একজন অনীতার গল্প…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শরদিন্দু ভট্টাচার্য্য টুটুল

এক.
সব কিছু মনে হচ্ছে অনীতার। লোকগুলো তাকে রাস্তার মোড় থেকে বুকে পিস্তল ঠেঁকিয়ে পাঁজাকোলে করে তুলে এনেছিলো। অনিতা সাহস করে চিৎকার দিতে চেয়েছিলো। কিন্তু যখনই মনে হলো দুর্বৃত্তরা তার মুখে কাপড় গুঁজে দিয়েছে, তখনই আবার মনে হলো আজ সে সবকিছু হারাবে। হারাবে মনের উচ্ছলতা। হারাবে তার এতোদিনকার লালন করা মনের অহংকারটুকু।
হ্যাঁ অহংকার! শব্দটি মনে হতেই অনীতা ভাবলো কিছু কিছু অহংকার মানুষকে তাড়িয়ে বেড়ায় সুদূর নক্ষত্রের সীমানা পর্যন্ত। কি ছিলো না অনীতার! সব ছিলো। নিঃশব্দের ঠিকানা পর্যন্ত তার জানা ছিলো। সে ভাবতো মধ্যবিত্তের অলীক উচ্ছাস মানুষকে কিছুই দিতে পারে না। তবুও অনীতা শরীরের পবিত্র বেদনাকে সামলে চলতো।
অনীতা যখন অফিস থেকে বেরোয় তখন সন্ধ্যা হয়নি। দিনের শেষ আলোর মালা মাটিকে তার আদর বিলিয়ে যাচ্ছে। অফিস থেকে বেরিয়েই সে একবার ভাবলো নীলার ওখানে যাবে।
নীলা তার কলেজ জীবনের সাথী। নীলার সঙ্গে ওর অনেক বেদনা, অনেক কান্না জড়িয়ে আছে। অনীতা ভালো করে জানে, সে নীলাকে ভালো চোখে দেখে না। তবুও মনের গভীর কোনে নীলাকে অনুভব করে। কিন্তু কেন! অনীতা তা-ও জানে না। কিছু কিছু বিষয় আছে, যার কোনো সঠিক ব্যাখ্যা থাকে না। মনের একটা অনাবিল টান কিছু কিছু বিষয়কে ধরে রাখে। কেউ তা থেকে ইচ্ছে করলেও ছুটে আসতে পারে না।
দুর্বৃত্তরা তাকে যখন রাস্তার মোড় থেকে পাঁজাকোলে করে তুলে আনে, তখন সময় হলো তরুণী রাত্রি। সে নীলার ওখানে গিয়েছিলো। নীলার দরজায় তালা দেখে ফিরে আসে। নীলার সঙ্গে আর কেউ থাকে না। মা-বাবা, ভাই-বোন তার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখে না। তারা বলে-নীলা নষ্ট হয়ে গেছে। কোথায় যায় কেউ জানে না। মধ্যরাতে একা একা বাড়ি ফিরে। বন্ধুদের সঙ্গে রাত কাটায়।
কথাটা ফেলা দেবার মতো নয়। তবুও অনীতা নীলাকে মনে করে। সময় সুযোগ পেলেই দেখা করে। যদিও সে জানে নীলা তাকে একবার বড়ো বিপদে ফেলেছিলো। তারপর অনেক দিন যায়। অনীতা নীলার সঙ্গে কোনো কথা বলেনি।
একদিন সন্ধ্যা রাত্রিতে অনীতা তার ছোট বোনকে নিয়ে কলেজের বিজ্ঞান মেলায় এক স্টল থেকে যখন অন্য স্টলে ফিরছিলো, তখনই নীলার সঙ্গে দেখা। নীলা তাকে ডাক দেয়। সে জবাব দেয় না।
ছোট বোন নিভা বলে- দেখো তোমাকে একজন ডাকছেন।
অনীতা মুখটা গম্ভীর করে বলে- চল এবার বাসায় যাই। অনেক রাত হয়ে যাচ্ছে। তোর তো সবই দেখা হলো।
নীলা এক সময় তার সামনে এসে দাঁড়ায়। বলে- আমাকে ক্ষমা করে দেয়। আমি তোর কাছে অনেক বড় অন্যায় করেছি।
অনীতা যেন নীলার কথা শুনতেই পাচ্ছে না।
নিভা তাকে বলে-শোননা উনি তোমাকে কি বলছেন।
এবার সে নীলার দিকে তাকায়। তারপর বলে- তুই না বলেছিলি এবার মেলায় থাকবি না।
নীলা অনীতার হাত ধরে বলে- আমি না বুঝে কিছু একটা করে ফেলতে চেয়েছিলাম। আমি তোর কাছে ক্ষমা চাচ্ছি। বল, তুই আমাকে ক্ষমা করে দিবি। সেদিনের কথা ভুলে যাবি।
কথাগুলো করুণ সুরে বলছিলো। শুনে নীলার মায়া হলো। সে এখন বুঝতে পাচ্ছে না, নীলা কথা শুনে কেন বেদনার্ত হয়ে উঠেছে। অথচ এখনও মনে আছে সব। সেদিন নীলা তাকে সমকামে আহ্বান করেছিলো। নীলার কথা শুনে সমস্ত শরীর দিয়ে যেন ঘৃণার পোকারা পরশ বুলিয়ে যাচ্ছিলো। তারপর সে মনে মনে ঠিক করেছিলো কোনদিন নীলার সঙ্গে আর সম্পর্ক রাখবে না। নীলা অন্যরকম হয়ে গেছে। তার সঙ্গে আর সম্পর্ক রাখা যায় না। নীলার শরীর মন কুৎসিত হয়ে গেছে। যার মন কুৎসিত হয়ে যায় তার সঙ্গে ভাল সম্পর্ক রাখা যায় না।
নিভা অনীতার অবস্থা দেখে বলে-তোমার কি হয়েছে? তোমার শরীর এমনভাবে কাঁপছে কেন? উনার কথার জবাব তুমি দিচ্ছ না কেন?
অনীতা কি যেন ভাবলো। মনে হলো- নিভার এতোগুলো প্রশ্নে উত্তর কি করে দেবে। নিভা অনেক ছোট। এখনও সবকিছু বুঝার বয়স হয়নি। আর সবচেয়ে বড় কথা হলো, তাকে বলাও যাবে না কেন সে নীলার কথার কোনো জবাব দিচ্ছে না।
অনীতা শুধু নিভাকে বলে- মনে হচ্ছে আমার জ্বর আসছে। বাথরুমে খুব করে ভিজেছি। তাই সর্দি লেগেছে। মনে হচ্ছে জ্বরও এসেছে।
নিভা অনীতাকে কিছু বলে না। শুধু নীলার দিকে তাকিয়ে বলে- আমাকে একটু সাহায্য করবেন?
নীলা বলে- অবশ্যই।
-আমাদেরকে একটা রিক্সা ডেকে দেবেন।
-দেব না কেন
নীলা তাদেরকে রিক্সা করে দেয়। রিক্সা চলতে আরম্ভ করলে নীলা শুনতে পায় অনীতা বলছে- নীলা তুই জঘন্য। তবুও আমি তোকে ক্ষমা করে দিলাম।
নীলা অনীতার কথা শুনে পাথরের মূর্তির মতো নীরব নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
আজ এই অবস্থায় অনীতা ভাবতে পারে না কেন তার কেবলই নীলার কথা মনে হচ্ছে। তা কি এই ঘটনার সময় সে নীলার ওখান থেকে ফিরছিলো বলে। নাকি আর কিছুই তার মনে হচ্ছে না বলে। তার তো আরো অনেক কিছু মনে হাতে পারতো। চোখের সামনে দোলে উঠতে পারতো একটি লাল গোলাপের প্রতিচ্ছবি কিংবা মনে হতে পারতো সেই গল্পটার কথা। যেখানে একটি বন বিড়াল একটি শুভ্র পায়রাকে কিভাবে ছিঁড়ে খুবলে খাচ্ছে, না, অনীতার কিছুই মনে হয়নি। তার মনের অবস্থা এখন বিভ্রান্ত কোনো রাজনীতিবিদের মতো। সে কিছুই ভাবতে পারছে না। সে কি করবে। সে কি বাড়ি ফিরে যাবে নাকি সোজা নীলার ওখানে উঠবে। কিছুই মনে করতে পারছে না। লোক গুলো একে একে সবাই তার উপরে উঠেছে। তাঁকে বিবস্ত্র করার সময় সবার মুখের ছবি শীতের রাত্রের গৃহস্থের হাঁস-মোঁরগের ঘরে হানা দেয়া শিয়ালের মতো এখন মনে হচ্ছে। কারো মুখের ছবিতেই যেন মানুষের মুখের ছবি ফুটে ওঠছে না। অনীতা ভাবে মানুষ গুলো কি সব শিয়াল হয়ে গেছে? যাদের মধ্যে কোনো মমতা নেই।
একটা লোক যখন তার শরীরের অলিগলিতে হাত বুলিয়ে যাচ্ছিলো তখন অনীতার মনে হলো লোকটা কোনো মানুষ নয়। ওদের সবকিছুতেই যেন পশুর স্বভাবের প্রতিচ্ছবি দোলে উঠেছে।
অনীতার এমন অনেক এলোমেলো কথাই মনে হচ্ছিলো। সে স্থির ভাবনায় যেতে পারছে না। একজন ধর্ষিতা রমণীর পক্ষে কি সম্ভব কোনো স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছানো।
আজ সে স্বপ্ন দেখতে পারতো সুন্দর একটি সকালের কিংবা সে অফিস থেকে ফিরতে পারতো শংখ ঘোষের কবিতা মনে মনে একান্ত ভাবে আবৃত্তি করতে করতে। অনীতা ইচ্ছে করলেই পারতো নামী-দামী ক্রিকেটারের কথা ভেবে বাড়ি ফিরতে। না, অনীতা কিছুই ভাবেনি।
(চলবে)

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com