আলবেয়ার ক্যামু স্ট্রেঞ্জার লিখেছিলেন হোটেলে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

হোটেলের বারান্দায় ক্যামু

ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিস থেকে খানিকটা দূরে ছোট্ট জায়গা র‌্যু র‌্যাভিগনন। শহরই বলা যায়, না বললেও ক্ষতি নেই। সেখানে ১৯৪০ সালের মার্চ মাসে তখনকার অখ্যাত এক হোটেল ‘ম মার্তি’। হোটেলের নির্জন ঘরে বসে লিখছেন প্রখ্যাত সাহিত্যিক আলবেয়ার ক্যামু। লিখছেন তাঁর বিশ্বখ্যাত উপন্যাস ‘স্ট্রেঞ্জার’-এর খসড়া।
বাংলা ভাষাতেও ‘আগন্তুক’ নামে বহুবার অনূদিত হয়েছে এই উপন্যাসটি। অ্যাবসার্ডিটি, জীবনের প্রয়োজনহীন, অর্থহীন প্রবাহ-ই উপন্যাসটির মূল উপজীব্য। চল্লিশ-এর দশকে উপন্যাসটি প্রকাশিত হবার পর বিশ্ব সাহিত্যে হৈ চৈ পড়ে যায়। একেবারে নতুন এক চিন্তাকে ক্যামু পাঠকদের সামনে এসে হাজির করলেন। অনেকটা বলা যেতে পারে, অচেনা আয়নার সামনে তিনি দাঁড় করিয়ে দিয়েছিলেন পাঠকদের। সবাই চমকে উঠেছিল সেই আয়নায় নিজের আরও বেশী অচেনা অবয়ব দেখে।
সময়টা বড় অশান্ত তখন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগুন জ্বলে উঠেছে পৃথিবী জুড়ে। ইউরোপ জুড়ে অস্থিরতা আর অশান্তি তাড়া করে ফিরছে মানুষকে। তখনও জার্মান অনুপ্রবেশ ঘটেনি ফ্রান্সে। ক্যামু লিখে চলেছেন অগ্নিগর্ভ এক পরিস্থিতির মধ্যে বসে। ১৯৪০ সালের মার্চ থেকে মে মাস। আঙুল গুনে দেখলে দেখা যাবে এই সময়ের অল্প কিছুদিনের মধ্যেই হিটলারের নাজি বাহিনী দামামা বাজিয়ে ঢুকে পড়েছিল ফ্রান্সে।
‘ম মার্তে’ হোটেলের আগের নাম ছিল হোটেল দ্যু পরেয়ার। পাহাড়ের ওপরে নির্জন হোটেল আর তখনও সেখানকার চমৎকার হাওয়া ক্যামুকে হয়তো অনুপ্রাণিত করেছিল লেখাটা লিখে ফেলতে। মাত্র তিন মাসের মধ্যেই অবিশ্বাস্য গতিতে লেখা হয়ে যায় ‘স্ট্রেঞ্জার’’ উপন্যাসের খসড়া। ছোট্ট শহরটি তখনও অস্বাভাবিক ভাবে শান্ত এক সময়ের মধ্যে অলস দিন কাটাচ্ছে।
ক্যামুর হোটেল ঘরের লাগোয়া একটা ছোট্ট্ বারান্দা। সেখানে বসে দেখা যেত রাস্তার মাথায় ছোট্ট একটি ফোয়ারা। হোটেলের ঠিক উল্টো দিকেই ছিল ‘ব্যঁতো ল্যাভিয়র’ নামে একটি স্টুডিও। এখানে বসেই ১৯০৭ সালে পিকাসো এঁকেছিলেন তার বিখ্যাত ছবি ‘লা ডেমিসেলিস দ্য আভিগনোনিন’।অবশ্য এই স্টুডিওর গৌরবকাল শেষ হয়ে যায প্রথম বিশ্বযুদ্ধের হাত ধরে। কিন্তু ১৯৪০-এ ক্যামু যখন সেই হোটেলে বসে লিখে চলেছেন তখনও ওই ছোট্ট শহরটি নিজের মতো করে বেঁচে ছিল। রাস্তায়, বেশ্যাদের ভীড়, ঘুরছে চারপাশে দালাল, জমা হচ্ছে সন্ত্রাসী। তখন কবিদেরও সেই শহরে দেখা যেত। মোট কথা, প্যারিসের ভিড়-ভাট্টা থেকে দূরে।
ক্যামু কিন্তু ওই শহরে খুব আনন্দিত ছিলেন না। তখনও যক্ষা রোগ তার পিছু ছাড়েনি। পুরোপুরি সুস্থ নন তিনি। তারওপর প্রতিদিন ট্রেনে চেপে তাঁকে যেতে হতো ওই শহর থেকে বেশ অনেকটা দূরে নিজের কাজের জায়গায়। ক্যামু তখন একটি দৈনিক পত্রিকা ‘প্যারিস সোইয়ার’-এ কাজ করছেন। প্রতিদিন ঘিড়ি ধরে পাঁচ ঘন্টা ক্যামু কাজ করতেন পত্রিকায়। সেখানে ৪র্থ পাতা সম্পাদনার দায়িত্বে ছিলেন তিনি। তারপর দীর্ঘ পথ পার হয়ে হোটেলে সেই নিঃসঙ্গ চেয়ার আর টেবিলের কাছে ফিরে আসা। অসমাপ্ত লেখা নিয়ে কাজ শুরু করা। বলা যেতেই পারে নিজের নিজের বাড়ি ছেড়ে অনেকটা দূরে এসে অসুখী জীবন

হোটেলে ম মার্তে

হোটেলে ম মার্তে

যাপন করছিলেন তিনি। পরে নিজের দিনলিপিতে এই নৈঃসঙ্গের কথা উল্লেখ করেছিলেন তিনি। তিনি লিখেছেন এভাবে ‘আচমকা একটি অচেনা এবং প্রায় অন্ধকারাচ্ছন্ন ঘরে ঘুম ভেঙ্গে জেগে ওঠা কী অর্থ বহন করে? চারপাশে শহরের সব শব্দ, জীবনের চলমান স্রোত আচমকাই আমার কাছে গভীর অর্থহীনতা নিয়ে ধরা দেয়। সবকিছু বড় অদ্ভূত ঠেকে, ভীষণ অদ্ভূত। আমি কী করছি এখানে? কোথাও গিয়ে আমার এই অর্ন্তগত রক্তক্ষরণ ভাগ করে নেয়ার একজন সঙ্গী নেই। পৃথিবী ক্রমশ আমার কাছে এক অচেনা বিচরণ ক্ষেত্রে পরিণত হচ্ছে যেখানে আমার নিঃসঙ্গ আত্না কোনকিছুর ওপর আর নির্ভর করতে পারছে না ’
নিজের চারপাশে অদৃশ্য নিঃসঙ্গতার চাপ ক্যামু বহন করতে পারছিলেন েনা সেটা তার ডায়েরি পড়লেই স্পষ্ট উপলব্ধি করা যায়। কিন্তু এই শূণ্যতার অনুভূতি তাকে দিয়ে যে ‘আগন্তুক’ উপন্যাসটি লিখিয়ে নিচ্ছিলো সে কথা বলা যায় সহজেই। তিনি দিনলিপির আরেক জায়গায় লিখেছেন ‘এই নৈঃসঙ্গের উপার্জন দুটি বিষয়। এক হচ্ছে, নৈঃশব্দ, অন্যটি সৃষ্টিশীলতা।’ ক্যামু‘র ভাষায়, লেখার সময় হোটেলের জানালা দিয়ে বিচিত্র সব ঘটনা তিনি প্রত্যক্ষ করতেন। সেসব ঘটনাকে তিনি ‘জীবনের নাটক’ বলেই আখ্যায়িত করেছেন। দিনলিপিতে তিনি এসব বিচিত্র ঘটনা আর বিচিত্র মানুষদের কথা লিখে গেছেন। রাস্তায় ফেরিওয়ালা, তাদের হাঁকডাক, শহরের আকাশে বৃষ্টির মেঘ, জানালার ফ্রেমে জমে থাকা ধোঁয়ার মতো কুয়াশা,বাজার এলাকার ভীড়-এসব কিছুই তাঁর দিনলিপির পাতায় উল্লেখ করা আছে।
সেই নিঃসঙ্গ হোটেল ঘরে বসে ক্যামু শেষ করেন প্রায় ৩০ হাজার শব্দে লেখা ‘স্ট্রেঞ্জার’ উপন্যাসের প্রথম খসড়া। ক্যামু এতো দ্রুত লেখা শেষ করে নিজেই কিছুটা বিষ্মিত হয়ে গিয়েছিলেন। প্রথম উপন্যাস ‘এ হ্যাপি ডেথ’ শেষ করতে তার প্রায় এক বছর সময় লেগে গিয়েছিল। তবে লেখা শেষ করার পরেও নিশ্চিত হতে পারেননি তিনি। বারবার মনের মধ্যে তখন ঘুরে বেড়াচ্ছে একটিই প্রশ্ন-লেখাটা মান সম্পন্ন হলো কি?
১৯৪০ সালের ৪ জুন ক্যামু লেখাপত্র গুটিয়ে ওই হোটেল থেকে সোজা চলে আসেন প্যারিসে।এর ঠিক দশ দিন পরে হিটলারের নাজি বাহিনী প্রবেশ করে প্যারিসে। ক্যামু হোটেলের জানালায় দাঁড়িয়ে দেখেন লক্ষ লক্ষ মানুষের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার দৃশ্য।
এরপরের গল্প অন্যরকম। অধিকৃত প্যারিস ছেড়ে ক্যামু কিছুদিনের জন্য চলে যান জন্মভূমি আলজেরিয়ায়। তারপর আবার ফ্রান্সে ফিরে আসেন ফরাসী প্রতিরোধ বাহিনীর লড়াইয়ে যোগ দিতে। এই প্রতিরোধ বাহিনীর পত্রিকা ‘কমব্যাট’-এর সম্পাদক পদে নিযুক্ত হন আলবেয়ার ক্যামু।
ক্যামুর জন্যই রু র‌্যাভিগনন শহর এখন পর্যটকদের কাছে দর্শনীয় জায়গা। প্রতি বছর ক্যামুর স্মৃতিচিহ্ন দেখার জন্য পৃথিবীর নানা দেশের সাহিত্যপ্রেমী মানুষ এই শহরে ভীড় করেন এখন।
ক্যামু ছিলেন ফরাসী বংশদ্ভূত আলজেরীয় লেখক। কথাসাহিত্য দিয়ে সূচনা হলেও পরবর্তী সময়ে দর্শনের ওপরও তিনি বই লেখেন। ‘মিথ অফ সিসিফাস’, ‘দা রেবেল’ এর মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য। ১৯৬০ সালের ৪ জানুয়ারী ফ্রান্সে এক সড়ক দূর্ঘটনায় তার মৃত্যু হয়। ১৯৫৭ সালে তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com