উঠে গেছে রেশন শপ

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ইরাজ আহমেদ

রেশন শপ। তারও আবার গল্প! বিষ্মিত হওয়ার কথাই কিছুটা। কিন্তু রেশন শপেরও গল্প আছে। এখনকার প্রজন্ম হয়তো এই নামের সঙ্গেই পরিচিত নয়। কিন্তু এই শহরে একদা রেশন শপ ছিল। যে কোন পাড়ায় অথবা মোড়ের মাথায় টিনশেড ছোট একটা দোকান। দোকানের কপালে ঝুলছে পুরনো হয়ে যাওয়া কালো অথবা হলুদ রঙের সাইনবোর্ড।দোকানের কাঠামোর গায়ে ঝোলানো হলুদ রঙের আরেকটা বোর্ডে (বেশীরভাগ সময় রঙটা হলুদ ছিল) লেখা পণ্য তালিকা। সেখানে লেখা গম, চাল, আটা, চিনি, সাবান, বাটার অয়েল ইত্যাদি। দোকানের সামনে বেশ দীর্ঘ লাইন মানুষের। সবার হাতেই শিশি আর টিনের বাক্স। এরকমই ছিল তখনকার দিনে একটা রেশন শপের চিত্র। সরকার পরিচালিত বাজার মূল্যের চাইতে কমে কিছু খাদ্যসামগ্রী পাওয়ার দোকান ছিল ওই রেশনশপ।
সময়টা সত্তরের দশকের গোড়ার দিক। বাংলাদেশ পরিচিত হয়ে উঠেছে স্বাধীন একটি দেশ হিসেবে। তখন ঢাকা শহরে এমন কিশোর আর তরুণ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর ছিল যে রেশনের লাইনে দাঁড়ায় নি।মনে আছে, সপ্তাহের কোন একটি দিনে দুপুরবেলা আমার বৃদ্ধা দাদু মাঝে মাঝেই হাতে ধরিয়ে দিতো কয়েকটা টিনের পাত্র আর রেশন কার্ড। তখন সব বাড়িতেই এই রেশন কার্ড বস্তুটি যত্নে রক্ষিত থাকতো। অনেক পরিবারে পলিথিনের আবরণ দিয়ে যত্নে মুড়িয়ে রাখা হতো সেই কার্ড। পরিবারের প্রাপ্তবয়ষ্ক সদস্যদের মাথাপিছু সরকার থেকে বরাদ্দ করা হতো রেশন কার্ড।তখন ভুয়া কার্ড বানিয়ে বেশী পরিমাণে চাল, গম সংগ্রহের কারবারও চলতো।
প্রতিটি কার্ডের বিপরীতে বরাদ্দ থাকতো তেল, গম, চিনি, চাল আর সামান্য কিছু পণ্যের সরবরাহ। রেশনের লাইনে আগে দাঁড়ানোর জন্য পাড়ার কিশোর আর তরুণদের মধ্যে তখন চলতো প্রতিযোগিতা। বেশীরভাগ দিনেই দোকানের সামনে লম্বা লাইন হয়ে যেতো। স্মৃতি প্রতারণা না করলে মনে আছে অনেক সময় শেষ রাতে উঠে অনেকে লাইনের জায়গায় ইট পেতে রেখে আসতো সিরিয়ালের জন্য। সেই সময়ে রেশন দোকানের বোর্ডে প্রায়ই লেখা দেখতাম-চাল-নাই, গম-নাই, সাবান-আছে, বাটার অয়েল-আছে।সময়মতো পণ্য না পাওয়ায় প্রায়ই দোকানের সামনে কর্মচারীদের সঙ্গে গোলমাল বেধে যেতো গ্রাহকদের। রেশন তোলার জন্য আমাদের মধ্যে একধরণের আগ্রহ ছিল। কারণ সেখান থেকে সামান্য কিছু খুচড়ো পয়সা সরানোর একটা সুযোগ থাকতো। সে পয়সায় গোপনে দু একটা সিগারেট কেনা আর মোড়ের রেস্তোরাঁয় চা-সিঙ্গাড়া হয়ে যেতো।তাই রেশন তোলার দিনটা আমাদের কাছে ছিল অনেকটা উৎসবের মতো।
রেশন শপের ভেতরে ছিল বিশাল আকৃতির এক দাড়িপাল্লা। সেখানে ওজন দেয়া হতো বিভিন্ন পণ্য। লম্বা লাইনে ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে আমরা এই রেশন সংগ্রহ করতাম। দোকানের সামনে দিয়ে হেঁটে গেলে চাল, গমের কেমন একটা ধূসর গন্ধ নাকে এসে লাগতো। বন্ধ দোকানের বারান্দায় অন্য সময় ছড়িয়ে থাকতো চালে। দেখা যেতো লালচে আটার রেখা।সেই রেশন দোকানকে ঘিরে সব জায়গাতেই চলতো দুই নম্বরী কারবার। এ নিয়ে এলাকার মাস্তান আর রেশন শপের ডিলারদের মধ্যে চলতো সংঘাত। তখন আমরা থাকতাম সিদ্ধেশ্বরী এলাকায়। সেখানকার রেশন শপের ডিলার ছিল বাহার নামে এক ব্যক্তি। শপে বরাদ্দ আসা চিনি আর চাল খোলা বাজারে বিক্রি করে দেয়ার একটা অভিযোগ তার বিরুদ্ধে সবসময়ই ছিল। এই দুই নম্বরী কারবারের জন্য প্রায় সময়ই রেশন শপে জিনিপত্র পাওয়া যেতো না।
রেশনশপ যখন বন্ধ থাকতো তার বারান্দায় জমে উঠতো আমাদের আড্ডা। দুপুরের রোদ এড়াতে দোকানের বারান্দাটা হয়ে উঠতো আমাদের আশ্রয়স্থল।আমাদের সেইসব আড্ডায় মাঝে মাঝে জুড়ে যেতো রেশন দোকানের মাল নামানোর লোকজন আর ম্যানেজার। আমাদের সেই আড্ডার মূল আলোচনার বিষয় থাকতো রেশন তোলার দিনে কে কত তাড়াতাড়ি এসে লাইন দেবে। বন্ধুদের কেউ আগে দাঁড়িয়ে অন্যদের জন্য জায়গাও রেখে দিতো। তখন এই শহরের অন্য রেশনশপে লাইনের জায়গা বিক্রি হবার গল্পও শোনা যেতো।
উঠে গেছে রেশন শপ। একসময়ে কালের পরিক্রমায় এই দোকানগুওেলাও মুছে গেছে গলি থেকে। কিন্তু আজও পুরনো পাড়ায় গেলে রেশন শপের জায়গাটার দিকে দৃষ্টি চলে যায়। খামোখাই হয়তো অনেক কথা মনে পড়ে।কত বন্ধুর মুখ স্মৃতির ভেতরে পৃষ্ঠা উল্টাতে শুরু করে।

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com