ইন্দিরা গান্ধীর নিখোঁজ অধ্যায়ের খোঁজে…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এম ও মাথাই

বইটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৭৮ সালে। এখন থেকে ৩৯ বছর আগে। তখনই এই বই নিয়ে ভারতে আলোচনার ঝড় ওঠে। বইটি নিষিদ্ধ ঘোষণাও করা হয়েছিল। তারপর অনেক সময় পার হয়েছে। ‘রেমিনিসেন্স অফ নেহেরু এজ’ নামে এম ও মাথাইয়ের লেখা আলোচিত বইটি ধীরে ধীরে চলে যায় আলোচনার বাইরে। কিন্তু এতোগুলো বছর টপকে আবারও ইতিহাসের পর্দা উঠলো সেই বইয়ের উপর থেকে। সম্প্রতি এই বইয়ের নিখোঁজ একটি পরিচ্ছেদ প্রবল সংবাদের বিষয় হয়ে উঠেছে ভারতীয় পত্র পত্রিকায়। বহু বছর ধরে নিখোঁজ ওই পরিচ্ছদে মাথাই লিখেছিলেন তার সঙ্গে ইন্দিরা গান্ধীর ১২ বছরের প্রণয় পর্বের কথা। পরিচ্ছেদটির নাম দিয়েছিলেন লেখক ‘শি’। নড়েচড়ে ওঠার মতো তথ্যই বটে! ভারত এবং বিশ্বের রাজনীতির মাঠে ‘আয়রন লেডি’ হিসেবে পরিচিত ইন্দিরা গান্ধীর ব্যক্তিগত কাহিনির খোঁজ আগে কোথাও পাওয়া যায় নি।

যৌবনে ইন্দিরা গান্ধী

রহস্যময় অধ্যায়

নেহেরুর রাজনৈতিক কর্মকান্ড, উক্তি আর নানা রমণীর সঙ্গে হৃদয়ঘটিত জটিলতার বিবরণ এই বইটিকে এমনিতেই বিষ্ফোরক করে তুলেছিল সেই সময়ে। কিন্তু ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে স্বয়ং লেখকের মন দেয়া-নেয়ার বিষয়টি বইয়ের কোথাও স্থান পায়নি। পাবেই বা কী করে! বইয়ের ১৫৩ পৃষ্ঠায় প্রকাশক নরেন্দ্র কুমারের দেয়া বক্তব্য অনুযায়ী লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত কিছু প্রসঙ্গ নিয়ে লেখা ২৯ নম্বর পরিচ্ছদটি লেখক নিজেই বই প্রকাশের আগ মুহূর্তে প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন।

প্রশ্ন উঠেছে এরকম এক রহস্যময় পরিচ্ছদের অস্তিত্ব কী আদপেই ছিলো? পুরো বিষয়টা সন্দেহের আওতায় থাকলেও ইন্দিরা গান্ধীর জীবনীর লেখক ক্যাথারিন ফ্র্যাঙ্ক কিন্তু তাঁর লেখায় এই পরিচ্ছেদের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনিও লিখেছেন এই পরিচ্ছদের নাম ‘শি’। বছর দশেক আগে ক্যাথারিন লিখেছিলেন, মাথাই তাঁর লেখায় দাবি করেছিলেন ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে তার ভালোবাসার সম্পর্ক বেঁচে ছিলো দীর্ঘ ১২ বছর।এই সম্পর্কের বিবরণ দিয়ে মাথাই বইতে একটি পরিচ্ছদ লিখলেও শেষে নিজেই সেটার ওপর সেন্সরশিপ আরোপ করেন।

বোমা যখন ফাটলো

স্বামীর সঙ্গে ইন্দিরা

নিখোঁজ এই পরিচ্ছদটি এতো বছরের বিস্মৃতির পর্দা সরিয়ে আবার ফিরে এলো কী করে? অতি সম্প্রতি আলোচনার বন্ধ দরজা নতুন করে খুলে দিলেন টি ভি রাজেশ্বর। তিনি ইন্দিরা গান্ধীর শাসনামলে ইন্টালিজেন্স ব্যুরো পরিচালক ছিলেন। রাজেশ্বর একটি বই প্রকাশ করেছেন রাজনীতির অন্দর মহলে নিজের চলাচলের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে, ‘ইন্ডিয়া, দ্য ক্রুশিয়াল ইয়ার্স’ নামে। সেখানেই তিনি আমাদের আলোচনার সেই নিখোঁজ পরিচ্ছদ সম্পর্কে বোমা ফাটিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ১৯৮১ সালে তাকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন ভারতের তামিলনাড়ুর তৎকালীন মূখ্যমন্ত্রী এম জি রামচন্দ্রন। তিনি তাকে(রাজেশ্বর) এম ও মাথাইয়ের লেখা পরিচ্ছদের একটি কপি দিয়ে বলেছিলেন তা মিসেস গান্ধীর হাতে পৌঁছে দেয়ার জন্য। পরিচ্ছদের প্যাকেটটি তিনি নিয়ে যান এবং কোন ধরণের কথা না বলে হস্তান্তর করেন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কাছে। প্রধানমন্ত্রীও কোন বাক্য ব্যয় না করেই প্যাকেটটি তার কাছ থেকে গ্রহণ করেন।

বইতে রাজেশ্বরের দেয়া তথ্য এবার বোমা ফাটালো। সাংবাদিকরা ঝাঁপিয়ে পড়লো তাঁর উপর। ইন্ডিয়া টুডে টেলিভিশনের পক্ষ থেকে চট জলদি তার একটি সাক্ষাৎকার নেয়া হয়। সেখানে রাজেশ্ব বলে বসেন, সেদিন মিসেস গান্ধীর কাছে নিয়ে যাওয়া পরিচ্ছদটিই ছিলো আজকের আলোচিত সেই নিখোঁজ পরিচ্ছদ ‘শি’।

এরপর ভারতের ‘দি টেলিগ্রাফ’ পত্রিকায় দেয়া সাক্ষাৎকারে রাজেশ্বর বলেছেন, যেহেতেু এম জি রামচন্দ্রন প্যাকেটটি তাকে দিয়েছিলেন তাই তিনি সেটা পড়তে পারেন নি। তবে সেটাই যে মাথাইয়ের লেখা বইয়ের হারানো পরিচ্ছদ সে সম্পর্কে তিনি নিশ্চিত ছিলেন।

কে এই মাথাই

ভিন্ন আলোয় ইন্দিরা

মহা জটিল এক পরিস্থিতি।পুরো বিষয়টার ওপর যেন ঝুলে আছে রহস্যের ভারী পর্দা। ভারতীয় রাজনীতির মহা পরাক্রমশালী মানুষ ছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। পত্রিকার পৃষ্ঠায় এই রহস্যময় পরিচ্ছেদের অস্ত্বিত্ব নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। কেউ বলছেন প্রমাণের অভাবে গোটা বিষয়টাই নাকোচ হয়ে যায়। আবার কারো মত হচ্ছে মাথাইয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ মানুষ এতোটা স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে নিশ্চয়ই ছেলেখেলা করবেন না। এম ও মাথাই ১৯৪৬ সাল থেকে ১৯৫৯ সাল অব্দি জহরলাল নেহেরুর জ্যৈষ্ঠ্য সহকারী হিসেবে কাজ করেছেন। পেশায় ভারতীয় আমলা হিসেবে তিনি বেশ দ্রুত নেহেরুর প্রিয়ভাজন হয়ে ওঠেন।নেহেরুর অনুমোদনের জন্য যে কোন ফাইল তাঁর টেবিলে যাবার আগে এই মাথাইয়ের হাত ঘুরে যেতো।প্রতিদিন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রীর সান্নিধ্য লাভের সুযোগ ঘটতো মাথাইয়ের। ফলে নেহেরুকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। নেহেরু পরিবারের অন্দর মহলেও মাথাইয়ের ছিলো অবাধ যাতায়াত। ১০৫৯ সালে তিনি নেহেরুর সহকারীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন। তাঁর বিরুদ্ধে ক্ষমতা অপব্যবহারের অভিযোগ ছিলো বলেও শোনা যায়।

তাঁর বইতে নেহেরুর পাশাপাশি ভারতের রাজনীতির অনেক বড় বড় রুই কাতলা সম্পর্কে অনেক অজানা তথ্য থাকায় প্রকাশের পর পরই সেটি নিষিদ্ধ হয়ে যায়।

পত্রিকার খবর বলছে, লেখক নিজেই চেয়েছিলেন তাঁর মৃত্যুর পর মূল বইটি প্রকাশিত হোক। কিন্তু তারপর কোন এক কারণে তিনি ১৯৭৮ সালে সেটি প্রকাশ করার অনুমতি দেন প্রকাশককে। কিন্তু সেখান থেকে বাদ দেন ইন্দিরা বিষয়ক পরিচ্ছেদটি। অনুমান করা হয় ইন্দিরাকে বিব্রত করতে চাননি লেখক। এম ও মাথাই ১৯৮১ সালে হার্ট অ্যাটাকে মারা যান।

কী আছে সেই অধ্যায়ে

কী আছে মাথাইয়ের লেখা সেই নিখোঁজ অধ্যায়ে? এখন আর রহস্যের ঘেরাটোপে নেই গোটা বিষয়টা। ইন্টারনেটে প্রকাশ করে দেয়া হয়েছে রহস্যে ঘেরা সেই অধ্যায়। সেখানে ইন্দিরার সঙ্গে মাথাইয়ের প্রেম আর ঘনিষ্ট সম্পর্কের কথা বেশ খোলামেলা ভাবেই লিখেছেন লেখক। গাড়িতে চেপে তাদের চলে যাওয়া কোন অরণ্যঘেরা পরিবেশে, একে-অপরকে দেয়া ভালোলাগার নাম, ইন্দিরা গান্ধীর স্বামী প্রয়াত ফিরোজ গান্ধীর ভূমিকা-কোন কিছুই বাদ রাখেননি মাথাই। ১২ বছর ধরে গড়ে ওঠা সেই সম্পর্ক কী ভাবে ভেঙ্গে গেলো তারও উল্লেখ করেছেন তিনি।

কিন্তু তারপরেও প্রশ্ন থেকে যায়, থেকে যায় রহস্য। কোথা থেকে হঠাৎ করে এই অধ্যায়টি ইন্টারনেটে চলে এলো, এতোদিন কোথায়, কার কাছে গচ্ছিত ছিলো ভারতীয় রাজনীতির আয়রন লেডি ইন্দিরা গান্ধীর ব্যক্তিগত কাহিনি? উত্তর মেলেনি। তবে এই নিখোঁজ অধ্যায় ভারতীয় রাজনীতিতে যে নতুন মেরুকরণ ঘটাবে তাতে সন্দেহ নেই।

অদ্বিত আহমেদ
তথ্য ও ছবিঃ গুগল ।

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com