ইমারতের সারি বাধা দঙ্গল…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শেখ রানা (এডিনবরা, স্কটল্যান্ড থেকে)

এক.

হাইকোর্টের সামনে বটগাছ

হাইকোর্ট মাজার ঘুরে বট গাছের নিচে গিয়ে দাড়াই।
সন্ধ্যা নেমে গেছে। মাজার গেটের এই বট গাছের সঙ্গে একটা শান বাঁধানো বসার জায়গা আছে। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, সিগারেট ছেড়ে দেয়ার পর আমি এমনকি সিগারেট এর ধোঁয়া পর্যন্ত নিতে পারি না। আমুল পরিবর্তিত আমি প্রবল সিগারেটের ধোঁয়ায় জর্জরিত বট গাছের বেদীতে গিয়ে বসি। আমার চারপাশে নাম না জানা মানুষ। একজন আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। জট পাকানো দাড়ি গোঁফে মুখের ভাবটা বুঝতে পারিনা। না পারাকে আমি সঙ্গী করে নিয়েছি বহুকাল আগে।
ঠিক এই খানে একজনের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়। তারপর আমরা এক দুপুর বেলা পলাশীতে মালা বদল করেছিলাম। আচমকা সেই কথাটা আমার মনে পড়ে যায়।

 

দুই.

বিহঙ্গ বাস

আজিমপুর বাস স্ট্যান্ড থেকে বিহঙ্গ বাসে উঠবো। গন্তব্য মিরপুর। এই আমার চেনা রুট।
সারাদিন ঘুরে-ফিরে রিকশা নিয়ে টি এস সি, ফুলার রোডের সবুজ আর কোলাহল গায়ে মেখে আজিমপুর হয়ে বাসায় ফিরে আসি। কোনো গুঢ় রহস্য নেই এর। আমার পুরো জীবনেই কোনো রহস্য নেই। আমি অনেক ভুল করেছি, দুর্বিনীত জীবন কাটিয়েছি বোহেমিয়ান কালে। কিন্তু রহস্যময় শব্দচয়নে নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাইনি।
বাসের জন্য দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ জীবন নিজেই দার্শনিক হয়ে আমাকে টোকা দেয়। তারপর আমি আর জীবন দুজনে মিলে পাঁচ টাকার বাদাম কিনি। অতি সুস্বাদু লাগে। আয়োজন করে বাদাম খোসা ফেলতে যাবো, চোখে পড়ে মেয়রের নাম স্বাক্ষর করা ডাস্টবিন। বাহ! এখন আর কেউ বলতে পারবে না ময়লা ফেলার জায়গা নেই।
ঢাকা শহর আর এশট্রে হবে না। রাস্তার মোড়ে মোড়ে ময়লা ফেলার সুদৃশ্য ধারক দেখি। সুন্দর দৃশ্য।

তিন.

নান্দুস

অনেকদিন পর গ্রে তে আসি। এখান থেকে আমি কর্মজীবন শুরু করেছিলাম।
অনেক নতুন মুখ। আর বাকি কিছু পুরানো হাসিমুখ। কত স্মৃতি, কত আনন্দ। কপি লেখার ব্যাকরণ। আর আমার ব্যাকরণ না মানা পদ্য। গ্রামীন ফোন আর প্রথম আলোর জন্য কপি লেখা, আমার ব্যাংক একাউন্ট হওয়া, এক একটা দিন সারাদিন টেবিল টেনিস খেলা, বিকেলের টিফিন আর ছাদের আড্ডা। অফুরন্ত গল্প আমার গ্রে জীবনে।
আমার জীবনে অনেক কিছু আমি সময়মত করতে পারিনি। সে নিয়ে আমার খুব যে খেদ আছে তাও না। গ্রে তে শেষ দিকে আমার কারণ ছাড়াই কাজ করতে ইচ্ছে করেনি। ইররেশনাল মানুষের যা হয়। কিন্তু এই টেবিলে আর বসবো না, পেছনে নাবিলার সঙ্গে গান হবে না, সামনে সাগর, মুরাদ এর সঙ্গে আডডা। ঐদিকে পলাশ, আলো ভাই। অনতিদূরে ভরপুর মাসুদ, ফারিয়া আর নিকটে বাচ্চু ভাই…এদের সঙ্গে আর দেখা হবে না ভাবতে পারিনি।
তারপর একদিন নান্দুস এ চিকেনে কামড় বসাতেই’ আপনি বরং কাজটা ছেড়ে দিন’ বাক্য শুনে চিকেন এর বিস্বাদ লাগা দুপুর।

ইমারতের দঙ্গল

চার.

বিজ্ঞাপনী গল্প আর একদিন হবে। আজ নাগরিক জার্ণাল শেষ করি সুন্দর কথা দিয়ে।
ইমাম গাজ্জালীর কিমিয়ায়ে সাআদাত পড়ছি ফের। অসাধারণ সব শব্দচয়ন। হাতে পেলাম হামীম কামাল এর জঠর, অমিত চক্রবর্তী-র আন্তোনিয়ের মেঘ আর মজনু শাহ এর আমি এক ড্রপ আউট ঘোড়া।
দেখা হলো হামীম আর পার্লিয়ার সাথে। হামীম আপাদমস্তক লেখক। ভালো লাগল দেখে। যেভাবে ভাবে, সেভাবেই লেখে। ফাহাদ এর সঙ্গে আমার পরিচয় সেই ব্লগ জীবন থেকে। সেই জীবনে এই পরিচয়গুলো কিভাবে যেন আটকে গেছে এক অদৃশ্য বন্ধনে।
বলছিলাম কিমিয়ায়ে সা’আদাত এর কথা। সেখান থেকে উদ্বৃতি দিয়ে আজ শেষ করি বরং।
‘হযরত মালিক ইবন আনাস রাজিয়াল্লাহু আনহু বলেন-” ধর্মমত লইয়া বাদ-প্রতিবাদ করা ধর্মের অন্তভুর্ক্ত নহে।”
পূর্ববর্তী বুযুর্গগণ ধর্মমত লইয়া বাদানুবাদ করিতে মানা করিয়াছেন। কেহ কোন বিদাত কার্য প্রচলন করিলে বা কুরআন শরীফ ও হাদীস শরীফের আদেশ-নিষেধ অমান্য করিলে তাহার বাদানুবাদ না করিয়া সেই ব্যাক্তিকে সত্য কথা বুঝাইয়া দিতে চেষ্টা করিতেন; ইহাতে ফল না দর্শিলে এরুপ লোকের পশ্চাতে না লাগিয়া বরং তাহারা ফিরিয়া আসিতেন।’
‘বাহুল্য কথন-লালসা বর্জনের উপায় ও রসনার আপদ’- অধ্যায়ের এই অংশটুকু পড়ে পরম যত্নে বইটা বালিশের পাশে রেখে দেই। তারপর জানলা খুলে বাংলাদেশকে দেখি।
ইমারতের সারি বাধা দঙ্গল।
কোথাও বাংলাদেশকে খুঁজে পাইনা।

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com