আয়নায় বন্ধুর মুখ

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ইরাজ আহমেদ

তার কথা খুব মনে পড়ে। এই শহরে কোনদিন একা পথে হেঁটে যেতে যেতে আচমকা মনে পড়ে তার কথা। পাথর ঘষে ধার দেয়া এক যুবক। রেবন কোম্পানীর নীলচে সানগ্লাসে ঢাকা চোখ, গালে হালকা দাড়ি, হাসিটা ছিল ঝকঝকে।অদ্ভূত এক উড়ুনচন্ডী এক সময়ে পরিচয় হয়েছিল তার সঙ্গে। কবে সেটা? ক্যালেন্ডারের পাতা ধরে হিসেব করে আজ আর সন, তারিখ মনে করা যাবে না। তবে সেটা ছিল আশির দশক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাব্রেরীর মাঠ (পরে যে জায়গাটার নাম হয়েছিল হাকিম চত্বর) অথবা মধুর ক্যান্টিনে প্রথম পরিচয়ের পালা যতদূর মনে পড়ে। বাইকের চাকায় ধূলো উড়িয়ে আসা এক রাগী যুবক। কথা খুব কম বলতো। কিন্তু কীভাবে যেন আমার সঙ্গে পরিচয়টা বন্ধুত্বের দোরগোড়ায় গিয়ে দাঁড়ালো। এরপর দেখা হতো হাকিম ভাইয়ের মাঠে, কলাভবনের করিডোরে, হলের সামনে, টিএসসি‘র মোড়ে। এই নিয়মিত দেখা হওয়ার কারণ ছিল রাজনীতি আর আড্ডা। রাজনীতির মানুষ ছিল আমার সেই বন্ধু। আশির দশকে এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে একটি রাজনৈতিক দলের সশস্ত্র ক্যাডার।
অস্ত্রের রাজনীতি নিয়ে কথা হতো আমাদের। কথা হতো রাজনীতির চরমপন্থা নিয়ে।কম কথা বলা সেই বন্ধুটি রাজনীতি, দর্শনের বই আর সিনেমা নিয়ে কথা বলতে ভালোবাসতো। মনে আছে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে পুলিশের তাড়া খেয়ে আমার সেই বন্ধু নিরাপদে রাত কাটানোর জন্য চলে আসতো আমার বাড়িতে। আমরা রাত পার করতাম গল্প করে আর সিনেমা দেখে। খুব ভোরে ঘুম ভেঙ্গে যেতো তার। আস্তে উঠে ছায়া সরে যাবার মতো করে উধাও হয়ে যেতো সে।
আমরা বাইকে চড়ে মাঝে মাঝে চলে যেতাম বঙ্গবাজারে। এই বিপণী বিতানটি এক সময়ে ঢাকা শহরের তরুণদের জিন্স কেনার আদর্শ জায়গা ছিল। সেখান থেকে জিন্সের প্যান্ট, জ্যাকেট কিনে আমরা ফিরে আসতাম ক্যাম্পাসে। আমরা দুজন কোন এক শীতে বঙ্গবাজার থেকে একজোড়া জ্যাকেট কিনেছিলাম। সেই জ্যাকেট পড়ে ওই শীতকালে  ফুরফুরে হাওয়ায় আমরা ঘুরে বেড়াতাম মটরবাইকে।
আমার এই বন্ধুটি একবার প্রেমে পড়েছিল। সে অবশ্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তার ছাত্রত্ব খতম হওয়ার কিছু পড়ে। একটি বড় ধরণের সন্ত্রাসের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাকে বহিষ্কার করেছিল।মেয়েটি তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে সদ্য পা রেখেছে। প্রেমটা শেষ পর্যন্ত হয়েছিল কি না? না। এরকম শক্ত চোয়ালের অধিকারী যুবকদের কি শেষ পর্যন্ত প্রেম হয়?বন্দুকবাজ আমার বন্ধুটিরও হয়নি। এক পর্যায়ে বেশ কিছুদূর অগ্রসর হওয়ার পর মেয়েটি তার আসল পরিচয় জেনে বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে দিয়েছিল ভয়ে।বেশ কিছুদিন অনুপস্থিত ছিল।
খুব ঠান্ডা স্বভাবের মানুষ ছিল আমার সেই বন্ধুটি। আমরা যখন রাত জেগে সিনেমা দেখতাম একদম কথা বলতো না। গভীর মনযোগ দিয়ে কঠিন সব সিনেমা দেখতো। ওর প্রিয় ছবি ছিল ‘রেইনম্যান’।
তার কথা আমার এখনো খুব মনে পড়ে। এরশাদ সরকারের চাপিয়ে দেয়া অবৈধ সব লম্বা ছুটির দিনগুলিতে আমরা সকালবেলা চলে যেতাম ক্যাম্পাসে। হাকিমের মাঠ অথবা ভাষা ইন্সটিটিউটের দেয়ালের ওপর বিচিত্র ভঙ্গীতে বসে চলতো আমাদের আড্ডা। আমি ওর বাড়িতে কোনদিন যাইনি। কয়েকদিন রিকশায় মগবাজারে ওদের বাসার গলিটার মুখে নামিয়ে অন্য কাজে চলে গেছি।
আমাদের বন্ধুত্বটা যে খুব গভীর কোন জায়গায় পৌঁছেছিল এমন বলা যাবে না। আবার খুব হালকা ছিলো সেটাও বলা যায় না। আমি মাঝে মাঝে লক্ষ্য করতাম সেই বন্ধুটির মধ্যে একধরণের চাপা অস্থিরতা কাজ করতো।কারণ জিজ্ঞেস করে কোন উত্তর পাই নি। হেসে অনেক কথাই উড়িয়ে দিতো সে। যেমন উড়িয়ে দিয়েছিল নিজের বিপদের শঙ্কাটুকু।

স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের পতনের পর নিজের রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে বেশ ঝামেলায় ছিল বন্ধুটি। দলের ভেতরেই কোন্দলের শিকার হয়েছিল। আমার এখনো মনে আছে, কোন এক দুপুরবেলা আড্ডা দিতে দিতে তাকে আমি বিপদের ব্যাপারে সাবধান করেছিলাম। তখনও হেসেছিল সে। তারপর? তারপর এক ভোরবেলা আমার বাসার টেলিফোনটি বেজে উঠেছিল। আমারই আরেক বন্ধু কান্নাজড়িত কন্ঠে জানিয়েছিল আমার সেই বন্ধুটি আর নেই। আগের রাতে তাকে নিজের বাড়ির সামনে গুলি করে খুন করেছে অজ্ঞাতনামা আততায়ীরা। আমার বন্ধুটির গেলায় আর পেটে গুলির ক্ষতচিহ্ন ছিল।
আমার খুব মনে পড়ে তার কথা। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা অতিক্রম করার সময় হঠাৎ যেন অস্পষ্ট কোন কাচের দেয়ালের আড়ালে আচমকা কেউ দাঁড়ায় ফুটপাথ ঘেঁষে। হাত তুলে ডাকে আমাকে। হয়তো মনে মনে আমরা অনেক কথা বলি। আবার কোনদিন ভীড়ের মধ্যে সেই চেনা ভঙ্গী দেখে চমকে উঠি।
পাথরে ঘষে ধার দেয়া সেই বন্ধু নিজের বাড়ির সামনে এক পুকুর রক্তের মধ্যে পড়েছিল। আততায়ীর বুলেট তো এরকমই। আমাদের সেইসব ফুরফুরে শীতের দিন আর ফিরে আসবে না। আমরা রোদ চশমায় চোখ ঢেকে আর ঘুরতে যাবো না শহর থেকে দূরে।
লেখাটা শেষ করে মনে হলো সেই বন্ধুটির কোন ছবিও আমার কাছে নেই। তখন তো আসলে ছবি তোলার এই তীব্র প্রবণতা ছিলো না।

ছবিঃ গুগল   

পড়ুন
সাকুরা, বলছি তোমাকে…
ম্যারিয়েটা ম্যারিয়েটা
আমরা সবাই আজও এক পাড়াতেই থাকি…
ঘোড়া, ঘাস ফুল আর ফ্ল্যামিঙ্গো

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com