এই শহরের ধোপা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ইরাজ আহমেদ

ধোপা শব্দটার ব্যবহার উঠেই গেলো। এই শহরে ড্রাই ক্লিনিং, ওয়াশ অথবা ধোলাইয়ের আরো সব শক্ত ইংরেজি নামের আড়ালে চাপা পড়ে গেলো ধোপা। চাপা পড়লো মাঠের পাশে ধোপার বাড়ি। এমন দাবি করছি না ধোপার গাধা দেখেছি। খুব গোবেচারা মুখে যে গাধা ধোপার সঙ্গে আসতো পাড়ায় পাড়ায় ময়লা কাপড় নিতে। উত্তরকালে এই গাধার বদলে ধোপাকে দেখেছি কাপড় সংগহের জন্য বাঁধা কাস্টমারদের বাড়িতে আসতে। তার কাঁধে ঝুলছে বড় গাটরি অথবা গাট্টি। দেখেছি নির্জন পাড়ার ভেতরে আরো নির্জন, ছোট্ট্ লন্ড্রি। সেসবের পাট কবে উঠে গেছে এই শহর থেকে। এখন লন্ড্রি মানে ঝকঝকে আলো, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ, নিয়ন সাইনের বর্ণালী হাতছানি আর কত প্রক্রিয়ায় কাপড় ধোয়ার কৌশল।
আমাদের সিদ্ধেশ্বরী পাড়ায় ছোট্ট একটা লন্ড্রি ছিলো। নামটা এখন আর মনে করতে পারবো না। আমারই এক বন্ধুর পারিবারিক ব্যবসা। গলির পেটের ভেতরে সেই লন্ড্রি ছিলো আমাদের আড্ডার আশ্রয়স্থল। বৃষ্টির দিনে ছাতা মাথায় চলে যাওয়া যেতো সেই লন্ড্রিতে। বাড়ির কাপড় ইস্ত্রিতে দিয়ে সেখানে বসেই বন্ধুর সঙ্গে আড্ডা চলতো ঘন্টার পর ঘন্টা। বন্ধুটি স্কুলের লম্বা বন্ধের সময় লন্ড্রিতে ইস্ত্রি করতো। সেই কয়লার ইস্ত্রি, হালকা ধোয়া আর কাপড়ের ঘ্রাণ মিলেমিশে লন্ড্রিতে ভেসে থাকতো অদ্ভূত এক সুগন্ধী হাওয়া। বই থেকে শুরু করে ক্লাবের ফুটবল, পাম্পার, শীতকালে ব্যাডমিন্টান র্যাকেট, নেট, ক্রিকেট ব্যাট-কতকিছু যে সেই লন্ড্রিতে গচ্ছিত থাকতো তার ইয়ত্তা নেই।কোন কোন বর্ষাক্লান্ত দুপুরে ওই লন্ড্রিতে বসে বইও পড়তাম।আমাদের সেই পাড়ার শীর্ণ গলি বেয়ে ঘন্টি বাজিয়ে রিকশা যেতো। আজো সেই টুং টাং শব্দ কান পাতলে শুনতে পাই।
তবে ধোপাওয়ালার সঙ্গে আমার দেখা এরও অনেক আগে। তখন বাংলাদেশ স্বাধীন হয়নি।থাকতাম ঢাকা শহরের নয়া পল্টন এলাকায়। একটা বেশ বড় মাঠের চারপাশে অনেকগুলো বাড়ি। সেখানেই প্রথম দেখা পাই ধোপাওয়ালার। সেই কাঁধে ঝোলা ঝুলিয়ে এক লোক আসতো বাড়ি বাড়ি ঘুরে কাপড় নিতে। এখন আর মনেও পড়ে না। কাপড়ের হিসাব, কোনটা কোন বাড়ির কাপড় এসব তথ্য সে মনে রাখতো কীভাবে? তখনও লন্ড্রির স্লিপ ব্যাপারটা প্রচলিত হয়নি ধোপাওয়ালাদের কাছে। তবে ওই সময়ে শহরে দু একটি বড় ধরণের লন্ড্রি ছিলো। বেশ বনেদীই বলা চলে। সেগুলোর মধ্যে খুব নামকরা ছিলো ‘রমনা লন্ড্রি’ আর ‘পিনম্যান ডি প্যারিস’। রমনা লন্ড্রির পাট এই শহর থেকে কবে উঠে গেছে কে জানে? তবে পিনম্যান ডি প্যারিস লন্ড্রিটা এই কিছুকাল আগেও দেখেছি তোপখানা রোডে।তারপর একদিন হঠাৎ চমকে উঠে দেখলাম লন্ড্রিটা উধাও। এই শহরে এখন অবশ্য বিভিন্ন পুরনো স্থাপনা আচমকা উধাও হওয়ার প্রক্রিয়া খুব জোরেশোরেই চলছে।বদলে যাচ্ছে এই শহরের চেনা মা্নচিত্র।
ফিরে যাই সেই ধোপাওয়ালার প্রসঙ্গে। মানুষটা সপ্তাহে একবার এসে কাপড় গুনে নিয়ে যেতো। আবার ধুয়ে, ইস্ত্রি করে বাড়ি বাড়ি দিয়ে যেতো।ইস্ত্রি করা কাপড় খবরের কাগজের পৃষ্ঠা দিয়ে মুড়ে দেয়া হতো। পুরনো পল্টন অথবা ফকিরেরপুলের খালের কাছে ছিলো সেই ধোপাওয়ালার কাজের জায়গা। খালের পানিতে কাপড় ধুয়ে পাশে সারি দেয়া তারে ঝুলিয়ে দেয়া হতো। খোলা জায়গায় বসানো থাকতো বিশাল মাটির গামলা। সেখানে কাপড় ধোওয়া হতো। শহরের আরো অনেক এলাকায় এরকম ধোপাওয়ালাদের কাপড় শুকাতে দেয়ার দৃশ্য তখন দেখা যেতো।কোনো কোনো মফঃস্বল শহরে আজো ধোপাওয়ালার বাড়ির দেখা মেলে।
এই শহরের ধনাঢ্য মানুষেরা অবশ্য তখনকার হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল ও পূর্বাণীর লন্ড্রিতেই কাপড় ধোয়াতে বেশী অভ্যস্ত ছিলো। বহুকাল আগে শহরের অভিজাত এলাকা গুলশানে চীনা নাগরিকরা লন্ড্রির ব্যবসা করতে এসেছিলো। ছিলো গাওছিয়া এলাকায় লি ফা লন্ড্রি। শুনি তারাও ব্যবসা গুটিয়ে ফিরে গেছে স্বদেশে।

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com