এই শহরের মন…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ইরাজ আহমেদ

একটা শহর কতকিছু ভুলে যায়। ভুলে যায় গলি, দেয়াল, মানুষের সম্ভাষণ, বাগান, জলের ঝরোকা,দরজায় লেখা ‘কুকুর হইতে সাবধান’, হয়তো অরো অনেককিছু। তাহলে কী শহরের মন আছে? কংক্রিটের বেষ্টনী, কালো পিচে মোড়া পথ, আকাশ স্পর্শ করার স্বপ্ন নিয়ে ওপরে উঠতে থাকা বিশাল ইমারতের প্রাণহীন অস্তিত্বে কি তাহলে আমাদের মতো করে ভাবতে পারে, ভুলে যায়? অবান্তর প্রশ্ন। শহরের মন থাকবে কিভাবে? মন তো থাকে শহরে যে মানুষগুলো দিবারাত্রি অতিক্রম করে তাদের। সেই মনের মধ্যে ঘটেছে পালাবদল অহরহ, হেমন্তের অরণ্যের মতো স্মৃতির ভেতরে ঝরে যায় অসংখ্য পত্রালি।তাদের অন্যমনষ্ক মনের প্রান্তরে কত মানচিত্রের প্রান্ত বদল ঘটে তারা নিজেরাও হয়তো অনুভব করতে পারে না।  
লিখতে বসে মনে হলো এক সময়ে এই শহরের অনেক পাড়ায় বাড়ির দরজায় লেখা থাকতো ছোট্ট সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি ‘কুকুর হইতে সাবধান। ছোটবেলায় এই বাড়িগুলোকে এড়িয়ে চলতাম। ফুটবল ক্লাবের চাঁদার জন্যও এসব বাড়ির দরজা ঠেলে ঢুকতাম না। একবার এরকম বিজ্ঞপ্তি লেখা এক বাড়িতে ঢুকে রাজহাঁসের কামড় খেয়েছিলাম। কুকুরের বদলে একপাল বিশাল আকৃতির হাঁস তাড়া করেছিলো আমাকে।পাড়ার ফুটবল ক্লাবের জন্য চাঁদা চাইতে গিয়েই ঘটেছিল সেই বিপত্তি। এখন যখন সেই পাড়ায় যাই দেখি গাছপালা ঘেরা, মাঠ লাগোয়া বাড়িটাই উধাও হয়ে গেছে। সেখানে দৈত্যের মতো দাঁড়িয়ে আছে এক সুরম্য অট্টালিকা।কুকুর হইতে সাবধান কথাটার জায়গা দখল করেছে ‘এই বাড়িটি সার্বক্ষণিক সিসি টিভির আওতায় রহিয়াছে।প্রযুক্তি দখল করেছে পুরনো সময়কে।
স্বাধীনতা যুদ্ধের পর আমরা যে পাড়ায় থাকতাম তার কাছেই আরেকটি এলাকা-শান্তিনগর। সেখানে একটা গলির শেষ মাথায় মস্ত বড় এক পুকুর আলো করে ফুটে থাকতো পদ্মফুল। সেই পুকুরের পাড় ঘেঁষে কয়েকটি নির্জন বাড়ি। আমরা বন্ধুরা দল বেঁধে পুকুরভর্তি সেই পদ্মফুল দেখতে যেতাম। বৃষ্টির মধ্যে পদ্মফুলের শোভা ছিল দেখার মতো ব্যাপার। এলাকার মানুষ ওই গলির নাম দিয়েছিল পদ্মপুকুরের গলি। কালের পরিক্রমায় এক সময়ে সেই গলির পদ্মপুকুর মাটি দিয়ে ভরাট হয়ে গেল। মুছে গেল পদ্মফুল। এক পীর সাহেবের আস্তানা তৈরী হলো গলিতে। নাম পাল্টে পদ্মপুকুরের গলি হয়ে গেল পীর সাহেবের গলি।
লেখার শুরুতে ঝরোকা বা ঝর্ণা অথবা ফোয়ারার কথা লিখেছিলাম। এই শহরে একদা শাহবাগের মোড়ের ঠিক মাঝখানে বিশাল এক ফোয়ারা ছিল। পশ্চিম বাংলার কবি বিষ্ঞু দে‘র একটি কাব্যগ্রন্থের নাম ছিল ‘জল দাও আমার শেকড়ে’। বড় হয়ে লেখালেখির পৃথিবীতে ঢোকার পর ফোয়ারাটাকে দেখলে আমার সেই বইটার কথা মনে পড়তো। মনে হতো ফোয়ারাটা যেন শহরের কঠিন শেকড়ে পাঠাচ্ছে সামান্য শুশ্রুষা। এটি তৈরী হয়েছিল দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে। আমরা রিকশা ভাড়া করতে বলতাম শাহবাগ ফোয়ারার মোড়। গোল ফোয়ারার ওপর সিমেন্টের গাঁথুনিতে তৈরী করা ছিল ইংরেজি ডব্লিউ অক্ষরের মতো কতগুলো পিলার। বর্ষাকালে আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি নামলে ফোয়ারার জলাধার উপচে পড়তো। ছোটবেলায় কখনো নিউমার্কেটে যাবার সুযোগ ঘটলে ওই ফোয়ারার সামনে দিয়েই যেতে হতো। চৈত্রের উত্তপ্ত বিকেলগুলোতে খুলে দেয়া হতো ফোয়ারা। অসংখ্য পাইপের ছিদ্রপথে ঝলমল করতে করতে উপরে লাফিয়ে উঠতো জলের ধারা। কখনো অনিশ্চিত হাওয়ায় সেই জলধারার ক্ষুদ্র কণাগুলো উড়ে এসে শরীরে লাগতো। অপেক্ষায় থাকতাম কখন ঘটনাটা ঘটবে। এক অদ্ভূত ভালো লাগার অনুভূতিতে মন ছেয়ে থাকতো। এই তো কয়েক বছর আগে সেই ফোয়ারা লোপাট হয়ে গেলো ঢাকা শহরের বুক থেকে। ভেঙ্গে ফেলা হলো অনেকটা  নগরপিতার বাড়ি থেকে ঘোষণা এলো, বাড়তি যানবাহন আর মানুষের চাপ ধারণ করতেই এই ব্যবস্থা। ফোয়ারাহীন খটখটে শাহাবাগ এখন জেগে থাকে জলহীন, উৎক্ষিপ্ত।
শহরের মন বদলে যায়, কাঠামো বদলে যায়। পড়ে থাকে কেবল কিছু স্মৃতি।এক সময়ে আমাদের সাপ্তাহিক ছুটির দিন ছিলো রোববার।আমার কৈশোরে রোববার কলকাতার আকাশবাণী ও বাংলাদেশ বেতার থেকে দুপুরবেলা সাপ্তাহিক নাটক প্রচারিত হতো। দুপুরবেলা আমাদের বাড়িতে দুপুরের খাবার খাওয়ার সময় মা রেডিও এনে রাখতেন টেবিলে। নাটক শুনতে শুনতে চলতো মধ্যাহ্নের আহার পর্ব। সব নাটকের গল্প মনে নেই, মনে রাখা সম্ভবও নয়। কিন্তু মনের মধ্যে রয়ে গেছে ভালোলাগার সেই অনুভূতি। সেইসব ছুটির দুপুরে বাংলাদেশ বেতারের নাটক প্রচারিত হতো আরেকটু পড়ে। বিছানায় শুয়ে আমাদের বাড়ির ফিলিপস কোম্পানীর সেই পুরনো রেডিওর কাঁটা ঘুরিয়ে বসে থাকতাম কখন নাটক শুনতে পাবো। রোববার দুপুরের সেই শহর আর কোনদিন ফিরবে না।
এবার প্রেমপত্র দিয়ে লেখার খাতা বন্ধ করি। একদা এই শহরে পাড়ায় পাড়ায় প্রেমের চিঠি বয়ে নিয়ে যাবার একটা চল ছিল। এরকম চিঠি লিখতো পাড়ার বয়সে বড় যুবকরা, নির্দিষ্ট লক্ষ্যে বহন করে নিয়ে যেত কিশোররা। আমিও সেরকম চিঠি বহনকারীদের একজন ছিলাম। কত কী যে কান্ড ঘটেছিল সেইসব চিঠি বিলি নিয়ে তা লিখতে বসলে আলাদা বই হয়ে যাবে। মোবাইল, এসএমএস আর এমএমএস এর জালে আটকে পড়া শহরের এই মন তো তখন এরকম ছিলো না। আমাদের সেই হারানো শহরের প্রেমও ছিল বড় দূর্বল, বুক ধুকপুক করা। দুপুরের রোদ ভেঙ্গে পাড়াতো ভাইয়ের চিঠি নিয়ে চলেছি। হয় নির্দিষ্ট বড় আপার বাড়ির দরজার তলা দিয়ে অথবা তাদের ছাদের কোন একটা পাইপের আড়ালে চিঠি রেখে আসতে হবে। এখানে বলে রাখি তখন আমাদের পাড়ায় বহু বাড়ির ছাদের দরজা খোলায় থাকতো। আমরা যখন তখন উঠে যেতে পারতাম। এই চিঠি চালাচালির বদলে পুরস্কার হিসেবে পেতাম একটা সিগারেট অথবা বিকেলে পাড়ার মোড়ে ‘হক ব্রেড অ্যান্ড বেকারি’র একটা গরম প্যাটিস।মাঝে মাঝে সেইসব অনবদ্য নীল খাম খুলে পড়ে ফেলতাম চিঠি। জেনে ফেলতাম দুজন মানুষের গোপন প্রেমের আবেগ। এখন এসব আবেগ, আবেগের চাইতে আরো বড় অনেককিছু সেকেন্ডের ভগ্নাংশের চাইতেও কম সময়ে মোবাইলের স্ক্রিন আলো করে পৌঁছে যায় প্রেমিক অথবা প্রেমিকার কাছে। সেই দুপুর, হট প্যাটিস আর একটা সিগারেটের কোন প্রয়োজনই পড়ে না।
শহরের মন সময়ের তাড়ায় পালাতে থাকে। পালিয়ে গিয়ে আর ফিরে আসে না।

ইরাজ আহমেদ
ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com