একজন ফজলু মিয়া

  •  
  •  
  •  
  •  
  • 0
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ইরাজ আহমেদ

ফজলু মিয়া ছিলেন এই শহরের ওস্তাদ বই চোরদের একজন। আমার বাড়ির বইয়ের শেলফে রাখা মহাকাশ বিজ্ঞান বিষয়ক ভারী আর বেঢপ আকৃতির বইটার দিকে চোখ পড়লেই ফজলু মিয়ার কথা মনে পড়ে। তাকে আমি প্রথম দেখি আশির দশকে ‘সাপ্তাহিক বিচিত্রা’ অফিসে।মধ্য বয়সী মানুষ, মাথায় টুপি, পরনে বেশীরভাগ সময় পাঞ্জাবী আর প্যান্ট। তার কাঁধে ঝোলানো থাকতো বড় একটা ব্যাগ। ব্যাগের ভেতরে রাজ্যের বই আর ম্যাগাজিন। সবই চুরি করা।এই তথ্যটা প্রথমে আমার জানা ছিলো না। বিচিত্রা সম্পাদক প্রয়াত শাহাদৎ চৌধুরীর ঘরে ফজলু মিয়ার ছিল অবাধ যাতায়েত। শাহাদৎ ভাই প্রচুর বই পড়তেন। নিজের টাকায় প্রচুর বই কিনে বিচিত্রার জন্য তৈরী করেছিলেন মূল্যবান এক লাইব্রেরী। ফজলু মিয়ার হাত সাফাই করা বইও সেই লাইব্রেরীতে ছিল।

একদিন কেনো একটা কাজে সম্পাদকের ঘরে ঢুকে দেখি টেবিলে বেশ কয়েকটি বই রাখা। তার মধ্যেই ছিল সেই ‘স্পেস’ নামের বইটা। বইগুলো পৃষ্ঠা উল্টে দেখছিলাম। মনে আছে শাহাদৎ ভাই হেসে বলেছিলেন ‘ফজলু দিয়ে গেছে। জানো তো, এই সবই চুরি করা।’ কথাটা শুনে অবাক হয়েছিলাম। আমি ভাবতাম এসবই পুরনো বই। সম্পাদক জানিয়েছিলেন, ফজলু মিয়াকে অ্যাসাইমেন্ট দিলে সে যে কোন লাইব্রেরী থেকে বই চুরি করে এনে দিতে পারে। তবে এখানে বলে রাখি, ফজলু মিয়া শুধু চোরাই বই বিক্রি করতেন না। ঢাকায় তখনকার পত্রিকা অফিস, বই সংগ্রাহক ব্যাক্তি আর জাতীয় প্রেসক্লাবে বিদেশী ম্যাগাজিন সরবরাহ করতেন। সেটা অবশ্য অবৈধ কোনো পন্থায় সংগ্রহ করা হতো না। সেদিন ওই বইগুলো থেকে মহাকাশ বিজ্ঞানের বইটা আমি কিনে নিয়েছিলাম। ফজলু মিয়া আমাকে কাকা বলে ডাকতেন। আমার নানা ধরণের বিদেশী ম্যাগাজিন পড়ার হাতেখড়ি তার কাছেই।

ফজলু মিয়ার সেই চোরাই বই তখন এই শহরের দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকার অনেক সাংবাদিকের টেবিলেই পৌঁছে যেতো। আমি অবাক হয়ে দেখতাম চোরাই বইগুলো সবার রুচি বুঝেই নিয়ে আসতেন ফজলু মিয়া। মাঝে মাঝে জোর করে বই গছিয়ে দিয়ে যেতেন। বেশ অনেক বছর হলো বেঁচে নেই ফজলু মিয়া।তার ছেলেরাই তার ম্যাগাজিন বিক্রির ব্যবসাটা করে। তবে বই চুরির সঙ্গে তারা জড়িত কি না জানা নেই।

এই শহরে বই চোরদের দাপটে এক সময় বিপদে থাকতো বই মেলার বই প্রকাশকরা। বাঙলা একাডেমীর একুশে‘র গ্রন্থ মেলায় বই চোরদের উৎপাত ছিল সাধারণ ব্যাপার।বই চুরি ঠেকাতে প্রকাশকরা অস্থির হয়ে যেতেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকা অবস্থায় বই মেলার একদল বই চোরের সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল। তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরই ছাত্র।  দলবেঁধে মেলায় এসে বিভিন্ন স্টল থেকে বই নিয়ে যেতো তারা। এই অভিযান শুরু হতো মেলার শেষ দিনে। অবশ্য তাদের বই হরণ করার প্রক্রিয়াটিকে অবশ্য অপহরণও বলা যায়। একবার তারা একটা ঠ্যালাগাড়ি জোগাড় করে ঢুকে পড়েছিল মেলায। তারপর সেই ঠ্যালাগাড়ি নিয়ে স্টলে স্টলে গিয়ে চলেছিল বই অপহরণ অভিযান।

সাংবাদিকতা করার সময় জেনেছি ঢাকার পুরনো অংশে একদা সংঘবদ্ধ বই চোরদের দল ছিল। তাদের অবশ্য পরিচালনা করতো পুরনো বইয়ের দোকানীরা। তাদের দোকানের মূল চালানই ছিল চুরি করা বই।

এখন এই শহরে বই চোরদের কথা আর শোনাই যায় না। সাধারণ মানুষের সম্পদ লুন্ঠন করার জন্য বহু চোর অথবা ডাকাত আছে এখানে কিন্তু উধাও হয়েছে বই চোরেরা।ফুলার রোডে বৃটিশ কাউন্সিল লাইব্রেরী অথবা শাহবাগ মোড়ে কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরী একদা ছিল বই চোরদের স্বর্গ। আমি নিজেও বৃটিশ কাউন্সিল লাইব্রেরী থেকে বই উধাও করে দিয়েছি। এরকম আরো অনেক লাইব্রেরী ছিল ঢাকার বিভিন্ন এলাকায়। সেখান থেকে উধাও হয়ে যাওয়া বইয়ের দেখা মিলতো পুরানা পল্টনের ফুটপাতে অথবা পুরনো বইয়ের দোকানে। চোরাই বই বিক্রির আরেকটি বড় জায়গা ছিল নীলক্ষেতে পুরনো বইয়ের দোকানগুলো। এই শহরের বাসিন্দারা এখন বই প্রেমে উদ্বেলিত নয় খুব একটা। তাই এই শহর থেকে বই চোরেরাও হয়তো হারিয়ে গেলো।

ছবিঃ প্রাণের বাংলা   

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com