আলো ঝলমল রাতের মারাকেশ

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

নিজামুল হক বিপুল

বিশ্ব জলবাযু সম্মেলন কাভার করতে গত পাঁচ বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, লাতিন আমেরিক, আফ্রিকার একাধিক দেশ ঘুরে বেড়ানোর কল্যাণে নিজের জানার, শোনার, বুঝার পরিধিটাকে বিস্তৃীত করার সুযোগ হাত ছাড়া করিনি। এবার বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন কাভার করতে যাবার সুযোগ হয়েছে সাহারা মরুভূমির দেশ আফ্রিকার মরক্কোতে। এটলাস রক এর পাদদেশে মরক্কোর পর্যটন নগরী মারাকেশেই ছিল আমাদের অবস্থান। মারাকেশ শুধু পর্যটন নগরীই নয়, এর মূল ভিত্তি হচ্ছে এটি ঐতিহাসিক শহর। অনেক ঐতিহাসিক স্থাপনার কারণে এখানে বছর জুড়েই উপস্থিতি থাকে পর্যটকদের। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে পর্যটকরা ভিড় করেন মারাকেশে। ইউরোপ আমেরিকার পাশাপাশি এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকেও পর্যটকদের বিচরণ ঘটে আটলান্টিক পাড়ের দেশটিতে।
আমি বরাবরই ঘুরতে পছন্দ করি। গত বছর পাঁচেক ধরে যে দেশের বাইরে যাচ্ছি তাতে আমার এই ঘুরাঘুরিতে নতুন একটি বিষয় যুক্ত হয়েছে। আর সেটা হচ্ছে যে দেশে যাই সেই দেশের কৃষ্টি-কালচার-সংস্কৃতির সঙ্গে একটু পরিচিত হওয়া। রাখঢাক না রেখেই বলি, আমি সংশি¬¬ষ্ট দেশের নাইট ক্লাব, ডান্সক্লাব, ক্যাসিনো এসবের সাথে পরিচিত হতে চাই। এক্ষেত্রে আমার সঙ্গি আরেক সাংবাদিক বন্ধু স্নেহভাজন মাসুদ উল হক। এসব বিষয়ে তার আর আমার মধ্যে রসায়নটা খুবই দুর্দান্ত। গত পাঁচ বছর ধরে সেরকমই দেখছি।
অন্যান্যবারের মত এবারও মারাকেশ সম্মেলনে যোগ দিয়ে (বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন) আমরা প্রতিদিন নিজের কাজ শেষ করে বের হয়ে যেতাম শহর ঘুরতে। প্রতিদিনই তারিখ করি পর্যটন শহর মারাকেশের ডান্সক্লাব বা নাইট ক্লাবে যাবো। মুসলিম প্রধান দেশটির এই সংস্কৃতিটি কেমন? তা জানতেই আমাদের এই চিন্তা। কারণ ইউরোপ বা লাতিন আমেরিকার দেশে এই সংস্কৃতি দেখেছি। দেখেছি মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কাতারেও। কিন্তু আফ্রিকার দেশ মরক্কোতে নাইট ক্লাব বা ডান্স ক্লাবের ভিতরের চিত্রটা কেমন- তা না দেখলে অপূর্ণতা থেকে যাবে। আর কোন বিষয়ে জানার আগ্রহ থাকার পরও সেটা না জানার অপূর্ণতা সারাজীবন হয়তো আফসোস হয়েই থাকবে। এ কারণে এসব বিষয়ে কখনই সুযোগ হাতছাড়া করার পাত্র নই আমি।
দিনটি ছিল শনিবার। পরের দিন সাপ্তাহিক ছুটি। সঙ্গত কারণেই শনিবার রাতেই বেশি জমে মারাকেশের নাইট ক্লাব, ডান্স ক্লাব। তাই শনিবার রাত সাড়ে ন’টার দিকে আমরা রাতের খাবার শেষ করে আমাদের হোটেল রুমে গেলাম। হোটেল সেন্ট্রাল প্যালেস এর ব্যবস্থাপক হাসানকে আমাদের ইচ্ছার কথা জানাতেই তিনি আমাদের আগ্রহটাকে দারুণ উপভোগ করলেন এবং মারাকেশ শহরের একটি ম্যাপ হাতে নিলেন। টেবিলে মেলে ধরে শহরের দু’টি অংশ দেখিয়ে বললেন, এটি হচ্ছে নতুন শহর আর এটি হচ্ছে পুরনো শহর। চারটি স্পট দেখিয়ে বললেন, এই শহরে চারটি নাইট ক্লাব বা ডান্স ক্লাব আছে। তিনটি পাশাপাশি। একটি দূরে। তবে ‘ত্রেতত্রো’ হচ্ছে এই শহরের সবচেয়ে আকর্ষনীয় ক্লাব। তার কাছ থেকে একটা ধারণা নিয়ে আমরা দু’জন বের হয়ে পড়লাম মারাকেশের রাতের সংস্কৃতি জানতে এবং দেখতে।
হোটেল থেকে বের হয়ে একটি ট্যাক্সি ক্যাব নিয়ে রওয়ানা হলাম ‘ত্রেতত্রো’ নামের নাইট ক্লাবের সন্ধানে। মিনিট পনেরোর মধ্যে আমরা যখন ত্রেতত্রো’তে পৌঁছলাম তখনও ক্লাবের ফটক খুলেনি। ত্রেতত্রো হচ্ছে মারাকেশ শহরের পাঁচ তারকা হোটেল এস সাদি এর একটি অংশ। ত্রেতত্রো’র নাইট ক্লাবের আরেক অংশে হচ্ছে বিশাল ক্যাসিনো। দীর্ঘদেহী সুদর্শন এবং সশস্ত্র নিরাপত্তাকর্মীরা জানালেন, রাত ১২টায় ক্লাবের ফটক খুলবে। কিন্তু ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম নির্ধারিত সময় আসতে কমপক্ষে আরও দেড় ঘণ্টা বাকি। নিরাপত্তাকর্মীরা আমাদের বললেন, আপনারা ক্যাসিনো’তে অপেক্ষা করতে পারেন। অগত্যা কি আর করা। সুযোগ হাতছাড়া না করে আমরা ঢুকে পড়লাম মারাকেশ শহরের সবচেয়ে বড় ক্যাসিনো’তে।
ক্যাসিনো’তে ঘুরে ঘুরে একটার পর একটা বোর্ড দেখছিলাম। সবগুলো বোর্ডে চলছে জমজমাট খেলা। কোথায়ও তরুণ-তরুণী আবার কোথায়ও মধ্যবয়সী থেকে শুরু করে পঞ্চাশোর্ধরা খেলায় অংশ নিচ্ছে। এক সুদর্শনা তরুণী তো সঙ্গী যুবককে সাথে করে বিয়ারের গ্ল¬াস হাতে নিয়ে কখনও এই বোর্ডে আবার কখনও ওই বোর্ডে দান মারছেন। কিন্তু জয়ের হাসি দেখা যাচ্ছে না তাদের চোখে-মুখে।
আবার এক যুবককে দেখলাম সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে কিছুক্ষণ পর পর হঠাৎ দান মারেন তো হাসি মুখে ফিরে যান। কোন কোন বোর্ড জুড়ে তো পাকা খেলোয়াদের উপচে পড়া ভিড়। নিজেরা খেলতে না পারলেও ত্রেতত্রো’র ক্যাসিনোতে ঢুকে আমরা বেশ উপভোগ্য সময়টা কাটাচ্ছিলাম। একই সঙ্গে ভাবছিলাম জুয়ার দুনিয়ায় এক রাতেই কত শত কোটি টাকা হাওয়ায় উড়ে যায়। চোখের সামনেই কেউ ফকির হয়ে বের হয়, আবার কেউ কাড়ি কাড়ি টাকা নিয়ে ক্যাসিনো থেকে দিব্যি হাসিমুখে বের হয়ে যাচ্ছে।
যাকগে ক্যাসিনোতে দেড় ঘণ্টা সময় পার করে ঘঁড়ির কাঁটায় স্থানীয় সময় রাত ১২টা বাজতেই আমরা বের হয়ে গেলাম ক্যাসিনো থেকে। গন্তব্য নাইট ক্লাব। স্থানীয় মুদ্রায় ১০০ দেরহাম করে (বাংলাদেশী টাকায় প্রায় ৯০০ টাকা) মোট দুই শত দেরহাম পরিশোধ করে আমরা প্রবেশ করলাম ত্রেতত্রো’তে। মারাকেশের রাতের সংস্কৃতি দেখতে। ভিতরে প্রবেশ করেই মূল মঞ্চের একেবারে সামনে একটি সোফায় বসলাম আমরা। পাশের সিটে ভিনদেশী দুই ললনা দিব্যি সিগারেট ফুঁকছেন। সঙ্গে পানীয়। পাশাপাশি সিটে বসায় পরিচয় হতে সময় লাগলো না। প্যান্ট-শার্ট পরিহিত এই দুই ললনার একজন গাব্রিয়ালা, অন্যজন লাওরা। তারা ইতালীর রোম শহরের বাসিন্দা। কর্মসূত্রে মারাকেশে বসবাস। তাদের সাথে কথোপোকথনের মধ্যেই লক্ষ্য করলাম মিনিট দশ-পনেরোর মধ্যে ধীরে ধীরে জোড়ায় জোড়ায় তরুন-তরুণী ঢুকছেন ত্রেতত্রো’র আলো-আঁধারির মধ্যে।
আমরা যখন সিগারেটের সাথে পানীয় পান আর গল্পে মগ্ন তখনই এক তরুণী এসে একটি গিফট এর অফার করলেন। বললেন, স্যার এক প্যাকেট উইংসটন সিগারেট কিনলে আপনাকে একটা গিফট দেয়া হবে। প্রথমে এই অফার ফিরিয়ে দিলেও রাত গভীর হতেই সেই তরুণীকে খুঁজে বের করে এক প্যাকেট সিগারেট সঙ্গে গিফট হিসেবে একটি লাইটার সংগ্রহ করলাম।
এরই মধ্যে লক্ষ্য করলাম, পরিপূর্ণ হয়ে গেছে পুরো হল রুম। অর্ধনগ্ন সুন্দরী তরুণ, যুবতী আর তরুণ-যুবকদের উপস্থিতিতে সরগরম পুরো ক্লাব। মোমবাতি জ্বালিয়ে তুমুল উচ্ছাস প্রকাশের মধ্য দিয়ে শুরু হয়ে গেল ডিজে পার্টি, শারিরীক কসরত, ডান্স, নানা রকম বিনোদন আর হইহুল্লোড়।
মিউজিকের তালে তালে মঞ্চ মাতিয়ে রাখছেন ডিজে ডান্সাররা। ডিজে’র ফাঁকে ফাঁকে বিরতি দিয়ে দিয়েই চলছে শারিরীক কসরত। তাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অর্ডিয়েন্স জুড়ে চলছে স্বল্প বসনার তরুণী-যুবতীদের নানা রং ঢং এর ডান্স। পিছিয়ে নেই তরুণ-যুবকরাও। এই ডান্সের মধ্যেই তরুণ-তরুণরা তাদের পছন্দের সঙ্গীকে নিয়ে ডান্স আর পানে মশগুল। কিছুক্ষণ পর পরই ওলে…ওলে…ওলে…ওলেলেলেলে… শব্দে প্রকম্পিত হচ্ছে পুরো ক্লাব। বিরতিহীনভাবে চলতে থাকা ডিজে ডান্সের মধ্যেই নাইট ক্লাবে সময় কাটাতে আসা তরুণ-তরুণীরা পাল্লা দিয়ে ঢোক ঢোক করে গিলছেন বিয়ার, শ্যাম্পেইনসহ নিজেদের পছন্দের পানীয়। আমরা ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম, আবার কখনও কখনও ওলে ওলে সুরের সাথে ডান্সের চেষ্টা করছিলাম। তবে সেই চেষ্টা বড়ই বেমানান…।
২০-২২ বছর বয়সী এক তরুণীর ডান্স তো অনেককেই মুগ্ধ করেছে। তার ডান্স দেখে মনে হল এ যেন মৃগি রোগী। মৃগি রোগীদের মতই সেই ডান্স করে যাচ্ছে। মারাকেশের ওই তরুণী এক জায়গায় দাঁড়িয়েই প্রায় তিন-চার ঘণ্টা ধরে অবিরাম ডান্স করে যাচ্ছিল। তার সঙ্গে থাকা অপর তরুণীরা তাকে সঙ্গ দিচ্ছিল।
মারাকেশের নাইটক্লাবগুলোতে যেসব ললনারা মানুষকে বিনোদন দিতে আসে তাদের একটা বড় অংশই মারাকেশের বাইরের কোন শহরের কিংবা ভিন দেশের। বিশেষ করে ফ্রান্স, স্পেন, ইতালী, সেনেগাল থেকে আসা। আছে মরক্কোর বাণিজ্যিক রাজধানী কাসব্লাংকার তরুণীরাও। এদের একটা অংশ আবার ব্যস্ত থাকে শিকারে। কোন তরুণ বা যুবককে পছন্দ হলেই তাকে ওই রাতের জন্য সঙ্গী হিসেবে পেতে মরিয়া হয়ে উঠে। নানাভাবে পটানোর চেষ্টা করে। তবে একটু সাবধান থাকলেই এসব ঝক্কিঝামেলা এড়ানো যায়।
ঘড়ির কাটায় ভোর রাত পাঁচটায় থেমে গেল ত্রেতত্রো’র বিনোদন। মুহুর্তেই ফাঁকা হয়ে গেল পুরো ক্লাব। যে যার মত করে বের হয়ে গেলেন। আমরাও মারাকাশের রাতের নাইটক্লাবের ডান্স আর বাড়তি হিসেবে পাওয়া ক্যাসিনোর জুয়া খেলা দেখে হাঁটতে শুরু করলাম হোটেলের দিকে। মিনিট পনেরোর হাঁটা পথ অতিক্রম করে হোটেলে ঢুকেই দিলাম দিব্যি একটা ঘুম।

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com