আহা,যেন ভানুর সঙ্গে জহর

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ফেইসবুক এর গরম আড্ডা চালাতে পারেন প্রাণের বাংলার পাতায়। আমারা তো চাই আপনারা সকাল সন্ধ্যা তুমুল তর্কে ভরিয়ে তুলুন আমাদের ফেইসবুক বিভাগ । আমারা এই বিভাগে ফেইসবুক এ প্রকাশিত বিভিন্ন আলোচিত পোস্ট শেয়ার করবো । আপানারাও সরাসরি লিখতে পারেন এই বিভাগে । প্রকাশ করতে পারেন আপনাদের তীব্র প্রতিক্রিয়া।

প্রিয়ম সেনগুপ্ত, সাংবাদিক,ব্লগার, মিউজিশিয়ান (পশ্চিমবঙ্গ)

আমাকে যারা ভালবেসে পেট ও মন ভরে খাওয়ায়, আমি তাদের মনে রাখি। JUNGLE BOOK সেরকমই শুভানুধ্যায়ী। এদের সঙ্গে গেছিলাম ধুতুরদহ ট্রিপে। সায়েন্স সিটি থেকে ৪০ কিলোমিটারের রাস্তা। কী কী খেলাম শুনুন। কটেজে নামা মাত্রই লুচি, ছোলার ডাল, আলুর দম (আহা কী অনবদ্য!) দু’রকমের মিষ্টি। নিজের মায়ের হাতের ছাড়া সচরাচর কোনও লুচিকে আমি চট করে ‘এ গ্রেড’ সার্টিফিকেট দিই না। কিন্তু এদের দিচ্ছি। আহা! লুচি তো নয় যেন, মখমলি ময়দা। মুখে দিলে গলে যায়। বনেদি বাড়ির খাওয়া দাওয়ায় একবার ছোলার ডাল খেয়েছিলাম। মুখে দিলেই মেজাজ বাদশাহী হয়ে যায়। মনে হয়, আলবোলা হাতে জলসাঘরের ছবি বিশ্বাসের মতো বলি, ওরে কে আছিস…
তা যাক সে কথা। আলুর দমের প্রসঙ্গে আসি। সানি লিওনের সুমুদ্র থেকে বিকিনি পরে উঠে আসা দেখেছেন কখনও? সমুন্দর মে নাহাকে অওর ভি নমকিন হো গয়ি হো টাইপের? এটাও সেরকম। সেক্সি! টলটলে! গায়ে মাখা মাখা আদরে লেপ্টে থাকা গ্রেভি। যেন বলছে, এসো ভোগ করো আমাকে। আর মিষ্টির কথাই যদি ওঠে, ধুতুরদহতে গিয়ে ওই যে রসকদম্ব খেয়েছিলাম, মুখে পুরেই যেন অর্গ্যাজমে চোখ বুজে এসেছিল আমার। আহা, দেবভোগ্য যেন একেই বলে।
সবচেয়ে বড় কথা হল আতিথেয়তা। বিশ্বাস করুন, এই সলমন খানের দিব্যি কেটে বলছি, যেভাবে আরও খাও আরও খাও করে আমাকে খাওয়ানো হল, মনে হচ্ছিল যেন জামাইষষ্ঠীতে শ্বশুরবাড়িতে খেতে এসেছি। 
যে রিসর্টে উঠেছিলাম, তাতে ছিল একটা ছোট্ট সুইমিংপুল। সেখানে নামতে না নামতেই, হাজির আইসক্রিম ফিঙ্গারচিপস আরও নানারকমের জিনিসপত্র। কী? না, সাঁতার কাটলে খিদে পায় কিনা, জলে হাত-পা চালান আর স্থলে চালান মুখ। আমি আবার যাকে বলে হেঁ হেঁ, কেউ খাওয়ালে না বলতে পারি না। তাই আবার সাপ্টেসুপ্টে খেলাম। ঘণ্টা দু’য়েক পরে পুল থেকে উঠতে না উঠতে লাঞ্চ হাজির। মেনুটা আগে শুনুন, ডাল। তাতে থিকথিক করছে কাজু, কিসমিস। সঙ্গে ঝিরঝিরে আলুভাজা। শেষ হতে না হতেই হাজির ইঁচড়। ইঁচড় সাবাড় করতেই পাতে পড়ল পনির। পনীর ব্যাপারটাকে আমি আবার একটু এড়িয়ে চলি। কিন্তু গন্ধটা সলিড লেগে গেল। ভাবলাম চেখে দেখে নেওয়া যাক। বলব কী, এই লিখতে গিয়েও জিভে জল আসছে। বেশ খানিকটা ভাত, সাবড়ে দিলাম ওই দিয়েই। তারপরেই বুঝলাম ভুল করেছি। কারণ তখনও তো পাশে রয়েছে ইয়া বড় বড় কাতলা সর্ষে আর চিকেন। ভাবলাম, পয়সা যখন দিয়েছি, ছাড়ব কেন। অতএব মনে মনে হুঙ্কার দিলাম হাল্লা বোল। আকণ্ঠ খেয়ে যখন হাঁপাচ্ছি, তখনও পাতের পাশে দই আর রসগোল্লা পড়ে। খাবার টেবিলে নিয়ে এই শর্মা কোনওদিনও ফেলে ওঠেনি। বলাই বাহুল্য কষ্ট হলেও প্লেট ফাঁকাই করেছিলাম।
সাপের ছাগল গেলার মতো হাসফাঁস অবস্থায়, কী করে যে রুমের বিছানা পর্যন্ত উঠেছিলাম এবং দুপুরের ঘুম ঘুমিয়েছিলাম, সেটা মনে করলেও আতঙ্ক আসে। সন্ধে গড়িয়ে যাওয়ার পরে ঘুম ভাঙল দরজায় টোকায়।
-‘চা খাবেন না?’
ঘুমিয়ে ম্যাজম্যাজ করছিল গা। ভাবলাম একটু খাওয়াই যাক। কিন্তু দুপুরের ওই ভুরিভোজের পরে যে চা-এর সঙ্গে টা-ও আসবে তা কে জানত। গরম ধোঁয়া ওঠা চিকেন পাকোড়া। হ্যাঁ এবারও খেলাম। ট্যুরটা ছিল বন্ধুদের সঙ্গে। সন্ধেবেলা আড্ডা-গল্প-গানবাজনা করতে করতে সময় এগোচ্ছিল। এরই মধ্যে আবার খাওয়ার ডাক এলো। হ্যাঁ আবার খাওয়া।
ফের ডাল। দু’রকমের ভাজা। ফুলকপির তরকারি। চিংড়ির মালাইকারি। পাঁঠার মাংস। রান্না কোয়ালিটি সেই দুপুরের মতোই। সঙ্গে ‘একী আরও খান’ তো রয়েইছে।
জীবনে বহু জায়গায় ঘুরেছি। বিশ্বাস করুন জাঙ্গলবুকের মতো এরকম যত্ন করে কেউ খাওয়ায়নি। তারপর থেকে আমার যাবতীয় যা ট্যুর, সব ওই জাঙ্গলবুকই। আর ঘোরার এক্সপেরিয়েন্স? বলে না, বন্ধুদের সাথে ঘুরতে যাওয়ার মজাই আলাদা। জাঙ্গলবুকের মালিকরা যে এখন আমার অভিন্নহৃদয় বন্ধু।
জানেন না, পুরুষের মনের দরজা পেট।’‌
ওপরের উদ্ধৃত করা অংশটুকু আসলে পুরনো পোস্ট। ঘটনাচক্রে আজই সেই কথা মনে পড়ে গেল। কেন মনে পড়ল, সে কারণটিও অবশ্য বড়ই মধুর। গেছিলাম Raja Bhattacharjee –এর বাড়িতে একটা বিষয়ে পরামর্শ করতে। সংস্কৃত ভাষার আদি উৎপত্তি, বারাসতের ইতিহাস, কৃষ্ণনগরের রাজবাড়ি ইত্যাদি নানা গুরুগম্ভীর বিষয়ে আলোচনা শেষ করে বান্ধবী মৃত্তিকা যখন আলগোছে একবার বলেছে, তাহলে এবার ওঠা যাক, ঠিক তখনই ফ্ল্যাটের দক্ষিণ–পূর্ব কোণ বরাবর একটা মনকেমন করে দেওয়া গন্ধ ভেসে এল। মান্না দে ‘‌ললিতাআআআআ’‌ বলে যেভাবে বুক মুচড়ে দেন, ঠিক সেরকম গন্ধ। মন ও নাক সহমত পোষণ করে জানাল, এ গন্ধ লুচি বা কচুরি না হয়ে যায় না। কে বলতে পারে, তা আমাদের জন্যই ভাজা হচ্ছে না। তাই তাহলে এবার ওঠা যাক–এ বিশেষ পাত্তা দিলাম না। কথায় বলে যেখানে দেখিবে ছাই উড়াইয়া .‌.‌.‌ ‌ইত্যাদি। তবে ছাই নয়, কপালে এল গরম ধোঁয়া ওঠা কচুরি। দোকানে আমরা যে কচুরি খাই, তা বাতাসার বড়দা।

তবে এ কচুরির জাতই আলাদা। ময়দা–পুরের কিপটেমি নেই। যত্ন করে ফুলো ফুলো ভাজা। লুচি বা কচুরির ব্যাপারে আমি চরম উন্নাসিক। মা–র হাতে ছাড়া খুব কম লোকের লুচি বা কচুরিকে আমি লেটার মার্কস দিই (‌চাইলে একদিন নেমন্তন্ন করে পরীক্ষা প্রার্থনীয়)‌ তবে এ কচুরি শুধু লেটারই পায়নি, বলা ভাল, নব্বইয়ের ঘরে নাম্বার তুলেছে। সঙ্গে নারকেল দেওয়া ছোলার ডাল— আহা যেন ভানুর সঙ্গে জহর। আর পরিবেশন?‌ হাতা দিয়ে ডাল তোলার আগে থেকে ‘‌আর একটু দিই’‌ বলে ভণিতা নেই। যাতে আপনি ‘‌না না লাগবে না’‌ বলার যথেষ্ট সময় পান। বরং কচুরি বা ডাল এনে পাতের থেকে সাড়ে তিন মাইক্রন ওপরে ঝোলানো হবে। তবে বলা হবে, আর একটু দিই। না আপনি বলতেই পারবেন না
অফিস থেকে গিয়েছিলাম। বেশির ভাগ দিনই আমি লাঞ্চ করার সময় পাই না। আজও সেরকমই অবস্থা ছিল।
ক্রিস গেইলকে ফুলটস বল আর ক্ষুধার্ত আমাকে কচুরির লোভ দেখালে কী হয়, সে গল্প পরে একদিন বলব।

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com