এই শহরের মাতোয়ালারা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ইরাজ আহমেদ

একটা সময় ছিলো যখন এই শহরে প্রায় প্রতিটি গলির সঙ্গে মাতালদের গল্প জড়িয়ে থাকতো। এখন মনে হয় সেসব গল্প আর চরিত্রগুলো বেঁচে ছিলো অলৌকিক কোনো এক শহরে। সময়ের উল্টোপাল্টা হাওয়ায় তাদের জড়ানো গলার হাঁকডাক আর অম্লমধুর গল্পগুলো যেন হারিয়েই গেলো। বলা যায় ‘গন উইথ দা উইন্ড’।
তিনি আসতেন বেশ একটু রাতে টলতে টলতে। কত হবে, রাত এগারোটা, সাড়ে এগারোটা। প্রায় কুড়ি পঁচিশ বছর আগের কথা বলছি। তখন রাত বারোটা মানে এই ঢাকা শহর নিশুতি। ভদ্রলোক আমাদের গলির মোড় থেকেই চীৎকার করে নিজের স্ত্রীকে নাম ধরে ডাকতে থাকতেন। যে বাড়িতে বসবাস করতেন সেটা ছিলো আমাদের বাড়ির ঠিক উল্টোদিকে। ফলে প্রায় প্রতিরাতেই এই ডাকাডাকির পালা শুনতে হতো। গলির বাকী বাসিন্দারা অবশ্য ততদিনে এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলো। ফলে কোনো অন্ধকার বাড়ির জানালায় আলো জ্বলে উঠতে দেখা যেতো না।   ভদ্রলোক বাড়িতে ঢুকেই স্ত্রীকে বকতে শুরু করতেন। নানা ধরণের অভিযোগ ছিলো তার। তারমধ্যে প্রথম অভিযোগই ছিলো রান্না ভালো হয় নি। একটু পরেই থালাবাটি ছোঁড়ার আওয়াজ শুনতে পেতাম। তবে ভাগ্যিস সেগুলো ছিলো কাসার তৈরী। যেদিন এ ধরণের কোনো হাঁকডাক আর থালা ছোঁড়ার আওয়াজ শোনা যেতো না আমার মনে হতো নিশ্চয়ই ভদ্রলোকের শরীর খারাপ। রাতেরবেলা এরকম রুদ্ররূপ যিনি ধারণ করতেন দিনের আলোয় কিন্তু তিনি ছিলেন চমৎকার দিলদরাজ এক ভালো মানুষ। আমাদের পাড়ার ফুটবল ক্লাবে দরাজ হাতে চাঁদা দিতেন, গলির মোড়ে আড্ডা দিতে দেখলে ধমক দিতেন। রাতের সেই মানুষের সঙ্গে দিনের ভদ্রলোকের কোনো মিলই থাকতো না।তবে রাতেরবেলা ওনার হট্টগোলের মাঝে একমাত্র বেরসিক প্রাণীটি ছিলো আমার পোষা কুকুরটি। রাতে সে পাড়া ঘুরে চোর পাহারা দিতো। তখন ওনার হৈচৈ শুনে সে ঘাবড়ে গিয়ে ডাকতে শুরু করতো আরো জোরে। তাতে ভদ্রলোক মহা বিরক্ত হতেন।তবে দিনের বেলা কিন্তু ওই কুকুরটাকেই তিনি পাওরুটি খাওয়াতেন বাসার বারান্দায় বসে। ওনার সেই নৈশ উত্তেজনার কোনো কারণ কোনোদিন বুঝতে পারিনি। তবে বন্ধুদের আড্ডায় প্রায় প্রতিদিনই ওনার সেই নৈশকালীন মহড়া ছিলো প্রধান আলোচনার বিষয়।
আরেকজনও আসতেন এরকম রাত করে। তখন চমৎকার পারফিউমের ঘ্রাণ ঝরে পড়তো তার শরীর থেকে।সঙ্গে মদের ঘ্রাণ। তিনি অবশ্য ফিরতেন আরেকটু আগে। তখনও আমাদের গলির মোড়ের নৈশ আড্ডা ভাঙ্গতো না।অপেক্ষাকৃত তরুণ সেই ভদ্রলোক তখন দাঁড়িয়ে যেতেন আমাদের সঙ্গে আড্ডা দিতে। মাঝে মাঝে দামী সিগারেট খাওয়াতেন। তারই ফাঁকে বাড়ির দরজায় বেল বাজাতেন তিনি। তখন খুব অদ্ভূতভাবে দোতলা বাড়ির বারান্দা থেকে উড়ে আসতো বাইরের দরজা থোলার চাবি। মজাটা ঘটতো সেখানেই। ওই দামী সিগারেট হতো আমাদের ঘুষ। বিনিময়ে ওই চাবি খুঁজে দিতে হতো আমাদের। উনি কোনোদিন ঠিকভাবে চাবিটা খুঁজে পেতেন না। পাওয়ার মতো অবস্থায়ও তিনি থাকতেন না। মাঝে মাঝে ওনার চাবি খোঁজার জন্য আমরা একটু বেশী রাত পর্য্ন্ত আড্ডা চালিয়ে যেতাম।দামী সিগারেট ঘুষ পাওয়ার লোভ তো থাকতোই সঙ্গে।
আরেকজন মানুষকে চিনতাম মোড়ের মাথায় রাত দুপুরে মদ খেয়ে ঘরে ফিরতেন। তবে তার যে ঘর কোথায় ছিলো আমি জানি না আজো। গলা পর্য্ন্ত মদ্যপান করে তিনি রাস্তার কুকুরদের নান রুটি খাওয়াতেন হোটেল থেকে কিনে।ফুটপাতে বসে থাকতেন উনি আর সামনে একপাল বেওয়ারিশ কুকুর। কুকুরদের খাওয়ানো শেষ হলে উনি মাঝে মাঝে চড়াও হতেন আমাদের ওপর। তার প্রধান প্রশ্ন হতো আমরা এতো রাতে বাসায় না গিয়ে রাস্তায় কী করি? কখনো আমাদের মারধোর করার জন্য বাঁশ নিয়ে ধাওয়াও করতেন।
তারপর কি করতেন? একা একা গান গাইতে গাইতে গলি দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ঘরের দিকে রওনা হতেন। তবে তার ঘর আমি কোনোদিন চিনতে পারিনি। কোথায় যে থাকতেন সেই মানুষটা কোনোদিন আর জানতে পারবো না।
এরা সব এই শহরেরই চরিত্র হয়ে ছিলো তখন। শহরের নানা তালের গলি, পাড়ায় এই চরিত্ররা মিশে ছিলো। তাদের কান্না ছিলো, আনন্দ ছিলো সংসার হারানোর বেদনা ছিলো। যেরকম ছিলো পাড়ার সেই সাদা বাড়িটার দারোয়ান। সন্ধ্যাবেলা প্রতিদিন সাইকেলে চড়ে চলে যেতেন অজ্ঞাত গন্তব্যে। তারপর রাতে খোলা গলায় গান গাইতে গাইতে ফিরে আসা, সঙ্গে গান…যত ভাবি ভুলে যাবো মন মানে না।ভীষণ মাতাল সেই মানুষটা মুখ ভরে পান খেতেন। জর্দা দেয়া পানের সুঘ্রাণ, দেশী মদের ঘ্রাণ আর গানের সুর মিশে একাকার হয়ে যেতো রাত্রির বাতাসে।কাকে ভুলতে চাইতেন তিনি?ভুলতে পেরেছিলেন কি? কত প্রশ্নের উত্তরই তো অমীমাংসিত রয়ে গেলো সেই হারানো শহরের গল্পে।

ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com