একটা কমলালেবু খেতে পারব?

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

১৭ অক্টোবর, ১৯৫৪ সাল। কলকাতার শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালে ২নং ওয়ার্ডের একটা বেডে শুয়ে আছেন তিনি। কোমর থেকে শুরু করে পায়ের পাতা পর্যন্ত তাঁর ব্যান্ডেজ বাঁধা। মুখ বিকৃত, স্ফীত। হন্তদন্ত হয়ে ওয়ার্ডে ঢুকে কবি ও সম্পাদক সঞ্জয় ভট্টাচার্য সোজা গিয়ে বসলেন সেই মানুষটির পাশে। রোগীর কাঁপা কাঁপা হাতটা স্পর্শ করলেন। হঠাৎ সঞ্জয় ভট্টাচার্যের হাত ধরে রোগী বললেন, ‘এখানে ভালো লাগছে না। একটা কমলালেবু খেতে পারব?’ জীবনের শেষদৃশ্যে কমলালেবু খেতে চেয়েছিলেন কবি জীবনানন্দ দাশ।

হেঁটে বাড়ি ফিরছিলেন। পথে কলকাতা শহরের রাসবিহারী অ্যাভিনিউ’র কাছে ‘জলখাবার’, ‘জুয়েল হাউসে’র সামনে রাস্তা পার হওয়ার সময় খুব অন্যমনষ্কও ছিলেন বোধ হয়। কী ভাবছিলেন? কবিতার কথা! শুধু অন্যমনস্ক নয়, গভীর চিন্তায় আচ্ছন্ন ছিলেন সেদিন। তা না-হলে চলন্ত ট্রামটা যে ট্রাম স্পটিং স্টেশন থেকে বের হয়ে তার থেকে পঁচিশ ত্রিশ হাত দূরে সেটা দেখলেন-ই না! অবিরাম ঘণ্টা বাজছিলো ট্রামের। কিন্তু তখন সেই মানুষটির মন কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলো?

ব্রেক কষে গাড়ি থামানো হয়েছিলো। কিন্তু ততক্ষণে তাঁর দেহ আটকে গেছে ক্যাচারের ভেতরে। ক্যাচারের কঠিন আঘাতে রক্তাপ্লুত, অচৈতন্য তাঁর শরীর। বুকে, হাতে, ডান চোখের কোণে তীব্র আঘাত পেয়েছেন তিনি। কেটে, ছিঁড়ে, থেঁতলে গ্যাছে এখানে ওখানে। বুকের পাজরার অনেকগুলো হাড় চুরমার হয়েছে। ভেঙে গেছে উরুর হাড়। তাকে টেনে-হিঁচড়ে বের করলো উপস্থিত জনতা। প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য থেকে জানা যায়, সেই ট্রামটির সামনের অংশ অনেকটাই দুমড়ে গিয়েছিলো অদ্ভুত ভাবে একজন মানুষকে আঘাত করে।১৯৫৪ সালের ১৪ অক্টোবর ট্রামের আঘাতে থেঁতলে যাওয়া দেহটি পথচারীরাই ধরাধরি করে বের করে আনেন ট্রামের তলা থেকে।

সেই পথচারীদের কেউ কেউ দোকান থেকে বরফ এনে তাঁর আঘাতপ্রাপ্ত স্থানে বুলিয়ে দিলেন। ধীরেধীরে তাঁর সংজ্ঞা ফিরলো, প্রশ্ন করলেন সামনে থাকা জটলাকে, ‘কী হয়েছে? আমি এখানে কেন?’ একজন উত্তর দিলো, ‘হাঁটতে হাঁটতে মাথা ঘুরে পড়ে গেছেন।’ বয়স্ক মতো এক ভদ্রলোক প্রশ্ন করলেন কবিকে, ‘আপনার নাম কী? ঠিকানা কী?’ মানুষটি অস্ফুট গলায় উত্তর দিলেন– ‘জীবনানন্দ দাশ। ১৮৩, ল্যান্সডাউন রোড।’ তারপর বাড়ি যাওয়ার জন্য উঠতে গিয়ে আবার পড়ে গেলেন। পায়ের হাড় ভেঙে টুকরো হয়ে গেছে। সবাই ধরাধরি করে তাঁকে একটা ট্যাক্সিতে তুললেন। ওই ট্রামের এক যাত্রী বিমলেন্দু শীল, জলখাবার দোকানের মালিকের ভাই চুনীলাল দে, একজন পুলিশ সহ আরও দু একজন গেলেন সেই ট্যাক্সিতে। সেদিন ল্যান্সডাউন রোডের বাড়িতে জলখাবার দোকানের চুনীলালই দুর্ঘটনার খবরটি পৌঁছে দিয়েছিলেন। ট্যাক্সি চললো শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালের দিকে।

সেই শম্ভুনাথ পণ্ডিত  হাসপাতালের বেডে শুয়ে জীবনানন্দ দাশ যন্ত্রণায় ছটফট করছিলেন ১৪ অক্টোবর থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত। যাঁর ঘরের এককোণে আরেকটি বেডে শুয়েছিলো কুখ্যাত এক খুনী। অস্ত্রোপচার হয়েছিলো তারও। সেই খুনীকে পাহারা দিচ্ছিলো তিনজন সশস্ত্র পুলিশ। লোকটা সারারাত চিৎকার করতো অসহ্য যন্ত্রণায়। এমন ঘরে একজন সুস্থ মানুষও অসুস্থ হয়ে যেতে পারে যে-কোনো সময়।

জীবনানন্দ দাশ ১৪ অক্টোবর বেড়াতে যাবার জন্য বের হয়েছিলেন বাড়ি থেকে। গিয়েছিলেন সুবোধ রায়ের বাড়ি। সুবোধ রায় ইনফ্লুয়েঞ্জার ধাক্কায় কাতর থাকায় সেখান থেকে বের হয়ে একাই হাঁটছিলেন রাস্তা ধরে। এই হেমন্তকালে তিনি ল্যান্সডাউন রোড ধরে কখনো কখনো একা হেঁটে বেড়াতেন। সেদিন সুবোধ রায়ও কিছুক্ষণ পর বের হয়েছিলেন বাড়ি থেকে। ঠিক তখনই তার কাছে খবরটা নিয়ে এসেছিলো কবির ছেলে রঞ্জু।

২২ অক্টোবর, শুক্রবার, সকাল থেকেই কথা বন্ধ হয়ে গেলো তাঁর। কিছুই খাওয়ানো গেলো না। ব্লাড ব্যাঙ্ক থেকে আনা রক্ত বৃথা চেষ্টা হয়ে পড়ে রইলো।রৌদ্রের গন্ধকে পেছনে ফেলে পৃথিবীকে বিদায় জানালেন জীবনানন্দ।

কবিতায় লিখেছেন তিনি, “যেই ঘুম ভাঙ্গেনাকো কোনদিন ঘুমাতে ঘুমাতে সবচেয়ে সুখ আর সবচেয়ে শান্তি আছে তাতে”।
“কোথায় রয়েছে মৃত্যু? কোনদিকে? খুঁজি আমি তারে,”

লেখাগুলোই ছিলো তাঁর সম্বল। তাই একদিন এক সান্ধ্য আড্ডাতে, চুপিচুপি, সুবোধ রায়কে বলেছিলেন, ‘আচ্ছা, এত যে লিখেছি… একটিও কি সুপ্রিম পোয়েট্রি হয়নি? যা আমার মৃত্যুর পর বেঁচে থাকতে পারে?’ এ-কথা শুনে সুবোধ রায় স্তব্ধ হয়ে গেলেও, এর উত্তর দ্বিধাহীনভাবে দিয়েছিলে কবি বুদ্ধদেব বসু, জীবনানন্দ দাশের শ্রদ্ধাবাসরে, ‘রবীন্দ্রনাথের পর বাংলাদেশে জীবনানন্দ দাশের মতো এতো বড়ো প্রতিভাবান, প্রতিপত্তিশালী কবির আর মৃত্যু ঘটেনি।’

প্রাণের বাংলা ডেস্ক
তথ্যসূত্রঃ জীবনানন্দ স্মৃতি, সুবোধ রায়
ছবিঃ গুগল

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com