একজন লেখকের যন্ত্রণা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শেখ রানা (এডিনবরা,স্কটল্যান্ড থেকে)

এক.

‘গান লেখা হলো বিশ্বাসঘাতক শিল্প’

কাওসার আহমেদ চৌধুরী

অন্তর্জালে স্বনামধন্য গীতিকার কাওসার আহমেদ চৌধুরীর একটা সাক্ষাৎকারে চোখ পড়লো।

থমকে গেলাম। কাওসার আহমেদ চৌধুরী বলেছেন এ রকম কথা! কবিতা পড়া প্রহর, রুপালী গিটার, আমায় ডেকোনা, আজ এই বৃষ্টির কান্না দেখে-সহ অসংখ্য প্রিয় গানের গীতিকার যখন লম্বা সময় একটা ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করে এ রকম উক্তি করেন তখন থমকে যাওয়া ছাড়া আর উপায় থাকে না।

দুই.

আশাবাদী মানুষ এর অনেক যন্ত্রনা।

আমি প্রায়শ সেই যন্ত্রনায় ভুগি। কিন্তু আশার আলো ছড়াবো বলে দুঃখগুলো শব্দে ধরে বুক পাঁজর এর দীর্ঘশ্বাসগুলো ফানুশ বানিয়ে উড়িয়ে দেই। এই অব্যক্ত অনুভূতি আসলে মিলিয়ে যায়না। কোথাও না কোথাও থেকে যায়।
পৃথিবী এখন একটা রঙমহল। নানা রঙে মানুষ প্রতিদিন রঙ ছড়ায়। সেই রঙের ফাঁকে ফাঁকে ঘুনে ধরা এক এক রঙ উঁকি দেয়।

তিন.

এই যে একটা অ্যালবামের জন্য লিরিক নিয়ে,পরে গীতিকার এর কাছে কোনোরকম দুঃখ প্রকাশ না করে অন্য গীতিকারের লিরিকে অনায়াসে অ্যালবামের কাজ করাটা- একজন শিল্পী বা কোনো কোম্পানীর কর্ণধার কারো কাছে একেবারেই কাম্য নয়।

ইদানিং আর এক ব্যাপার শুরু হয়েছে সেটাও উল্লেখ করার মতো-প্রশংসার তুবড়ি ছুটিয়ে লিরিক নিয়ে, কোনরকম সম্মানীর ধারে কাছে না গিয়ে সেই লিরিক ফেলে রাখা বছরের পর বছর। এই দুই ঘটনাই অস্থিরতা সেই সঙ্গে অপেশাদারিত্বের চূড়ান্ত একটা চিত্র তুলে ধরে। সেটা যেই করুক, বড় কোনো নাম বা নামহীন কেউ। বড় নাম বা প্রচুর ফলোয়ার দেখে তাকে গান সংশ্লিষ্ট করার কথা আর নাই বললাম।

সময় যেহেতু এখন পাগলা ঘোড়া!

চার.

গত কিছুদিন ধরে ইউটিউবে একাত্তর টিভির মিউজিক বাজ অনুষ্ঠান দেখছিলাম। ব্যান্ড গায়ক, গিটারিস্ট, ড্রামার-চমৎকার মিম্থস্ক্রিয়া হয়। পেশাদারিত্বের আদল গড়ে ওঠা, একটা ইনফ্রাস্ট্রাকচার তৈরি করা, সবার মূল্যায়ন নিশ্চিত করা- প্রতিটা কথা মূল্যবান। এই রকম কথা আমি গত বিশ বছর ধরে শুনে আসছি। ব্যান্ড সঙ্গীতের ইতিহাস তো আরো পুরানো। একটা ইন্ডাস্ট্রি কেন ৩০ বছরেও শক্তপোক্ত জায়গায় যায় না? সমস্যা ঠিক কোন জায়গায়? শুধু বলে গিয়ে নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত থাকায়? অর্থ আর খ্যাতির মোহ? না কি আমাদের অর্থ নির্ভরতার সামগ্রিক চালচিত্র? তাই তো হবার কথা। জীবন বাদ দিয়ে তো গান নয়।

পাঁচ.

টাকার প্রশ্ন এলেই অডিও কোম্পানীর মালিক ভুল তথ্য দিয়ে শিল্পীকে ঠকায়। শিল্পী সেই ঠগবাজ বৃত্তে আত্মসমর্পণ করে, মিউজিশিয়ানদের ঠকায়, লিরিক নিয়ে গীতিকারদের ঠকায়। গীতিকারদের কাউকে ঠকানোর জায়গা নেই বলে শেষ মানুষটি হয় গীতিকার। আমি প্রায় নিশ্চিত যে, আমার কাছে বৃষ্টি এসে যদি বলতো-‘এই যে ভাই, আমাকে নিয়ে এই কয়টা গান লিখেছেন, আমার রয়্যালিটি-টা দিলে ভাল হয়’- আমি বৃষ্টিকে বাইপাস করে রোদের পথে হাঁটতাম।

ছয়.

যেসব জায়গায় গান একটা শিল্প একইসঙ্গে বানিজ্যের পথ ধরে হাঁটে, বিশেষ করে পশ্চিমা দেশে-সেখানেও কিন্তু গীতিকারদের নাম কেউ জানে না সেভাবে, তবু একজন গীতিকার সুখী মানুষ এখানে। কারণ রয়্যালটি, কপিরাইট আর সম্মানী। এই তিনের মিশেলে গান লেখাকে অনায়াসে জীবিকা হিসেবে নেয়া যায়। এই তো হওয়া উচিত। একটা ইন্ডাস্ট্রিতে একজন শিল্পীই তো মূখ্য হবেন। সেই সঙ্গে একজন সেশন গিটারিস্ট, একজন সুরকার, একজন গীতিকারসহ গান সংশ্লিষ্ট সবাই নিজ সামর্থ্য আর মেধা অনুযায়ী সন্তুষ্ট থাকবেন।

সাত.

অনলাইনে গান প্রচার আর প্রসারের ব্যাপারটা আমি যোগবোধক হিসেবে দেখি। দেখি, কারণ এটাকে গ্রহণ না করে আমার উপায় নেই। উপায় থাকলে আমি ক্যাসেট যুগ আকড়ে বসে থাকতাম। আরো লক্ষ্য করি, সেখানে এখন গান এর টাইটেল আর শিল্পীর নাম ছাড়া ক্রেডিট লাইনে আর কেউ নেই। গ্রামীন আর রবির কথা বলছি। অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে এখন? তাহলে খুবই ভাল।

আমার মনে হয়, এ রকম একটা নড়বড়ে শুধু মাত্র ওয়ার্ড অফ মাউথ নির্ভর ইন্ডাস্ট্রিতে এত কিছুর পরেও এত শ্রোতাময়, এত মোহময় হয়ে থাকার একটাই কারণ-আমাদের গীতিকার, সুরকার, গায়ক, মিউজিশিয়ানদের মেধা। মেধা আর গানের জন্য আকুল ভালোবাসা। এই একটা জায়গায় কোনো রকম দ্বিমতের সুযোগ নেই। খুব ভালো হতো যদি এই ভালোবাসাটা সম্মিলিত হতো।

সম্মিলিত ভালোবাসায় যে কোনো অন্যায় খরকুটোর মত ভেসে যায়, গেছে।

আট.

গান লেখা একটা বিশ্বাসঘাতক শিল্প- প্রিয় গীতিকার কাওসার আহমেদ চৌধুরীর এই কথাটা মনে থেকে মুছে ফেলতে চাই। আজ আমি হতাশার কথা বললাম, কিন্তু দিন শেষে আশার কথাই বলতে চাই।

বাস্তবতা মাঝে মাঝে আমার বুকে জগদ্দল পাথর হয়ে চেপে বসে। আমার মত, যারা গীতিকার হয়ে জীবন যাপন করতে চেয়েছিলেন, বা এখনও চান শুধুমাত্র তারাই বুঝতে পারবেন এই পাথরের ওজন কতটুকু।

আর কারও বোঝার কথা নয়।

ছবি:মুরাদ ও গুগল

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com