এই যে আমার স্কুল…

  •  
  •  
  •  
  •  
  • 0
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

রিনি বিশ্বাস

এইটুকু টুকু দুটো হাত, সরু সরু হাতের আঙুল, মাথাভর্তি চুল আর কুতকুতে চোখের একটা পুতুল রিনুর মায়ের কোলে… গায়ের চামড়া কেমন যেন ওঠা ওঠা…. সেই প্রথমবার রিনু গেল কোন হাসপাতালে.. ‘মায়ের ভাই’ হল যে….!! ‘মায়ের ভাই’ যে নয়, এ যে রিনুরই ভাই-সেটা রিনু বুঝলো আরো ক’দিন পরে… একরাত্তিরে ঘুম ঘুম চোখে রিনু দেখলো মা-বাবাই কোথায় যেন গেল..! কার সঙ্গে রিনু থাকলো বাকি রাত্তিরটুকু সেটা আর মনে আসেনা; পরদিন মামাবাড়িতে চলে গেল রিনু; বাড়ি ফিরলো বেশ কয়েকদিন পরে… এই কটাদিন আর স্কুলে যাওয়া হলনা.. মা যে বাড়িতে নেই! রিনু শুনেছে মা এখন হাসপাতালে.. রিনু তাই মামাবাড়িতে থাকে! মামাবাড়ি থেকেই এক রবিবার – রিনু প্রথমবার গেল ‘রামকৃষ্ণ মিশন সেবা প্রতিষ্ঠানে’; যেখানে রিনু অবাক চোখে প্রথম দেখলো ক’দিনের এইটুকু তার ভাইকে… মামাবাড়ি থেকে ফেরার পরেরদিন সকালে (না দুপুর?) – রিনুদের রাস্তার দিকের টানা বারান্দায় দাঁড়িয়ে -রিনু অবাক হয়ে দেখলো ঠাকুমার কোলে সেই পুতুল, কাপড় দিয়ে মোড়ানো। ঠাকুমা তাকে কোলে নিয়ে হেঁটে আসছে সামনে সামনে আর পিছনে রিনুর মা-বাবাই; সেদিন থেকে রিনুর ভারি আনন্দ। সে কি করবে বুঝে উঠতে পারেনা! এরই মধ্যে বাবাইয়ের সঙ্গে একদিন স্কুলে গেল রিনু; আন্টিরা যখন জিগ্যেস করলো কেন সে কয়েকদিন আসেনি, রিনুর উত্তর ছিল ‘মায়ের ভাই হল যে’ … সক্কলে হেসে কুটিপাটি! শুধু রিনুই বোঝেনা ভুলটা সে কি বললো! আন্টিই তাকে বুঝিয়ে বললেন ‘ও তো তোমারই ভাই’… রিনুর মনে এখন সবসময়ই আনন্দ! মা অফিস যায়না; সারাদিন বাড়িতেই থাকে… যদিও কুট্টি ভাইকে নিয়ে মা একটু ব্যস্ত থাকে সারাদিন.. তা হোক… বাড়িতে থাকে তো, তাতেই রিনু মহাখুশি! মায়ের পাশে পাশে রিনু ঘুরঘুর করে, মাকে কখনও ভাইয়ের জামা, কখনও কাঁথা, কখনও বা এটাসেটা এগিয়ে দিতে চেষ্টা করে… যারাই ভাইকে দেখতে আসে-বলে যায় রিনুর এখন দায়িত্ব বেড়েছে, সে এখন দিদি! সে চেষ্টা করে ভাইয়ের কাছাকাছি থাকতে… মনে মনে ভাবে, কবে মা একবার ভাইকে কোলে নিতে দেবে! কিন্তু রিনুও তো তখন এইটুকুই..তার উপর ভরসা করে উঠতে পারেনা মা! রিনু কিভাবে বড় হবে সেই কথাই ভাবতে থাকে! বড় বোধহয় সে হয়েও যায়, কারণ একদিন মা তাকে কোল পেতে বসতে বলে, তারপর তার ছোট্ট কোলে শুইয়ে দেয় তার এইটুকু ভাইকে… ভাই খুব ভালো.. শুধু দুধ খায় আর ঘুমোয়; রিনু ডাকলে, পিটপিট করে তাকায়! অল্প হাসতেও পারে মনে হয়! একটা মজার খেলাও চলে ভাইয়ের! কারুর কোলে উঠেই তাকে ভিজিয়ে দেয় ভাই! কাঁথার নীচে প্লাস্টিক দিয়ে তবে ভাইকে কোলে নেয় সবাই! রিনুর চোখের সামনে একটা জ্যান্ত পুতুল রোজ নড়াচড়া করে, হাত পা ছোঁড়ে, হাসে-কাঁদে, খায়-ঘুমোয় আর একটু একটু করে বড় হয়।

এর মধ্যে একদিন নতুন স্কুলে ভর্তি হবার ফর্ম আনতে মা-সোনাকাকা আর ভাইয়ের সঙ্গে রিনু যায় বিশা-ল মাঠওয়ালা একটা স্কুলে.. ক-ত বড় বড় মাঠ! ক-ত ক-ত গাছ.. কত সবুজ… মা বলে মা-ও নাকি এই স্কুলেই পড়তো! প্রথম দেখাতেই স্কুলটাকে রিনুর ভারি ভালো লেগে যায়… সেদিন বিকেল গড়িয়ে যাবার ফাঁকে সোনাকাকা আর রিনু ভাইয়ের কান্না থামানোর প্রাণপণ চেষ্টা করতে থাকে; তার মা তখন স্কুলের ভিতরে গেছে ফর্ম আনতে আর জেনে আসতে ভর্তির পরীক্ষার নিয়মকানুন! বাবাই তো তখন সেই কোন কাঁকিনাড়া ব্রাঞ্চে পোস্টেড! ছুটি পায়নি, অগত্যা সোনাকাকা এসেছে সঙ্গে; কিন্তু ভাই তো মা ছাড়া কারুর কাছে যায়না, অন্য কেউ কোলে নিলেই তারস্বরে কাঁদে.. সেদিনও সে কেঁদেই চলে… সেই বিকেলের কথা মনে এলেই আজও রিনুর হঠাৎ মনকেমন করে; শেষ হয়ে আসা সেই বিকেলটুকুর জন্য, বাবাইয়ের জন্য, মায়ের জন্য আর ভাইয়ের জন্যও…. মনকেমনের শুরু বোধহয় সেইদিনই… এই জায়গার সঙ্গে যে তার মনকেমনের সম্পর্ক হবে তা তো রিনু তখনও জানেনা… রিনু তখনও তো জানেনা এরপরের বারোটা বছর সে এখানেই আসবে… এটাই হবে তার খুব খুব নিজের জায়গা… যাকে ছেড়ে যেতে তার বুক চিনচিন করবে…মনকেমন জাপটে ধরবে… আজীবন এর পাশের রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে সে পাশেরজনকে দেখাবে, ‘এই যে আমার স্কুল’ , আর গলার কাছে জমাট বাঁধা কষ্ট পাছে কেউ দেখে ফেলে-তাই অকারণে হেসে উঠবে….

ছবি: সৌজন্যে লেখক

পড়ুন
ছোটবেলা আসলে নরম একটা মনকেমন
ছবিগুলোতে লেগে থাকা আদরগুলো কেমন আজীবন ঘিরে রাখে
পাওয়া, না-পাওয়া নিয়ে মাথাব্যথা ছিলনা রিনুর

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com