ঋত্বিক ঘটক প্রবীর মিত্রকে হাঁটতে বললেন…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

প্রযোজক হাবিবুর রহমান খান

ঋত্বিক ঘটক ছিলেন পানাসক্ত। ইংরেজিতে যাকে বলে অ্যালকোহলিক। চিকিৎসকদের নিষেধাজ্ঞা তিনি পরোয়াই করতেন না। ঢাকায় ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ সিনেমার শ্যুটিং করতে আসার আগেও উনার চিকিৎসা চলছিলো। আগেই বলেছি, এখানে আসার পর তিনি থাকতেন ঢাকেশ্বরী কটন মিলের রেস্টহাউজে।

‘তিতাস একটি নদীর নাম’ সিনেমার একটি দৃশ্য

সেখানেই কাজের ফাঁকে ফাঁকে চলতো তাঁর পান পর্ব। তখন আমি ওনার অ্যালকোহল গ্রহণের পরিমাণ বেধে দিয়েছিলাম। ঠিক হলো উনি দুপুরে পান করবেন তিন পেগ আর সন্ধ্যায় ছয় পেগ। আমি ওনার শরীরের স্বার্থেই প্রতি পেগে অ্যালকোহল কম দিতাম। পরিমাণটা ছিলো দেড় পেগ অ্যালকোহলের সঙ্গে দেড় পেগ পানি মিশিয়ে দিতাম। উনি সেটা টের পেতেন না। সেই গ্লাসে তিনি আরো পানি মিশিয়ে পান করতেন। ফলে অ্যালকোহলের প্রভাব ততোটা তীব্র হতো না। এটা ছিলো তার চিকিৎসার অংশ।
বাংলাদেশে এসে স্ক্রিপ্টের কাজ চূড়ান্ত হলে শুরু হয় কাস্টিং পর্ব। অভিনেতা-অভিনেত্রী নির্বাচন।

‘তিতাস একটি নদীর নাম’ সিনেমার একটি দৃশ্য

এ কাজে অবশ্য ঋত্বিক বাবুকে আমার ওপর নির্ভর করতে হয়েছিল। কারণ তিনি তো এখানকার অভিনয় কলাকুশলীদের কারো সঙ্গেই পরিচিত ছিলেন না। ছবিতে প্রধান দুই নারী চরিত্র হিসেবে কাজ করেছেন কবরী ও রোজী সামাদ।আমি আগেই তাদের দুজনের কিছু স্টিল ছবি তাঁকে দেখিয়েছিলাম। এরপর একদিন আমরা দুজন গেলাম কবরীর সঙ্গে দেখা করতে। তিনি তখন থাকতেন ঢাকার দিলু রোডে। সেখানেই সিনেমা, চরিত্র নিয়ে আলোচনা করে চূড়ান্ত হলো কবরী অভিনয় করবেন এই সিনেমায়।রোজি সামাদ তখন থাকতেন গ্রীণ রোডে।আমি ঋত্বিক ঘটককে নিয়ে চলে যাই রোজী সামাদের বাসায়। সেখানে বসে তার কাস্টিংও চূড়ান্ত হয়।
ঋত্বিক ঘটক কথা বলতেন খুব সোজাসাপ্টা ভঙ্গীতে। সিনেমায় তার ক্যামেরাও একই পথ ধরে চলতো। মানুষটিকে আমার এজন্য খুব ভালো লাগতো। তাঁর মধ্যে ভড়ং বলে কোনো বিষয় ছিলো না। একটি সিনেমায় তার চরিত্রের সংলাপ ছিলো, ‘কইলক্কাতা যাবি? কইলক্কাতায় বীভৎস মজা।’
এই যে ছোট্ট্ দুটি বাক্য বীভৎস মজা ব্যবহার করে শহরকে চিত্রিত করে দেয়া সেটা আমার কাছে অসাধারণ মনে হয়েছিল।

ঋত্বিক ঘটক

‘তিতাস একটি নদীর নাম’ সিনেমায় কেন্দ্রীয় পুরুষ চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন প্রবীর মিত্র। প্রথমে আমরা এই চরিত্রের জন্য সরকার কবিরউদ্দিনকে খুঁজেছিলাম। তার সঙ্গে কথাও হলো। কিন্তু অন্য একটি কাজে ব্যস্ত থাকায় তাকে পাওয়া গেলো না। তখন কেউ একজন আমাকে অভিনেতা প্রবীর মিত্রের নাম বলে। খবর পাঠানো হয় তাঁকে। আমার সিনেমায় চিত্রগ্রাহক হিসেবে নিযুক্ত হন প্রখ্যাত মানুষ বেবী ইসলাম। আমরা তখন বেবী ইসলামের বাসায় সিনেমার কর্মপন্থা নিয়ে মিটিং করি আর আড্ডা দিই। একদিন প্রবীর মিত্র এলেন ঋত্বিক ঘটকের সঙ্গে দেখা করতে। এই দেখা করার ঘটনাটা ছিলো বেশ মজার। প্রবীর মিত্রকে ঋত্বিক ঘটক হাঁটতে বললেন। প্রবীর হাঁটলেন। আর ঋত্বিক কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখলেন। তারপর প্রবীর বাবুকে যেতে বলে আমাকে নির্দেশ দিলেন তাকে কাস্ট করার জন্য।
ঋত্বিক ঘটক যখন মদ্যপান করতেন আমি সামনে বসে থাকতাম। নানা ধরণের গল্প হতো তার সঙ্গে। তবে স্ক্রিপ্ট বিষয়ে খুব একটা কথা আমি কখনোই বলিনি। সেই পর্বের পুরো দায়িত্ব ছিল স্বয়ং পরিচালকের উপর। উনি ভারতীয় গণনাট্য সংস্থা বা আইপিআইটি-এর গল্প করতেন।গল্প করতেন তাঁর জীবনের নানা ঘটনা নিয়ে। আমি বুঁদ হয়ে তাঁর গল্প শুনতাম। তখন তিনি গান শুনতেন। রবীন্দ্রসঙ্গীত ছাড়াও নানা ধরণের গান তাকে শুনতে দেখেছি।
আমি প্রতিদিন নিজের হাতে টিফিন ক্যারিয়ারে করে খাবার নিয়ে যেতাম ঋত্বিক ঘটকের জন্য। আমার সামনে বসে উনি খেতেন। বাংলাদেশে এসে খুব পছন্দ করে খেতেন গরুর মাংস আর ভাত।উনার পছন্দের তালিকায় গরুর মাংস ছিলো এক নম্বরে। এ ছাড়া খাবার নিয়ে ওনার খুব কোনো চাহিদা দেখিনি।
রাত জাগতেন ঋত্বিক ঘটক। রাতের খাওয়া হয়ে গেলে তার প্রধান কাজ ছিলো বই পড়া। ঘুমের আগে দু পাতা তাঁর পড়তেই হবে। একবার মনে আছে, অন্য এক জায়গায় তাঁকে নিয়ে রাত কাটাতে হয়েছিল। ওই বাসায় রাতে পড়ার জন্য কোনো বই খুঁজে পাচ্ছিলেন না। শেষে আমাকে নির্দেশ দিলেন বই খুঁজে আনতে। সে রাতে একটি বাংলা ব্যাকরণ বই আমি খুঁজে পেয়েছিলাম ওই বাড়িতে। ঋত্বিক ঘটক গভীর মনযোগ দিয়ে ওই ব্যাকরণ বইটা-ই পড়েছিলেন রাত জেগে।

ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com