আর কোনদিনও গাইবে না “হলুদ গাঁদার ফুল’’

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শিলা চৌধুরী

(কলকাতা থেকে): আমি তখন সাংবাদিকতা নিয়ে স্নাতক পড়ছি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে নেতাজী নগর কলেজে সান্ধ্য বিভাগে।কলেজে কোন ছাত্রী আবাসন ছিল না ।আর অন্য একটা দেশ থেকে এসে ।জীবনের প্রথম দেশের বাইরে অভিবাবকহীন ।কোথাও বাড়ি ভাড়া পাচ্ছিলাম না এমনকি পেয়িং গেস্ট হিসেবে ও না। শেষ ক্লাস শুরু হতো রাত নটা চল্লিশ মিনিটে। কোথায় থাকবো সেই দুশ্চিন্তায় কতোবার ভেবেছিলাম দেশে ফিরে যাবো।তখন কলকাতার বাংলাদেশের উপ দূতাবাসের নানা অনুষ্ঠানের স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করতাম ।উনিশ ছিয়ানব্বই খৃষ্টাব্দের বিজয় দিবসে ও সে সুযোগ পেয়েছিলাম আর সেই অনুষ্ঠানেই প্রথম পরিচয় সবিতা চৌধুরী কাকিমার সঙ্গে। আমার কলকাতায় থাকা নিয়ে দুরবস্থার কথা শুনে সবিতা কাকিমা বল্লেন আমার দুই মেয়ের সঙ্গে থাকতে তোর অসুবিধা হবে না তো।প্রথমে বুঝতে পারিনি কি বলেছেন উনি।

সবিতা চৌধুরী

অন্তরা দি পাশে থেকে বললো, সঞ্চারী একটু অসুস্থ দুর্ঘটনায় পায়ের হাঁড় মারাত্মক ভাবে জখম হওয়ার ফলে পায়ে অপারেশন করে প্লেট বসিয়েছে , হাঁটতে পারে না।সবিতা কাকিমা সঞ্চারীকে নিয়ে খুব দুশ্চিন্তায় ।তারপর ও নিজেদের সমস্যার কথা না ভেবেই অচেনা আমাকে নিজের বাড়িতে নিজের মেয়েদের সঙ্গে ভালোবাসা আর স্নেহে আশ্রয় দিয়েছেন।কতো বড়ো উদার আর ভালোবাসায় পূর্ণ একজন মানুষ ছিলেন নিজে বিখ্যাত সঙ্গীত বিশারদ পন্ডিত সলিল চৌধুরীর সহধর্মিণীই শুধুমাত্র নন নিজেও বিখ্যাত সঙ্গীত শিল্পী হিসেবে থেকেও।একটা কথাই শুধু আমায় বলেছিলেন তোর সলিল কাকু যদি আমার জায়গায় থাকতো সে-ও তাই করতো।

সলিল চৌধুরী ও মান্না দে‘র সঙ্গে

গতকাল মধ্যরাতে সবিতা চৌধুরী কাকিমা চলে গেলেন ওনার কন্ঠের সুরের সুধা নিয়ে পরপারে।আমাকে চিরকালের মতো ঋণের বোঝা মাথায় চাপিয়ে ওনার অমূল্য ভালোবাসার ঋণ শোধরানোর আগেই ।খুব ভোরে টিভিতে সংবাদ টা দেখেই চোখ ঝাপসা হয়ে গিয়েছে ।স্বজন-শূন্য হয়ে যাচ্ছি এক এক করে ।বয়স হয়েছিল ৭২ বছর। বুধবার রাত দুটো নাগাদ বাড়িতেই তাঁর জীবনাবসান হয়।জানুয়ারিতে সবিতা কাকিমার ফুসফুস ও থাইরয়েডে ক্যান্সার ধরা পড়ে। প্রথমে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়া হয় মুম্বাই। মে মাসে তাঁকে কলকাতায় আনা হয়।কাকিমার ইচ্ছেতেই অন্তরাদির কাছে তারপর থেকে বাড়িতেই চলছিল চিকিৎসা। আজই তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে।

১৯৪৫ সালে জন্ম সবিতা চৌধুরীর। সলিল চৌধুরীর স্ত্রী হিসেবে নয়, সঙ্গীত জগতে নিজের আলাদা পরিচিতি তৈরি করেছিলেন সবিতা। তাঁর গাওয়া বেশ কয়েকটি আধুনিক গান কয়েক দশক ধরে জনপ্রিয়। হিন্দি-বাংলা ছবিতে প্লে-ব্যাক গায়িকা হিসেবে কাজ করেছেন। সলিল চৌধুরীর কথা ও সুরেও তাঁর বেশ কয়েকটি হিট গান রয়েছে। সলিল-সবিতার চার সন্তান, অন্তরা, সঞ্চারী, সঞ্জয় ও ববি।বাংলার বাইরে থাকতেন আর বড়ও হয়েছিলেন সবিতা চৌধুরী কাকিমা বাইরেই। তাই বাংলা তেমন ভালো জানতেন না।

সলিল চৌধুরী ও সবিতা চৌধুরী

কথাবার্তা বলতে পারতেন। কিন্তু ওটুকুই। তাঁকে বাংলাভাষার সঙ্গে পরিচয় করিয়েছিলেন সলিল চৌধুরী।কিন্তু যখন গানের জগতে এলেন, বাংলায় গান গাইতে হবে। তখন তাঁকে বাংলা শেখাতে শুরু করেন সলিল চৌধুরী। নাহলে আগে তো তিনি বাংলা গান হিন্দিতে লিখে গাইতেন। মানে ভাষা ছিল বাংলা। কিন্তু অক্ষর ছিল হিন্দি। যখনই রেকর্ডিং থাকতো, খুবই সমস্যায় পড়তেন কাকিমা । কারণ, তাঁর গান ঠিক হতো সবার শেষে। যখন তিনি স্টুডিওতে যেতেন, দেখতেন সলিল চৌধুরী তখন হারমোনিয়াম নিয়ে বসে গান ঠিক করছেন। স্টুডিতে গিয়েই সবিতা চৌধুরী গানের সুর পেতেন, কথা পেতেন। শুধু তাই নয়। সবিতা চৌধুরীর গান তোলা থেকে প্র্যাকটিস, সবই হতো রান্না করতে করতে। সলিল চৌধুরী বলতেন, ভালো শিল্পী হতে গেলে ভালো রান্না জানতে হবে। তাই একদিকে সবিতা রান্না করতেন, অন্যদিকে কম্পোজিশনে বসতেন সলিল। এভাবেই চলত গান বাঁধা।আজকেই সেই আমার সবিতা চৌধুরী কাকিমার শেষকৃত্য ,হারিয়ে যাবে শ্মশানেই একটা যুগের সংগীতের পূজারীর কন্ঠ, এই কন্ঠ আর কোনদিনও গাইবে না “হলুদ গাঁদার ফুল. …”

ছবিঃ গুগল

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com