এই শহরের বইওয়ালা…

  •  
  •  
  •  
  •  
  • 0
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ইরাজ আহমেদ

বইওয়ালা। অদ্ভূত এক চরিত্র। দইওয়ালা, মিষ্টিওয়ালা, দুধওয়ালার মতো বইওয়ালা। মাথায় করে গামছায় বেঁধে বই নিয়ে আসতো। প্রায় বছর চল্লিশ আগে এই শহরের নির্জনতম এক পাড়ার দুপুরের নিঃসঙ্গ হাওয়ায় শোনা যেতো তার হাঁক-এই নিবেন ফাল্গুনী, নিমাই, নীহার আশুতোষ।বিভিন্ন বাড়িতে মহিলা মহলে সেই বই বিক্রেতার ছিলো ভীষণ জনপ্রিয়তা।তখন এই শহরে বেশীরভাগ একতলা বাড়ির সামনে চিলতে বারান্দা থাকতো। সেখানেই পশরা খুলে বসতো বইওয়ালা। নিমাই ভট্টাচার্য্, নীহারঞ্জন গুপ্ত আর আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের নাম তখনই পরিচিত হয়ে ওঠে আমার কাছে। ভারতীয় বই সেই পাকিস্তান আমলে আমদানীর অনুমতি ছিলো না। সেই বইগুলো এই শহরেরই কোনো প্রেসে পুনঃমুদ্রণ হতো। কখনো বইতে লেখা থাকতো ঝিনুক প্রকাশনালয়।নিচু মানের লালচে নিউজপ্রিন্টে ছাপা পেপারব্যাক ধরণের বইগুলো হতো লাবণ্যহীন। অনেক সময় বই ভাঁজ করলে পৃষ্ঠা খুলে যেতো খারাপ বাঁধাইয়ের জন্য। বইয়ের প্রচ্ছদও ছিলো সেই পরিমাণে বর্ণহীন। অনেক সময় বোঝাই যেতো না আসলে প্রচ্ছদে কেমন রঙ ব্যবহার করা হয়েছে, আঁকা হয়েছে কিসের ছবি!আমার সেসব বই পড়ার কোনো অনুমতি ছিলো না। সেগুলো বড়দের পাঠ্যসূচী হয়ে থাকতো একান্তভাবেই।ওই বইওয়ালার কাছেই প্রথম আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের বই ‘রূপের হাটে বিকিকিনি’ বইটা দেখি।আজো মনে আছে বইটির সেই বিবর্ণ প্রচ্ছদের কথা। শুধু নামটাই ভালো করে পড়তে পেরেছিলাম। পরে অবশ্য এই লেখকের আরো বই দেখি বইওয়ালার গামছার পুটলিতে- কাল তুমি আলেয়া, আবার আমি আসবো, বলাকার মন আরো কত নাম…। এই বই দেখতে দেখতে আলোচিত, জনপ্রিয় লেখক নিমাই ভট্টাচারযের ‘মেমসাহেব’ বইয়ের নাম জানি। জেনে ফেলি নীহারঞ্জন গুপ্তের গোয়েন্দা কিরীটি রায়ের কথা।

দুপুরবেলা সেই বইওয়ালাকে খুব ক্লান্ত দেখাতো।আমার স্মৃতি প্রতারণা না করলে সেই বই বিক্রেতা মানুষটির নাম ছিলো ফারুক।আমার দাদু বই কিনতে কিনতে কথা বলতেন তার সঙ্গে। আমাদের বাসার বারান্দায় বসে গামছার পুটলি খুলে সে কখনো বিশ্রাম নিতো। খুব সামান্য মূল্য ছিলো সেইসব বইয়ের। যতদূর মনে পড়ে এক টাকা, আট আনা এরকম কিছু হবে। এই বই বিক্রি করে তার লাভের খাতা কতটা ভারি হতো সেটাও জানা হয়নি তখন। জানা হয়নি, সেই মানুষটার দুপুরে কিছু খাওয়া হতো কি না, বাড়িতে তার কে কে আছে? কিন্তু নিয়ম করে সেই বিক্রেতা পাড়ায় পাড়ায় ঘুরতো ।পাঠকদের কাছে পৌঁছে দিতো বই।

এই শহরে তখন এতো হট্টোগোল ছিলো না। মানুষ এতো উচ্চকন্ঠে কথা বলতো না, মোটরগাড়ির হর্ন বাজতো না । তখন শোনা যেতো বইওয়ালার ডাক। এরকম বই বিক্রেতার দেখা মিলতো রেলস্টেশন আর লঞ্চঘাটেও। লেখকদের নাম ধরে ডেকে ডেকে তারা বই বিক্রি করতো। এই শহরে মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত পাড়ায় এসব বই আর বইওয়ালাদের কদর ছিলো বেশী। মাঝে মাঝে অবাক হয়ে ভাবি সেই বই পড়ুয়া মানুষ আর বইওয়ালারা হারিয়ে গেলো এই শহর থেকে।

ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com