একটা ছেলে মাকে ছেড়ে তেপান্তরের মেঘ…

  •  
  •  
  •  
  •  
  • 0
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শেখ রানা (এডিনবরা, স্কটল্যান্ড থেকে)

৮৪-৮৫-র কোনো এক মন খারাপ করা সকাল। একটা ছোট্ট ক্ষীণকায় শিশু দেখতে পেলো তার মমতাময়ী মা নিউমার্কেট থেকে একটা কালো ট্রাঙ্ক কিনে এনেছে। তার কিছুদিন আগেই ভর্তি পরীক্ষায় প্রবল প্রতিযোগীতার পর একটা সবুজ স্কুলে ভর্তির সুযোগ পাওয়ার আনন্দে বাবা-মার মুখে হাসি দেখে সে আনন্দে ভাসছিলো। সেই আনন্দ স্থায়ী হলো না বেশিদিন।

৮৪-৮৫-র মন খারাপ করা এক সকালে শিশুটা তার বাবার ফিফটি হোন্ডাতে চড়ে চলে এলো স্কুলের হোস্টেল জীবন শুরু করবে বলে। যাবার সময় অভিমানে মার দিকে তাকালোই না। তাকালে দেখতে পেতো মমতায় আর্দ্র হয়ে মার চোখে এক আকাশ মেঘ। কোনোভাবে বাঁধ মানছে না বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়তে।
সেদিন, সেই সরল সকালে শিশুটার মনে তাবৎ পৃথিবীর উপর অভিমান হয়েছিলো।

তারপর সবুজে সমর্পণ, হোস্টেল জীবন আর একটু একটু করে হাসিমুখ…

শিশুটার খুব ধীরে সখ্য গড়ে ওঠে বন্ধুদের সঙ্গে। মেট্রোন টিচার, ওয়ার্ড বয় মতিন ভাই, রুম প্রিফেক্ট চঞ্চল ভাই, ক্লাস থ্রির সহপাঠী সবাই খুব ভালো। একটা নাম গেঁথে যায় মাথার ভিতর। কুদরত -ই-খুদা হাউজ। ভালোবাসা জন্মাতে শুরু করে। খুব ভোরবেলা উঠে পি টি , ফিরে এসে নাস্তা শেষে দলবেধেঁ মার্চ পাস্ট করে স্কুল ভবনে যাওয়া, টিচারদের সঙ্গে পরিচয়, নৌকা-মশাল আকাঁ নতুন খাতার গন্ধ-এ সবেই বদলে যেতে থাকে শিশুটির চারপাশ। চোখ ভর্তি হয়ে যায় স্বপ্নের সবুজে। শৈশবের আনন্দের ফল্গুধারায় শিশুটি ভুলে থাকে মা-এর কথা।
ভুলে থাকা যায় মা-কে?
প্যারেন্টস ডে-তে মার দেখা পেয়ে হু হু করে কান্নাকাটি কে দেখে কার! আর কি অভিমান! কেনো মা একা ফেলে রেখে গেছে? মা পঁচা! মা ভালো না…
মা হাসে, হাত বুলিয়ে দেয় মাথায়। চুলের গন্ধ নেয় সন্তানের।
তারপর মাগরিব এর আজান শুরু হয়। দিন বদলে রাতের কাছে যেতেই সবাই হাউজে ফিরে আসে।

হৃদয়পুরে আনন্দের এক এক স্মৃতি…

আমার নাম রানা। সেই ক্ষীণকায় শিশুটাই আমি। আর আমার স্কুলের নাম রেসিডেন্সিয়েল মডেল স্কুল। ঢাকা শহরে এক টুকরো আনন্দ সবুজ। কি যে সুন্দর একটা স্কুল। মমতাময়ী এক একজন স্যার-টিচার।  সেই স্কুলে এক্সট্রা কারিকুলাম একটিভিটি লেগেই আছে সারা বছর জুড়ে। এই স্পোর্টস তো শুরু হয়ে গেলো  সাংস্কৃতিক সপ্তাহ। হাউজ কম্পিটিশন, ক্লাস টিচারস পিরিয়ড ( সি টি পি) তো লেগেই আছে। পাশাপাশি পড়াশোনার ব্যপারে স্যার-টিচাররা খুব যত্নশীল। মমতার আদরমাখা হাতে আজিজ টিচার যেমন ছিলেন, পান খাওয়া ঠোটে সদা হাস্যমুখী রওশন টিচার যেমন ছিলেন, তেমনি আছেন কঠিনতম রৌফ স্যার, ছিলেন অমায়িক দিল রওশন বানু টিচার। মনে আছে, ক্লাশ ফোরের শেষের দিকে আমার রিউমেটিক ফিভার ধরা পড়লো। সে সুত্রে আমাদের হাউজের হাউজ টিচার (তৎকালীন) আম্মাকে অনুমতি দিলেন আমাকে বাসায় নিয়ে যাওয়ার। আমার খুশী দেখে কে? রিউমেটিক ফিভারের কথা শুনে আম্মার চোখ ছলছল আর আমার আকর্নবিস্তৃত হাসিমুখ। বাসায় তো যেতে পারছি। দিল রওশন বানু টিচারকে মনে হলো এই পৃথিবীর শ্রেষ্টতম টিচার।

মনে আছে, এক গভীর রাতে উঠে হাউজের প্রেয়ার রুমে তাহাজ্জুদের নামাজ পড়েছিলাম। আমি, সাদি, ইমরান আর জুনিয়র এক ছোটো ভাই। উদ্দেশ্য-যাতে আল্লাহ আমাদের বাসায় পৌঁছে দেয়। এখন মনে হলে নস্টালজিক হই শৈশবের সেই সব স্মৃতি ভেবে, হোস্টেলের কথা মনে পড়ে। হোস্টেল জীবন খুব মিস করি বাসায় পৌঁছে।

এ রকমই তো হয়, বৃষ্টি শেষ হয়ে গেলে ফিরে পেতে চাওয়া বৃষ্টি ভেজা সুর…সাত সুখের সমুদ্দুর!

তারপর বড়বেলা…

স্কুল ভবন পেরিয়ে লেফট রাইট, লেফট রাইট করতে করতে চলে আসি কলেজ ভবনে। বড় হয়ে গেছি ভাবতেই কেমন ঝিম ঝিম আনন্দ। ছোটোবেলায় আমাকে কেউ যখন জিজ্ঞাস করতো কি হবো, আমি অবলীলায় বলতাম- বড় হবো। তো, কলেজ ভবনে যেয়ে মনে হলো একটু বড় হয়ে গেছি। ততদিনে আমি সেমিবর্ডার। বাসা থেকে স্কুলে যাই। হোস্টেলের বন্ধুদের দেখি কি পরম বন্ধুত্ব ওদের মাঝে। হাসি-খেলায়-পড়াশোনায় রেসিডেন্সিয়েলের জীবন সুন্দর হয়ে ওঠে। রাশীদ, সালেহ,কামরুল,মিজান,কাবেজ, মিঠু, জ্যোতি, রনি, তানিম, আশরাফ, রুমি, সিজার, পিটার, তাহমিদ- কত কত পরিচিত নাম। মনে পড়ে আমাদের এক বন্ধু ছিলো রুমি। দারুণ গান গাইতো। তখন আমরা ক্লাস ফাইভে। এক অফ পিরিয়ডে শামীমা টিচার ওকে ডেকে নিয়ে বললেন গান করতে। আমরা গান শুনতে লাগলাম। গান শেষে গম্ভীর মুখে শামীমা টিচার জানালেন -‘তোমার এত সুন্দর গলা। তুমি এই ছোট্ট বয়সে এরকম বড়দের প্রেমের গান গাও কেনো? ছোটোদের গান গাইবে।’
ক্লাশ জুড়ে নিঃশব্দে আমাদের ফিক ফিক হাসি আর রুমীর ভ্যবাচ্যাকা খাওয়া মুখ।

ক্লাস ফাইভেরই ঘটনা। আমি তখন  হিন্দী ছবির ডাকসাইটে নায়িকা শ্রীদেবীর প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছিলাম। পরম বিশ্বাসে পাশে বসা বন্ধু রনিকে বললাম আমার বাল্যকালের প্রেমের কথা। তারপর পুরো ক্লাস আমি নীল ডাউন। রনি আমার ভালোর জন্য ক্লাস টিচার দিল রওশন বানু ম্যাডাম কে বলে দিয়েছিলো।
সেই থেকে আমার শ্রীদেবীর সাথে সম্পর্কচ্ছেদ!

কত কত মজার ঘটনা প্রিয় ডি আর এম সি! একবার সুলতান স্যার (আমাদের কেমিস্ট্রি পড়াতেন) আমাদের নিয়ে গেলেন মিউজিয়ামে, লালবাগ কেল্লায়। স্কুলের বাসে করে আমাদের চিৎকারে আশাপাশের যানবাহনের কান পাতা দায়। ভাগ্যিস যানবাহনের কান ছিলো না। তবে মানুষের তো আছে। তারা মহা বিরক্ত। আমরা থোড়াই কেয়ার করি! এক এক বাস বা গাড়ি ওভারটেক করে আমাদের স্কুল বাস আর আমরা প্রবল উৎসাহে- নাইট রাইডার, নাইট রাইডার বলে লাফিয়ে উঠি। তখন নাইট রাইডার দেখাতো বিটিভিতে।
কি সহজ সরল অপাপবিদ্ধ সময় ছিলো সে সব…

ছোটোবেলায় আমি বড় ছিলাম …

এই সব টুকরো আনন্দ স্মৃতি নিয়ে আমরা বেড়ে উঠতে থাকি। স্কুল পেরিয়ে কলেজে উঠি। বৃহস্পতিবারে সেকেন্ড পিরিয়ডে এসেম্বলি-র জন্য নিয়ম করে মাঠে দাড়াই। জয়নুল আবেদিন হাউজকে হারিয়ে হাই ফাইভ করে কুদরত-ই-খুদা হাউজের জুনিয়র ছেলেরা, আর আমরা ততদিনে নজরুল ইসলাম হাউজ, ফজলুল হক হাউজ আর লালন শাহ হাউজ এর হয়ে কম্পিটিশন করি। হাউজ প্রিফেক্ট গিয়ে কুদরত-ই-খুদা’র পতাকা উড়িয়ে আসে। আর সব শেষে গম্ভীর মুখে ‘আমার সোনার বাংলা’- গাওয়া শেষ করে  আমরা ক্লাসে ফিরে যাই।

একদিন সময় এসে ঘন্টা পেটায় ঢং ঢং করে। জানান দেয়, আমাদের চলে যাবার সময়। ৯২-৯৪’ ব্যাচ এর সব প্রিয়মুখ স্কুল কলেজের চারপাশ ছেড়ে নিজ নিজ জগতে চলে যায়। সবাই বড় হয়ে যায়। সাদা শার্ট-সাদা প্যান্ট-কালো জুতো-নেভী ব্লু সোয়েটার আর সময়বিশেষে নেভি ব্লু টাই পড়ার কাল গত হয়। প্রিয় শিক্ষক-শিক্ষিকাদের ছেড়ে আসি, টিফিন টাইমের সিঙ্গাড়া আর ঢাকা শহরের শ্রেষ্ট স্বাদের দুধ-চা ছেড়ে আসি, ছেড়ে আসি অবারিত সবুজ মাঠ-কে।

কিন্তু এই আনন্দ, এই সবুজ,এই নস্টালজিয়া আমার চোখ দিয়ে মাথায় ঢুকে যায়। চোখ বন্ধ করলেই আমি রেসিডেন্সিয়েল এর বিশাল মাঠ দেখতে পাই, স্কুল ভবন-টা বিশাল হয়েই আমার কাছে রয়ে যায়, টিফিন টাইমে ছোটাছুটি আমার কাছে ফিরে ফিরে আসে। পুরো স্কুল কম্পাউন্ড আমার কাছে বিস্ময় হয়ে থাকে, বিশাল হয়ে থাকে থেকে যায় …

এখনও কলেজ গেট পার হবার সময় আমার সেই শৈশবের কথা মনে পরে, সেই ক্ষীণকায় শিশুটার কথা মনে পড়ে, আজিজ টিচার এর মাথা নাড়িয়ে দুলে দুলে ইংলিশ রাইম পড়ানোর কথা মনে পরে।
এরপর দীর্ঘদিন আমি আর স্কুল কম্পাউন্ডে ফিরে যাই নি। ছোটোবেলার সেই মাঠ, স্কুল ভবন, স্মৃতির জানালা-সব সবকিছুকে আমি বড় করেই রেখে দিয়েছি।

ছোটোবেলায় আমি আসলে বড় ছিলাম, বড়বেলায় ছোটো হয়ে গেছি…

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com