এই শহরের হারিয়ে যাওয়া চোর

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ইরাজ আহমেদ

এক সময়ে আমাদের বাড়িতে প্রায় রোজ রাতেই চোর আসতো। খুব সাধারণ চোর। তখন এই শহরের রাতের শরীরে এতো ঝলমলে আলো জ্বলতো না, রাজপথ রাত্রি হলে শুনশান হয়ে যেত। গলিপথের ভেতরে বাড়িঘরগুলো যেন রাত্রি সাবালক হবার আগেই অন্ধকারের চাদর জড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়তো।তখন শুধু জেগে থাকতো পথের কুকুর, পাহারাওয়ালার বাঁশি আর চোর।এখন এই শহরে বাড়িতে চোর আসার কথা আর শোনাই যায় না। সাধারণ চোরদের গল্প বোধ হয় এই শহরে ফুরিয়ে গেলো। এখন রাজত্ব ডাকাতদের।
চোর আসতো মাঝরাতে। টের পেতাম আমার পোষা কুকুরটা ঘরের ভেতরে অস্থির হয়ে উঠলে। বর্ষাকালে মাঝে মাঝে বাড়ির উঠানে কাদার মধ্যে চোখে পড়তো অচেনা মানুষের পায়ের ছাপ। আমরা থাকতাম একটা দোতলা বাড়ির একতলায়।বাড়ির চারপাশে দেয়ালের গন্ডী থাকলেও চোরেরা খুব সহজেই সেই দেয়াল টপকে ঢুকে পড়তো বাসার ভেতরে। আর তখনই কুকুর ডাকতে শুরু করতো। কৈশোরে একটু গা ছম ছম করতো। পরে আরেকটু বড় হয়ে গেলে চোর ধরার জন্য বের হতাম ঘর থেকে। এই চোরেরা অবশ্য খুব বেশীকিছু নিতে পারতো না। তাদের সংগ্রহে থাকতো কারো বারান্দায় ভুল করে রেখে যাওয়া দু একটা কাপড়।গরমের দিনে খোলা জানালার ফাঁক গলে লম্বা বাঁশের মাথায় লাগানো আঁকশি দিয়ে ঘরের ভেতর থেকে তারা তুলে নিতো জিনিসপত্র। বাড়ির রেডিও হতো তাদের প্রধান শিকার। তখন বেশিরভাগ রেডিওর মাথায় হ্যান্ডেল থাকতো। টেবিলের ওপর রাখা রেডিও হ্যান্ডেলে আঁকশি লাগিয়ে সেটা টেনে নিতো তারা। বাড়িতে চোর এলে পরদিন সকালে পাড়ায় তা নিয়ে চলতো জোর আলোচনা। চোর ধরার নানা পদ্ধতি নিয়ে চলতো অঙ্ক কষা।

চোরদের সঙ্গে তখন বড় পোটলা থাকতো। সেটা বেশীরভাগ সময়ই তৈরী হতো পুরনো লুঙ্গি অথবা চট দিয়ে। চুরির মাল সেই পোটলায় ঢুকিয়ে তারা পালাতো। কখনো ধরা পড়ার ভয়ে চোর পালিয়ে গেলে তার ফেলে যাওয়া পোটলা খুলে পাওয়া যেতো হাতঘড়ি, শাড়ি, প্যান্ট, তোয়ালে, জুতা এমনকি মোজাও। সেইসব চোরেরা বাড়ির জানালার ছিটকিনি, পানির পাইপ আর ম্যানহোলের ঢাকনাও চুরি করতো। একবার এক চোরের ফেলে যাওয়া পোটলার ভেতরে পুরনো আন্ডারওয়্যারও পেয়েছিলাম।

তখন এই চোররা সারা গায়ে তেল মেখে চুরি করতে আসতো। মাথার চুল ছোট করে কাটা। সেইসব চোরদের স্বাস্থ্য খুব একটা পেটানো থাকতো না। খুবই দূর্বল ছিলো তাদের শরীরের কাঠামো। তবে আমি অবাক হয়ে দেখতাম ধরা পড়ে অনেক মার খাওয়ার পরেও তারা খুব কান্নাকাটি করতো না। এই প্রজাতির চোরদের আমরা বলতাম ‘পেশাদার চোর’। আবার আরেক প্রকৃতির চোর ছিলো ধরা পড়ে গেলে কান্নাকাটি করে অস্থির হয়ে যেতো। হাতে পায়ে ধরে বারবার মাফ চাইতো। মজার ব্যাপার হচ্ছে ধরা পড়া চোরদের কয়েকপ্রস্থ ধোলাই দিয়ে ছেড়ে দেয়া হতো। থানা-পুলিশের চক্করে কেউ যেতো না। আর সেই চোররা ঈশ্বরের নামে শপথ করে বলে যেত আর কোনদিন চুরি করবে না। তারপর আবারো কিছুদিন পর তারা পাড়ায় আসতো চুরি করতে। এরকম চোর দ্বিতীয় অথবা তৃতীয় দফায় আমাদের হাতে ধরা পড়েছে।

চোরেরা কখনো আসতো দলবেঁধে, আবার কখনো একা। মনে আছে একবার কোন এক বৃষ্টির রাতে এমনি এক চোরের দেখা পেয়েছিলাম। তখন রাত দুটো হবে। আমি থাকতাম বাড়ির বাইরের দিকের ঘরটাতে। তখন এরকম আলাদা ঘরকে বসার ঘর বলা হতো। ঘুম ভেঙ্গে উঠে ঘরের বাইরে বাথরুমে যাবার জন্য ঘরের দরজা খুলে বের হয়েছি। বাইরে অঝোর ধারায় বৃষ্টি পড়ছে। হঠাৎ বারান্দার গ্রিলের বাইরে চোখ পড়তেই দেখি খালি গায়ে লুঙ্গি কাছা দেয়া একজন মানুষ উঠানের শিউলি গাছটার আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে একটা ছোট চটের ব্যাগ। তার সঙ্গে চোখাচোখি হয়ে যাওয়ায় আমি স্থির হয়ে গেলাম। সেই লোকটাও কয়েক সেকেন্ডের জন্য পাথরের মূর্তি। অঝোর বৃষ্টিতে ভিজছে একজন মানুষ। হাতের নাগালেই এক চোর। কেন সেই মানুষটি সেদিন আমার দিকে তাকিয়ে ছিলো আর আমিই বা চীৎকার করে উঠিনি তাকে দেখে সে প্রশ্নের সমাধান আজও বের করতে পারি নি। তাকিয়ে থেকে দেখলাম লোকটা হঠাৎ নড়ে উঠলো। তারপর ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে আমাদের বাড়ির বাইরের দিকের উঁচু দেয়ালটা টপকে উধাও হযে গেলো বৃষ্টির ভেতরে। ততক্ষণে আমার কুকুরটা ঘর থেকে বের হয়ে এসেছে অচেনা মানুষের উপস্থিতি টের পেয়ে। কিন্তু চোর তখন উধাও। আমিও আবার ঘরে ঢুকে শুয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু সেই চোরের কথা আমার এখনো খুব মনে পড়ে। সে কী বেঁচে আছে আজো এই পৃথিবীতে? জানতে ইচ্ছে করে আমার।

যে সময়ের কথা বলছি তখন পাড়ায় চোরের উপদ্রব বেড়ে গেলে আমরা বন্ধুরা দলবেঁধে রাতে পাহারা দিতাম। আমাদের সঙ্গে থাকতো লাঠি, টর্চ আর দড়ি। সেইসব নৈশ অভিযান ছিলো আমাদের জন্য মহা উৎসবের ব্যা্পার। কারণ তখন আমরা নিজেরাই চোরে পরিণত হতাম। কার বাড়ির পেয়ারা গাছে পেয়ারা বড় হয়েছে, কার গাছে ডাব আছে সেগুলো সাবাড় করতে ব্যস্ত হয়ে উঠতাম। তবে শুধু যে নিজেরাই চুরি করতাম এমন নয়। মাঝেমধ্যে চোরও ধরেছি। ধরা পড়লে সেই চোরদের কপালে নিশ্চিত থাকতো বিস্তর ধোলাই। এখন চারপাশে ডাকাত আর লুটেরাদের উৎসব দেখে ভাবি, তখন সেইসব সামান্য চোরদের মেরে খুব অন্যায় কাজ করেছি। ওই মানুষগুলো হয়তো সামান্য গ্রাসাচ্ছাদনের জন্যই চুরিকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলো। আর সেই চুরি করা দ্রব্যগুলোও ছিলো কম দামি এবং পুরনো।

চোরদের কাহিনী ফুরিয়ে এলো। দারিদ্র্য আর অপুষ্টিতে ভোগা সেইসব মানুষ। যারা রাত হলে বের হয়ে পড়তো। শীত অথবা বৃষ্টির রাতে ভুতের মতো ঝুলে থাকতো কোনো বাড়ির ড্রেন পাইপে, টপকাতো দেয়াল, স্পাইডারম্যানের মতো উঠে পড়তো জানালার উপরের সানশেডে। অদ্ভূত কৌশলে জানালার ফাঁক গলে চুরি করতো জিনিসপত্র।এখনকার মতো এয়ারকন্ডিশনড ঘরে বসে ঠান্ডা মাথায় তারা আত্নসাত করতো না মানুষের কোটি কোটি টাকা।

ইরাজ আহমেদ
ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com