আলো নিভলো লাইট কনফেকশনারীর

  •  
  •  
  •  
  •  
  • 0
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ইরাজ আহমেদ

সেদিন বিশেষ প্রয়োজনে নিউমার্কেটে গিয়ে আবিষ্কার করলাম লাইট কনফেকশনারী উঠে গেছে। বুকের ভেতরে কোথায় যেন বেদনার হাওয়া ঘুরে গেলো। একদা এই নগরীর নাগরিকদের কেনাকাটার অন্যতম জায়গা ছিলো নিউমার্কেট। তখন চারদিকে এতো আলো ঝলমল করা, ঝকঝকে শপিং কমপ্লেক্স আর ডিপার্টমেন্ট স্টোর গড়ে ওঠেনি।নিউমার্কেট শৈশব কাল থেকেই ছিলো আমাদের কাছে এক স্বপ্নপুরী। মনে আছে, বছর চল্লিশেক আগে সপ্তাহের ছুটির দিনে বাড়ির লোকজন কেনাকাটার জন্য যেতো নিউমার্কেটে, সঙ্গে বেড়ানো। দেয়াল ঘেরা বিশাল এই বিপনী বিতান তখন সত্যিই এতো ছিমছাম এক জায়গা ছিলো যে মানুষ ইচ্ছে করলে সেখানে ঘন্টার পর ঘন্টা সময় কাটাতে পারতো।
সেই নিউমার্কেটেই ছিলো লাইট কনফেকশনারী। রুটি, বিস্কিট, লোভনীয় চেহারার পেস্ট্রি থরে থরে সাজানো থাকতো কাচের আলমারিতে। আর এসবের সঙ্গে থাকতো ত্রিকোন প্যাটিস। ওদের একটা লোহার তৈরী মিটসেফ জাতীয় বস্তু ছিলো। দরজার ওপর কাচ আঁটা।ওটার ভেতরে্ লোহার ট্রেতে সাজানো থাকতো প্যাটিস। তখন প্যাটিস গরম রাখার জন্য এ ধরণের আলমারির তলায় কয়লা রাখা হতো। ভেতরে বাল্ব জ্বলতো। বাতির উত্তাপও প্যাটিস গরম রাখার একটা কৌশল ছিলো। নিউমার্কেটে গেলে এই প্যাটিস আর কাঁচের বোতলে ভরা কোকাকোলা ছিলো সেই শৈশবে এক অমোঘ আকর্ষণ। ওই দোকানে আরেকটি মজার খাবার পাওয়া যেতো। লাল, নীল, হালকা হলুদ রঙের নকশা করা কাগজে জড়ানো ছোট্ট এক টুকরো কেক। এই আধুনিক সময়ে এ ধরণের কেককে আদর করে ডাকা হয় মাফিন। আমার শৈশবে এতো নামের আমদানী হয়নি। জানার সীমানা ছিলো সংকুচিত। ওই বিশেষ কেকের নাম যে কী ছিলো এখন আর মনে নেই। তবে লাইট কনফেকশনারীতে বহু বছর ধরে এই কেকটি পাওয়া যেতো।
আমি শৈশবের খোঁজে ওই দোকানে প্রায়ই যেতাম।বহুদিন একা একাই সেই প্যাটিস আর কোক খেয়ে ফিরে এসেছি। দোকানটায় আমি বেশী গেছি বাবার সঙ্গে। সেইসব ছুটির দিনের আলোমাখা সকালে নিউমার্কেটে চুল কাটা, বই কেনা আর শেষে লাইট বেকারীর প্যাটিস খাওয়া ছিলো জীবনে ভীষণ এক ভালো লাগার সময়। মাঝে মাঝে স্মৃতির গন্ধ বুক ভরে নিতে যেতাম লাইটে। এবার গিয়ে দেখলাম লাইটের আলো নিভে গেছে।
নিউমার্কেটে এমনি আরেক দোকান ছি

লো নভেলটি।ছোট্ট আইসক্রিম পার্লার ও রেস্তোরাঁ। দোকানের ভেতরে একটা কাঠের সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় ওঠা যেতো। শৈশবে সেই সিঁড়িটা ছিলো গভীর আকর্ষণের কেন্দ্র। ওই রেস্তোরাঁয় একদা এই শহরের খ্যাতিমান কবি ও সাহিত্যিকরা আড্ডা দিতেন।পিতার কল্যাণে তাদেরকেও দু একবার দেখেছি ওই রেস্তোরাঁয়। নভেলটি উঠে গেছে আরো আগে।নিউমার্কেটের বারান্দায় আর খুঁজে পাই না সেই ছোট্ট জর্দার দোকানটিকে। একটা স্ট্যান্ডের ওপর কাঁচের বোয়ামে সাজানো থাকতো নানা রঙের, নানা ধরণের জর্দা। পান বিলাসী মানুষরা ভাস্কো দা গামার মতো ঠিক খুঁজে বের করে ফেলতেন সেই জর্দার দোকান। জর্দার মিঠেকড়া গন্ধে আচ্ছন্ন হয়ে থাকতো বারান্দার ওই জায়গাটা। নানা ধরণের জর্দা মেশানোর কাজটাও চলতো দোকানের সামনেই। বিক্রেতা মানুষটির ছোট্ট একটা দাঁড়িপাল্লা ছিলো। পেতলের তৈরী। সেখানেই নেয়া হতো তোলা হিসেবে জর্দার মাপ। সেই জর্দার গন্ধ আমি আজো নিউমার্কেটে গেলে বাতাসে নাক টেনে খুঁজি।
এই অমোঘ যাবার সময় কতকিছু যে খসে পড়ে জীবনের ছায়াপথ থেকে নক্ষত্রের মতো। স্মৃতি ছাই হয়ে যায় ভাবনার সরণীতেই। অসহায় তবু হাতড়ে খুঁজি স্মৃতির ভেলা। খুঁজি কোনোদিন আর ফিরে পাওয়া যাবে না জেনেও।

ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com