উত্তর আমেরিকায় বইমেলা..ইতিহাস খুঁড়লেই শত শত ঝর্ণার ধ্বনি

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
জসিম মল্লিক

জসিম মল্লিক

ny-30

বইমেলা

ny-29

লেখক আড্ডা

toronto-boimela-7

ক্ষুদে পাঠকের সঙ্গে জসিম মল্লিক

১.
(টরেন্টো থেকে):আমি কখনো লেখালেখির জগতের মানুষ হবে তা জানতাম না। কোনো কিছুই আগে থেকে নির্ধারিত থাকে না। নিয়তি মানুষকে টেনে নিয়ে যায় অন্য কোথাও। এমনকি আমি যেরকম একটি পরিবার থেকে এসেছি সেখানে লেখালেখির কোনো আবহাওয়াও ছিল না। সেখানে ছিল এক লড়াই সংগ্রাম। নিজেকে টিকিয়ে রাখার এক প্রানান্ত প্রচেষ্টা। এ বছর যখন কলকাতায় আমার প্রিয় লেখক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের বাড়িতে গেলাম দেখা করতে, দেখলাম কি সাধারণ জীবন যাপন করেন তিনি। কি শান্ত স্নিগ্ধ একটি বাড়িতে শুধু লেখার মধ্যেই বসবাস তার। আর কিছু যেনো নেই। লেখাই জীবন। এতোটা বয়সেও। তার জীবনও এমনই ছিল। তার শৈশব কৈশোরও ছিল অতি সাধারণ। তিনিও কখনো ভাবেননি লেখালেখিই হয়ে উঠবে তার জীবন। তিনি নিজেই বলেছেন এইযে এতো এতো এপিক উপন্যাস লিখেছেন কখনো তেমন পরিকল্পনা করে লেখেননি। তিনি গল্প শুরু করেন তারপর গল্পই তাকে টেনে যায় গভীর থেকে গভীরে। তিনি নিজেও জানেন না কোথায় গিয়ে শেষ হবে। অনেক চরিত্র আর মানুষ তার প্রিয় বিষয়।
তখন আমি স্কুলে পড়ি। আমার এক ক্লাসের বন্ধু মাঝে মাঝে আমাকে বই পড়তে দিত। আলাউদ্দিন আল আজাদের বিখ্যাত উপন্যাস’তেইশ নম্বর তৈলচিত্র’ পড়তে দিয়েছিল একদিন। পড়ে খুব ভাল লেগেছিল বইটি পড়ে। সেই বই অবলম্বনে চলচ্চিত্রও হয়েছিল। ইলয়াস কাঞ্চন ও ববিতা অভিনয় করেছিল। তখন মাঝে মাঝে বরিশাল পাবলিক লাইব্রেরীতে যেতাম। সেখানে অনেক বই দেখে মন আনন্দে নেচে উঠত। ভাবতাম এইসব বই আমি পড়বো। সব পড়ে শেষ করব। শুরু করলাম বই পড়া। লাইব্রেরীয়ান চাচা আমাকে যতখুশী বই বাড়িতে আনতে দিত। আমি বয়সে ছোট, মনে হয় সর্বকনিষ্ঠ মেম্বার। একটা নেশার মতো হয়ে গেলো। স্কুলের পড়া বাদ দিয়ে গল্পের বই পড়ি। গল্পের চরিত্রের সাথে মিশে যাই। ভাবি আমিও ওরকম হবো। নীহাররঞ্জন গুপ্ত, বিমল মিত্র, ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়, আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, বঙ্কিমচন্দ্র, শরৎচন্দ্র গিলে খাই। কি এক যে নেশা। মা আমার নেশা দেখে আৎকে ওঠেন। কেঁদে কেটে অস্থির হন। ভাবেন বাপ মরা ছেলে লেখাপড়া না শিখলে খাবে কি! রাতের বেলা মেইন সুইস অফ করে দেন যেনো বই না পড়তে পারি।
অনেক পরে মা একদিন জিজ্ঞেস করলেন, তখন মা খুউব অসুস্থ্য। আমার হাত ধরে বললেন তুমি নাকি লেখো! কি লেখো! মা জানেন আমি লিখি। কিন্তু মা ভুলে যান। আমি হাসি, বলি হ্যা লিখিতো। মা সুন্দর হেসে বললেন তুমি নাকি আমার কথাও লেখো! আমার কথা কি লিখ! আমি বললাম, কে বলল আপনার কথা লিখি! মা রহস্যময় হেসে বললেন একজন বলছে। সে আমাকে পড়ে শুনাইছে। কে বলেছে মা কখনও বলেনি। মা মারা যাওয়ার পরও মাকে নিয়ে আমি অনেক লিখেছি। মা নিশ্চয়ই কোথাও বসে তা জানতে পারছেন। কিন্তু আমি যে আমার সংগ্রামী জীবনের পাশাপাশি একজন লেখার জগতের মানুষ হবো তা কল্পানায়ও ছিল না।
২.
লেখালেখি আমার একটা শখ। আমার লেখা অনেক মানুষ পড়বে, অনেক বই বিক্রি হবে সেই প্রত্যাশা আমি করি না। আমি লিখি আমার আনন্দের জন্য। আমার যখন যা মনে আসে, যখন যে ভাবনার উদয় হয় সেসব বলার কোনো লোক নাই আমার। আমি একটু অন্য ধারার মানুষ। আমাকে কেউ বোঝেনা। শৈশবকাল থেকেই আমি এমন। তখন আমার মনে হলো আমি আমার কথাগুলো, ভাবনাগুলো লিখব। আমার বই প্রকাশিত হবে তা ছিল আমার কল্পনার বাইরে। এমনকি আমার লেখা কেউ কোনোদিন ছাপবে তাও আমি ভাবিনি। নিজের ভাবনা লিপিবদ্ধ করার জন্য আমি ডাইরী লিখতাম। তারপর পত্রিকায় চিঠিপত্র। নামকরা কয়েকজন পত্রলেখকের মধ্যে আমিও ছিলাম। আমার লেখা চিঠি পত্রিকায় ছাপা হতো দেখে আমি বিস্মিত হতাম। এখনও ছাপার অক্ষরে আমার নাম দেখে আমি আনন্দিত হই। মনে হয় আজই প্রথম দেখলাম ছাপার অক্ষরে নাম।
আমি ঢাকা পারি জমিয়েছিলাম শুধু পড়াশুনার জন্যই না, যাদের লেখা পড়ে আমি মুগ্ধ হই, যেসব লেখক ছিল আমার স্বপ্নের মানুষ, রাজপুত্র মনে করতাম যাদের তারা সামনা সামনি দেখতে কেমন এটার জন্যও আমি ঢাকা এসেছিলাম। ঢাকায় নিজেকে টিকিয়ে রাখা আমার জন্য এতো সহজ ছিল না। ঢাকায় আমার কেউ ছিল না। লেখা ছাপা হওয়া বা বই প্রকাশতো অনেক পরের কথা। দৈনিকবাংলা অফিসের বারান্দা দিয়ে ঘুরতাম। ঢুকতে সাহস পেতাম না। পথের দিকে তাকিয়ে থেকেছি কখন লেখক আসবে। লেখক দেখব। একজন মানুষ কেমন করে লেখে, গল্প তৈরী করে, কাঁদায়, হাসায় এটা একটা বিস্ময় আমার কাছে। এখনও আমি লেখক দেখলে অভিভ’ত হয়ে তাকিয়ে থাকি। আমি কখনো বলিনা যে আমিও লিখি। এসব বলা যায়!
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়কে বলেছিলাম আমি একটু আপনার হাতটা ছুঁয়ে দেখব।একই কথা আমি নিউইয়র্কে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ও সমরেশ মজুমদারকেও একবার বলেছিলাম। নিউইয়র্কে আমি সেলিনা হোসেন পাশেও বসে থেকেছি, কথা বলেছি। একটা অদ্ভুৎ শিহরন অনুভব করেছি। নিউইয়র্ক বইমেলায় আমি আনিসুল হকের হাতও ছুঁয়ে বসেছিলাম। মা’এর মতো উপন্যাস যিনি লেখেন তার হাত ছুঁয়ে থাকতে ইচ্ছে তো হবেই। এবার ঢাকায় বইমেলায় মঈনুল আহসান সাবেরের হাতটা ছুঁয়ে দেখার সুযোগ পেয়েছিলাম, তার একটা অটোগ্রাফ নেওয়ার ছলে। তাকে তো কতই দেখিছি বহুবছর ধরে। তবুও স্বল্পভাষী মানুষটি আমাকে বিস্মিত করে।
যখনই লেখকদের সান্নিধ্যে গেছি বিমোহিতহয়েছি। এবার জাকির তালুকদার ও ইমতিয়ার শামীমের সাথে দেখা হলো। জাকির তালুকদারকে আগে দেখিনিতো! সৈয়দ শামসুল হক বা আনোয়ারা সৈয়দ হককে গভীরভাবে দেখছিলাম বইমেলার সময়। পাশাপাশি বসেছিলামও। তারা এতো অসাধারণ লেখা কেমন করে লেখেন! আমার বিস্ময়ের ঘোর সহজে কাটে না।ইমদাদুল হক মিলনকেওদেখছিলাম। আগেও কত দেখেছি। কথা বলেছি। এতো বই তিনি লিখেছেন! লুৎফর রহমান রিটন আমার ’এখানে প্রানের  স্রোত’ বইয়ের দীর্ঘ ভূমিকা লিখে দিয়েছিলেন এবার। সেই বই বিক্রি হলো প্রচুর। আলী ইমামকে দেখে ভাবছিলাম ৬০০ বই কিভাবে লিখলেন! আমি সহজেই মুগ্ধ হতে পারি। আর এসব ঘটনাতো আমাকে প্রতিনিয়ত মুগ্ধতায় ভরিয়ে রাখবে।
৩.
বই এবং বইকে কেন্দ্র করে যেকোনো কিছুর সাথে সম্পৃক্ত হতে আমি আনন্দ পাই। কোনো কিছু পাওয়ার জন্য না, কিন্তু তবুও আমি ছুটে যাই প্রতিবছর কখনো ঢাকা, কখনো নিউইয়র্ক, কখনোবা কলকাতা বইমেলায়। আমার মতো খেঁেট খাওয়া মানুষের জন্য এটা একটু বিলাসিতা বৈকি। কিন্তু তা স্বত্বেও নিজেকে এসবের অংশ মনে হয়। যখন বিচিত্রায় কাজ করি সেই আশির দশকে তখনই বইমেলার সঙ্গে সংযোগ। বিচিত্রার জন্য রিপোর্ট করি। লেখক পাঠক আর প্রকাশকদের একটা অপূর্ব মিলনমেলা। সেই থেকে বইমেলা যেনো জীবনের অংশ হয়ে গেছে। এখন পরিকল্পনা করছি বরিশালে একটা লাইব্রেরী করার। সেখানে বিনা পয়সায় বই পড়ার সুযোগ থাকবে। মানুষ যাতে বই বিমুখ না হয় সে চেষ্টা আমাদের করতে হবে। যারা বইকে ভালবাসে তাদের নিয়েই আমি আমার উদ্যোগ এগিয়ে নিতে চাই। আমি আমার বন্ধুদের বলেছিও আমার স্বপ্নের কথা।
এবছর দুটো উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিল টরন্টো বইমেলার দশ এবং নিউইয়র্ক বইমেলার পঁচিশ বছর। টরন্টো বাংলা বইমেলা শুরু হয় ২০০৭ সালে। বইয়ের প্রতি এই আকর্ষন বা প্রবাসে সাহিত্য ও বুদ্ধিবৃত্তির এই চর্চা সত্যি বিস্ময়কর।’ টরন্টোবইমেলা এখন বেশ পরিচিতি পেয়েছে। প্রতিবছর দুই বাংলার খ্যাতিমান লেখক, প্রকাশক ও শিল্পীরা এতে অংশ নেন। দিনব্যাপী একটা উৎসবের রেশ ছড়িয়ে থাকে উত্তর আমেরিকা জুড়ে।
সাংবাদিক নিনি ওয়াহেদ লিখেছেন ,’বিশ্বায়নের ছোঁয়ায় বাংলা সাহিত্যের সমৃদ্ধি সর্বজনবিদিত। বাংলা সাহিত্যের নন্দিত লেখকরা দীর্ঘকাল থেকে তাদের সাহিত্যের ভান্ডারে বিশ^সাহিত্যের ভাবদর্শনকে যেমন গ্রহণ করেছেন তেমনি তার পঠনও বিপুলভাবে আগ্রহী হয়েছেন।পৃথিবীর যে প্রান্তেই বাঙ্গালী থাকুক না কেন তাদের অন্তর ধারণ করে আছে বাঙালিয়ানা’। অস্তিত্বের শেকড় সন্ধানে আবেগী বাঙালির মন-প্রাণ জুড়ে ছড়িয়ে আছে বাংলার চিরন্তন ছবি, খাল- বিল, নদী-নালা আর প্রকৃতির অপরপ সৌন্দর্য। প্রতি মুহূর্তে প্রতিটি বাঙালি সেই অস্তিত্ব অনুভব করে হৃদয়ে স্পন্দন জাগাতে চায়।
প্রবাসে যারা বুদ্ধিবত্তির চর্চ্চা তারা প্রবাসী বাঙালির স্পন্দিত হৃদয়ে ইতিহাসের ঝর্নার ধ্বনি সৃষ্টি করে চলেছে। কবি জীবনানন্দ দাশের ভাষায় বলতে হয়, ’ ইতিহাস খুঁড়লেই শত শত ঝর্ণার ধ্বনি’। সেই ইতিহাস বাঙালির শেকড়। সেই শেকড়ের সন্ধানে অবিরাম পথচলা।কিন্তু এই পর্যায়ে আসতে অনেক কাঠ খড় পোড়াতে হয়েছে। অনেক প্রতিকুলতার মধ্যেও উদ্যোক্তারা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন তাদের স্বপ্নকে।প্রবাসী বাঙালির আত্মানুসন্ধান ও অস্তিত্বের অন্বেষনে যেন স্মৃতিসুধারস ঢেলে দিয়েছে।বইমেলাতো আর অন্য আর দশটা বাজারী মেলার মতো না। কোনো বাণিজ্যিক ধারনাও নাই এর সাথে। এটা নিছক সুস্থ্য বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার অংশ। প্রবাসে যারা এর সাথে সম্পৃক্ত, যারা শ্রম ও মেধা দিয়ে বইমেলাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন সবার প্রতি আমার ভালবাসা। নিজের কৃষ্টি, সংস্কৃতি, স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং ভাষার জন্য যে লড়াই তা নতুন প্রজন্মের মধ্যে প্রোথিত করার একটি অন্যন্য উদ্যোগ। এই ধারা অব্যাহত থাক।

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com