এই শহরের হারানো সার্কাস

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ইরাজ আহমেদ

শীতকাল এলে সার্কাসের দলের কথা খুব মনে পড়ে। মনে পড়ে হাতির পিঠে চড়ে সার্কাসের দলের লোকেরা তাদের প্রচারণা চালাতো আসতো। প্রথম সার্কাস দেখি এই শহরে দেশ স্বাধীন হবার পর। ১৯৭৩ অথবা ১৯৭৪ সালে। তখন ঢাকায় বাণিজ্যমেলা আসর বসতো সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। ওই সময়ে ঢাকায় এসেছিল রুশ সার্কাসের একটি দল। বাবার হাত ধরে সেই আমার প্রথম সার্কাস দেখতে যাওয়া। শীতকালের সন্ধ্যা, বেশ ঠাণ্ডা পড়েছিল মনে আছে। গরম কাপড় পড়ে সার্কাসের তাবুতে ঢুকে হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম এতো উজ্জ্বল আলো দেখে। কিন্তু তখনো আমার জন্য অপেক্ষা করছিলো অনেক বিষ্ময়।ট্র্যপিজের খেলা, শূণ্যে ভাসমান নরনারীদের নিপুন কৌশলে উড়ে যাওয়া, বাঘের খেলা, বাঁদরের রগড় আর ক্লাউনদের কাণ্ড আমার বালক দৃষ্টিকে বিষ্ময়ে আবিষ্ট করে রেখেছিল অনেকটা সময়।তখন কিছুদিন জীবনের একটাই স্বপ্ন ছিলো ট্র্যাপিজের খেলোযাড় হওয়ার।
যতদূর মনে পড়ে, এরপর সার্কাস দেখি এক দেশীয় দলের। ওখানেই প্রথম মৃত্যুকূপে মোটর বাইক চালকের অসাধারণ বাইক চালনা দেখি। বিশাল কূয়ার মতো কাঠের তৈরী এক কূপ। সেখানে কূপের গোল দেযালের ওপর এক বাইক আরোহী প্রচণ্ড গতিতে মোটর সাইকেল চালাবে আর ঘুরবে। সেই দলের সঙ্গে অবশ্য বাঘ, সিংহ ছিলো না। তবে ভালুক আর বামন ক্লাউনদের খেলার দৃশ্যগুলো আজো চোখে ভাসে।
এই শহরে সার্কাসের দল আর সার্কাস দেখাতে আসে না। সেই হাতির সঙ্গে বিচিত্র রঙবাহারী পোশাক পড়া মানুষেরা আসে না সার্কাসের কথা জানান দিতে। তরুণ বয়সে গ্রামের বাড়ি যেতে লঞ্চে দেখা মিলেছিলো সার্কাসের দলের। মেঘনা নদীর ওপর শীতকালে ভেসে যাচ্ছে লঞ্চ। দু’পাশে সরষে ফুলের স্নিগ্ধ হলুদ রঙ লেগেছে। সার্কাসের ছোট দলটি বসে ছিলো লঞ্চের ডেকের উপর। সঙ্গে কয়েকটা বাঁদর আর কুকুর। অদ্ভূত নাম তাদের, রাণী, যমুনা, লালু। কয়েকজনের সঙ্গে ড্রাম আর ক্ল্যরিওনেট। ওরা যাচ্ছিলো দূর কোনো গ্রামে তাদের সার্কাস দলের আগাম প্রচারণা চালাতে। দীনহীন, ক্ষুধার্ত কয়েকজন মানুষ ডেকের ওপর উবু হয়ে বসে একটা পাউরুটি সবাই ভাগ করে খাচ্ছিলো। তাকিয়ে ছিলো উদাস হয়ে নদীর দিকে। শীতের হাওয়া তাদের চুল এলোমেলো করে দিচ্ছিলো। তাদের পোশাক ছিলো বহু ব্যবহারে ম্লান আর ময়লা, ড্রাম বাদকের টুপি কয়েক জায়গায় ছেঁড়া ও তালি দেয়া। মাত্র একজনের পায়ে স্যান্ডেল ছিলো। খুব কথা বলতে ইচ্ছে করেছিলো ওদের সঙ্গে। লঞ্চের রান্নাঘরের ছেলেটিকে সবাইকে চা দিতে বলে কথার চিনেবাদাম ভেঙ্গেছিলাম দলের মানুষগুলোর সঙ্গে। যন্ত্রণায় বিক্ষত হওয়া জীবনের গল্প শুনেছিলাম সেদিন। মানুষ আর সার্কাস দেখতে আসে না। একটা শো করার মতো তাদের হাতে টাকা থাকে না। খাওয়ার যোগান দিতে পারে না বড় পশুদের। অসুস্থ হয়ে পশুগুলো মরে যায়। তাই সার্কাসের দলে মেয়েদের আনাগোনা বেশী। রাত বাড়লে এই মেয়েরা স্বল্পবসনা হয়ে নাচ দেখিয়ে দর্শক ধরে রাখার চেষ্টা করে।
বাড়ির লঞ্চঘাট চলে আসায় নেমে গিয়েছিলাম সেদিন। কিন্তু সেই ভাঙ্গাচোরা সেই মানুষগুলোর গল্প এতোকাল পরেও আমার পেছন ছাড়েনি। সার্কাসের দলের চরিত্র বদলে যাওয়ার প্রমাণ আমি পরেও পেয়েছি এই শহরে। সার্কাসের নামে দেখেছি প্রিন্সেসদের উন্মাতাল নাচ।এই মেয়েদের ব্যবহার করে এক শ্রেণীর বিত্তবান মানুষের কাছ থেকে টাকা আদায় করার কৌশলও শিখে নিয়েছিলো সার্কাসের এইসব দল। সেসব অবশ্য জীবনের অন্য গল্প।
মনে আছে বহু বছর আগে এরকম শীতকালে শহরে সার্কাসের দলের পোস্টার চোখে পড়তো। মারাত্নক সব খেলা দেখানোর প্রতিশ্রুতির কথা লেখা থাকতো সেই পোস্টারে। রিকশায় চড়ে মাইক নিয়েও লোক বের হতো সার্কাসের প্রচারণা চালাতে। এই শহরের বড় মাঠে, খালি জায়গায় ঘেরাটোপ তৈরী হতো সার্কাসের। সন্ধ্যায় সন্ধ্যায় আলো জ্বলে উঠতো, শূণ্যে চাবুক চালানোর শব্দ শোনা যেতো।এই শহর থেকে হারিযে গেলো সার্কাস। তার জাযগা দখল করে নিলো রাজনৈতিক সার্কাস। সেই সার্কাস দেখেই এখন দিন কাটে নাগরিকদের।

ইরাজ আহমেদ
ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com