাপারটা কাকতলীয় কিনা জানি না। আজই আমি ইন্ডিয়ার ভিসার জন্য অ্যাপ্লাই করলাম
তিনি আমাকে কোলকাতা তার বাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানালেন।
দ্বিতীয় গল্পটি বলা যাক। আমি একটু হাস্যরস পছন্দ করি। কিন্তু জেসমিন আমি কোনো ফান করলে সিরিয়াসলি নেয়। গম্ভীর হয়ে যায়। যাদের সঙ্গে আমি বেশি ঘনিষ্ঠ, যারা আমার স্বভাব বোঝে তাদের সঙ্গে আমি খুউবই ফান করি। হিউমার আমার পছন্দের। এমন সব কথা বলি যে চোখমুখ লাল হয়ে যাওয়ার মতো হয়। কিন্তু সেদিন যেটা করেছি সেটা অপ্রত্যাশিত। অপরিচিত মানুষদের সঙ্গে আমি একদম যেচে কথা বলতে পারি না। আমি একটা গ্রোসারি স্টোরে ঢুকেছি। দেখি একজন ভদ্রমহিলা ভোরের আলো পত্রিকাটা মেলে ধরে আছেন। তিনি আছেন সাত এর পাতায়। এই পাতায় নিয়মিত আমার লেখা ছাপা হয়।
আমি তাকে বললাম, আপনি এই পত্রিকাটা লাইক করেন!
তিনি বললেন হু, খুউব লাইক করি।
কেনো করেন!
অনেক কিছু থাকে। বিশেষকরে এনার (আমার ছবিকে লক্ষ্য করে) লেখার জন্য আমি পত্রিকাটা নেই। ইনি ওনার মায়ের কথা, মামা বাড়ির কথা, শৈশবের সাদামাটা জীবনের কথা লেখেন। আমি যখন কাজে থাকি, আমি বার বার ওনার লেখা পড়ি। পড়লে মন ভালো হয়।
আমার পাশেই দাঁড়ানো ছিলেন ভোরের আলোর সম্পাদক আহাদ খন্দকার। তিনি হেসে বললেন, আপনি যার সঙ্গে কথা বলছেন এনিইতো এই লোক।
ভদ্র মহিলা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বিশ্বাস করলেন না।
বললেন, এই লোকতো ইনি না। এনিতো কেমন শুকনা আর বুড়া দেখতে। ছবির মানুষটা তো বেশ সুন্দর। (লেখার সঙ্গে আমার ছবি থাকে এবং ছবিটা বেশ আগের)
আমার খুবই মন খারাপ হলো! আমি কী বুড়ো হয়ে গেছি! আমি আপসেট হয়ে বাইরে এসে দাঁড়িয়ে থাকলাম..।
আবার উল্টোটাও আছে। যারা আমার লেখার কড়া সমালোচক তাদের কেউ বলে শুধু একই কথা লেখে। নিজের কথা ছাড়া আর কোনো কথা নাই। কেউ বলে লেখার মধ্যে কিছু নাই। জেসমিনও তাদের একজন, বলবে এসব কী লেখো!! কিছু হয় না।
তবে লেখালেখির বাইরেও একটা জীবন আছে। যখন লিখতে বসি তখন প্রায়ই অতীত এসে হানা দেয়। সবারই একটা অতীত আছে। তাই কেউ কেউ লেখার সাথে একাত্মতা অনুভব করে।
ছোটো বেলায় আমি মায়ের সঙ্গে মামা বাড়ি গিয়ে থাকতাম বছরে দু’তিন মাস। সেটা থাকতো শীতের সময়। এমনই শীত যে মায়ের বুকের মধ্যে গুটিশটি মেরে ঘুমাতাম। মায়ের শরীরের ওম আমাকে উষ্ণতা দিত। টিনের চালের ঘরে ফাঁক ফোঁকর দিয়ে ঠান্ডা ঢুকে পড়তো। মনে হতো কাথা কম্বলের উপর কে যেনো ঠান্ডা পানি ঢেলে রেখেছে। সকালে রোদ উঠতো অনেক দেরী করে। কুঁয়াশায় ছেয়ে থাকতো দিগন্ত। রোদটা উঠতে না উঠতেই আবার সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসতো। শীতের বিকেলে আমরা দল বেধে ধানের খেতে নেমে পড়তাম। ঘুড়ি উড়াতাম পাতা দিয়ে। নাড়া কাটতাম (ধান কেটে নেওয়ার পর অবশিষ্টাংশ) ধারোলো কাঁচি দিয়ে (এক ধরনের খাঁজকাটা)। মামী আখের গুর দিয়ে নাড়ু– আর মোয়া বানাতেন সেসব খেতাম মজা করে। আমার বয়সী মামাতো বোনদের সঙ্গে মন দেওয়া নেওয়া করতাম।
সকালে নাস্তা হিসাবে আমরা পান্তা ভাত খেতাম। বরফের মতো ঠান্ডা ভাত, সঙ্গে জমে যাওয়া জিওল মাছের তরকারি। কই শিং মাগুর শোল সরপুটি। আহ্ কী স্বাদ ছিল সেসবের। তরকারি গরম করে খাওয়ার প্রচলন বা একটা ম্যাচের কাঠি খরচ করে চুলো জ্বালানোর মতো বিলাসিতা ছিল না। আমার জন্য ছিল একটা সেগুন কাঠের পিঁড়ি। বেশ বড়সড় পিঁড়ি। দেখতে সুন্দর। আমি আসন পেতে বসতে পারতাম। আর ছিল ঝকঝকে কাসার একটা থালা। সারা বছর এই দুটো জিনিস তোলা থাকতো। আমি গেলেই শুধু বের করা হতো। তখনও ডাইনিং টেবিল কী জিনিস আমি জানতাম না। অনেক পরে যখন আমার বয়স তেরো চৌদ্দ হবে তখন আমি প্রথম ডাইনিং টেবিল দেখি। আমাদের বারিশালের বাড়িতেও আমরা চৌকির উপর বসে সবাই মিলে খেতাম। আমার মা রান্না করে থালে ভাত বেড়ে দিতেন। আমরা হালুম হুলুম করে খেতাম। মা যাই রান্না করতেন তাই ছিল অমৃত। তখনও সিদ্দীকা কবিরের বই বাজারে আসেনি। আসলেও লাভ ছিল না। আমার মা লেখা পড়া জানতেন না। কিন্তু আমার মায়ের মতো জ্ঞানি সক্রেটিসও না।
শীতের সময় ছোট্ট ছোট্ট ডোবার মধ্যে কী করে এতো মাছ থাকে! অবাক কান্ড। ভরা বর্ষার সময় ডালপালা ফেলে রাখা হতো। যখন শীত আসতো, পানি কমে যেতো তখন পানি সেচে থকথকে কাদার মধ্যে থেকে জিওল মাছ মেরে কলসী ভরে রেখে দিত। ছয়মাস প্রায় সেই মাছ খাওয়া হতো। মামা বাড়িতে কয়েকটা পুকুর ছিল। বছরান্তে পুকুর সেচে ফেলতো। তখন তো আর সেচযন্ত্র ছিল না। পুকুর পাড়ে মাচা বানিয়ে সেখানে মুড়ির টিন কেটে দড়ি বেধে পানি সেচা হতো। ম্যানুয়ালি। কয়েকদিন লেগে যেতো। তারপর সবাই মিলে মহা উৎসবে মাছ ধরা চলতো।
খুউব মিস করছি আমার সেই পিঁড়ি আর কাসার থালাকে। পিছনে ফেলে আসা আমার শৈশব আমার কৈশোর আমাকে টানে। খুউব টানে। স্মৃতি ছাড়া মানুষের কিছুই থাকে না। আমার নানা নানী, মামারা, মা বাবা আজ কেউ নাই। কিন্তু স্মৃতিগুলো পড়ে আছে। আজ বহু বছর অসংখ্য মধুর স্মৃতিতে ঘেরা ঢাপরকাঠির সেই তালুকদার বাড়িতে যাওয়া হয় না। আমার সেই পিঁড়ি আর কাসার থালাটা কী আছে! কে জানে..।

ছবি: গুগল

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com