আমি চাই আসল সত্যটা বের হোক-সামিরা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

‘ইমনের (সালমান শাহ) কথা ভেবেই আমাকে যেসব অপবাদ দেয়া হয়েছে সেসব নিয়ে কখনো প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করিনি। কোন কথাও বলিনি।তবে বারবার তদন্ত হয়েছে সালমানের মৃত্যু রহস্য নিয়ে। আমাকে তলব করা হয়েছে। আমি গোয়েন্দা, পুলিশের কাছে জবানবন্দি দিয়েছি। সবার জিজ্ঞাসাবাদের উত্তরে স্পষ্ট করেই সব কথা জানিয়েছি।  ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর থেকে এ-ই করে যাচ্ছি। এতে আমার কোনো ক্লান্তি বা আপত্তি নাই। কারণ আমি জানি আমি কোনো ভুল করি নাই। আমিও সালমানের মৃত্যুর সঠিক তদন্ত চেয়েছি সবসময়। চেয়েছি প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসার স্বামীকে খুনের অপবাদ থেকে মুক্তি পেতে।’

সালমানের সঙ্গে সামিরা

-কথাগুলো বললেন বাংলাদেশের প্রয়াত অভিনয় শিল্পী সালমান শাহ‘র সাবেক স্ত্রী সামিরা। সালমান শাহ‘র রহস্যঘেরা মৃত্যুর প্রায় ২১ বছর পর তিনি মুখ খুললেন গণমাধ্যমের কাছে। খোলামেলা ভাবেই জানালেন সেই মৃত্যু নিয়ে নিজের প্রতিক্রিয়া।বলেছেন সালমান ফ্যানদের জন্য জানা অজানা অনেক কথা।

 সাক্ষাৎকারে সামিরা এই মামলার সঠিক তদন্ত চেয়ে বলেন, স্বামীর খুনের অপবাদ তিনিও বহন করতে চান না। তিনি বলেন, ‘এই তো সেই স্বামী যে আমার একটু সুখের জন্য কতো পাগলামি করেছে। আমিও তাকে প্রাণের চেয়ে বেশী ভালোবেসেছি। সেইসময় যারা সালমানের কাছের মানুষ ছিলেন তারা সবাই এসব জানেন ।’

অতি সম্প্রতি সালমানের খুনের মামলার একজন আসামী আমেরিকা প্রবাসী রুবি সুলতানার একটি ভিডিও বার্তা এতো বছর পর পর্দার আড়ালে চলে যাওয়া সালমান শাহ‘র রহস্যময় মৃত্যুর ঘটনাটিকে সামনে নিয়ে এসেছে।রুবি তার সেই বার্তায় বলেছেন, সালমান শাহ আত্মহত্যা করেনি। তাকে পরিকল্পিত ভাবে খুন করা হয়েছে। এই খুনের সঙ্গে জড়িত সালমানে স্ত্রী ও তার স্বামী। তিনি তার নিজের জীবনও বিপন্ন বলে ভিডিও বার্তায় দাবি করেছেন। আর এ তথ্যে সালমান ভক্তদের মধ্যে তৈরী হয় নতুন করে উত্তেজনা। তোলপাড় শুরু হয় মিডিয়া অঙ্গনে।

এরকম এক পরিস্থিতিতে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হয় সালমান শাহ’র সাবেক স্ত্রী সামিরার সঙ্গে। প্রথমে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে না চাইলেও পরে কথা বলতে রাজি হন তিনি।এখানে তার সঙ্গে প্রাণের বাংলার সেই দীর্ঘ আলাপের কিছুটা বিবরণ তুলে দেয়া হলো।

সালমান শাহ মারা যান ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর।  মেধাবী এই অভিনেতা তখনই জয় করে নিয়েছিলেন লক্ষ দর্শকের হৃদয়। বলা যায় সালমান যেন বাংলাদেশের সিনেমায় ‘এলেন, দেখলেন আর জয় করলেন’। তারপরই আচমকা এই তরুণ অভিনেতার ওপর ঘটে যবনিকাপাত। তাঁর লাশ উদ্ধারের পর ধারণা করা হয় তিনি আত্মহত্যা করেছেন। কিন্তু তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে পাল্টা দাবি করা হয় সালমানকে পরিকল্পিতভাবে খুন করা হয়েছে।

সালমানের মৃত্যুকে ঘিরে সেই রহস্যের মেঘ আজো দূর হয়নি। প্রশ্ন রয়ে গেছে তিনি কী আত্নহত্যা করেছিলেন না সত্যি সত্যিই তাকে খুন করা হয়েছিলো?

তাঁর মৃত্যু নিয়ে এখনো চলছে নানা আলোচনা। রয়ে গেছে অনেক প্রশ্ন। তখন খুনের মামলাও করা হয়েছে সামিরার পরিবারের বিরুদ্ধে। সেখানে আসামি করা হয়েছে সামিরা আর তার মাকে। আসামী হিসেবে আরও আছেন রুবি সুলতানা, ডন, দেশের আলোচিত ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাইসহ আরও কয়েকজন। কিন্তু বেশ কয়েকবার তদন্তের পরও তদন্তকারী সংস্থা তাদের রিপোর্টে জানিয়েছে এটি আত্মহত্যা। কিন্তু সেই রিপোর্ট মেনে নেননি সালমানের মা সাবেক এরশাদ সরকারের সাংসদ নীলা চৌধুরী।

স্বামীর সঙ্গে সামিরা

সম্প্রতি রুবি সুলতানার নাটকীয় ভিডিও বার্তার সূত্র ধরে নতুন করে সেই মৃত্যু রহস্যের জট খুলতে তদন্ত শুরু করছে তদন্তকারী সংস্থা পুলিশ  ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনস (পিবিআই)।

কথার শুরুতেই সামিরা খুব স্পষ্ট ভাষায় বললেন, ‘আমি জানি ইমন আত্মহত্যাই করেছে। সেদিন আমাদের বাসায় বাইরে থেকে কেউ আসেওনি, কেউ বেরও হয়নি। সেসময় অনেক মানসিক চাপে ছিলো ইমন।কিন্তু এমন কিছু করে বসবে তা আমার ভাবনাতেও ছিলো না।’

তাহলে এতো বছর পর রুবি সুলতানা ভিডিও বার্তায় এমন দাবি তুলছেন কেন জানতে চাইলে সামিরা বলেন,‘ইমন খুন হয়েছে দাবি করে রুবি যেসব কথা বলছেন তার কোনো ভিত্তি নেই। প্রয়োজনে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হোক। এটিও রেজভীর মতো সালমানের মায়ের কোনো সাজানো পরিকল্পনা হতে পারে। দেশের গণমাধ্যমের কাছে খোলামেলা ভাবে এসব কথা বলতে আমার কোনো আপত্তি ছিলো না। তবে আমি খানিকটা ইচ্ছে করেই এড়িয়ে চলেছি তাদের। আসলে আমার উচ্ছল আনন্দের জীবনটা ইমনের হাত ধরে যখন শুরু হয় তখন এই প্রেস, মিডিয়া পাশে ছিলো। তাই ইমনের অনুপস্থিতিতে সেই জীবনটা আমি আর চাইনি।তাকে বাদ দিয়ে গণমাধ্যমের সামনে আসতে মন সায় দেয়নি।’

তখন নিজেকে নিয়ে নিজের মধ্যে বসবাস করতে চেয়েছিলেন সামিরা। আলাপকালে সেরকমটাই জানালেন।বললেন, সবকিছু থেকে বের হয়ে পরিবারের সঙ্গে একটা নরমাল লাইফ চেয়েছিলেন তিনি।

একুশ বছর পর নীরবতার আড়াল থেকে বের হয়ে এসে কিছুটা স্মৃতিকাতরও হয়ে পড়লেন সামিরা। আবেগজড়িত কন্ঠে বললেন, ‘ইমনের মৃত্যুর পর তিন বছর একাই ছিলাম আমি। এক সময়ে ভেবেছি বিদেশে চলে যাবার কথা। সেখানে গিয়ে লেখাপড়া শুরু করলে হয়তো মন শান্ত হবে।  কিন্তু সেটা আর হয়নি। আসলে আমি ইমনের মৃত্যুটাকে, তার অনুপস্থিতিকে মেনে নিতে পারছিলাম না।তখন খুব অনুভব করতাম আমাদের যদি একটি সন্তান থাকতো।  এমনি এক সময়ে ইমনেরই বন্ধু মোস্তাক ওয়াইজ আমাকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। আমি তাকে প্রথমে ফিরিয়ে দেই। পরে তার পরিবার ও আমার পরিবারের প্রচেষ্টায় বিয়েটা হয়। আমি এখন ভালো আছি।’

তিন সন্তানের জননী সামিরা তার বর্তমান সংসার নিয়ে বলেন, তার বড় ছেলে মালয়েশিয়াতে থাকে। দুই মেয়ে  ঢাকার একটি স্কুলে পড়াশোনা করছে।

তিনি বলেন, ‘যতোদিন আমার এই পক্ষের শাশুড়ি বেঁচে ছিলেন আমার প্রাক্তন শাশুড়ি কিন্তু এসব বিষয় নিয়ে কোনো কথা বলেননি।কারণ ইমনের মা নীলা চৌধুরী আমার বর্তমান শাশুড়িকে চিনতেন। তারা একসময়ে প্রতিবেশি ছিলেন। যখনই আমার শাশুড়ি মারা গেলেন তিনি আমাকে নিয়ে নানা রকম ব্লেম দিতে শুরু করলেন নতুন করে। আমার সন্তানদের, আমার স্বামীর, আমার বাবা, মা, বোন ও তাদের পরিবারের যদি কোনো ক্ষতি হয় তবে তার দায় কিন্তু নীলা চৌধুরীকেই নিতে হবে। তার মিথ্যে কথার ফুলঝুড়িতে সালমান ভক্তরা আবেগের বশে আমাকে নিয়ে নানা বাজে কথা ছড়াচ্ছেন। আমার বোনদের ছবি দিয়ে বলা হচ্ছে এটা আমি। আমার বোনদের সন্তানদের দেখিয়ে বলা হচ্ছে আমার সন্তান। এদের কারো কিছু হলে দায়ী হবেন নীলা চৌধুরী।’

কথা বলতে বলতে সামিরার সামনে হয়তো খুলে যায় সেইসব পুরনো স্মৃতির বাক্স। একটু আবেগপ্রবণ হয়ে তিনি বলেন, ‘সালমান শাহের ভক্তরা এতদিন এক তরফা শুনে এসেছেন। তাই ওরা আমাকে দোষ দেয়। এতে ওদের কোনো দোষ নেই। এখন ওদের বোঝা উচিত। এখন অনেক কিছু আছে, সবকিছু মিলিয়ে দেখুক। কাগজপত্র, বিভিন্ন প্রমাণ, ডিবি (ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চ) রিপোর্ট, সিআইডি, জুডিশিয়াল রিপোর্ট, র‍্যাবের রিপোর্ট দেখুক। সর্বশেষ পিবিআই দেখছে এখন। রিপোর্ট একই হবে ইনশাল্লাহ।’

সামিরা নিজের কথার পেছনে যুক্তি টেনে বলেন, ‘আমি কিছুই করিনি। আমি কিছু করে থাকলে বাসায় বসে থেকে এই দোষ আমার কাঁধে নিতাম না। এখন বাংলাদেশে এত বোকা কোনো মেয়ে নেই। আর আমাদের দেশে শাশুড়ি-বউয়ের মধ্যে টুকটাক ঝামেলা থাকেই। কিন্তু আমার প্রাক্তন শাশুড়ি উদ্দেশ্যমূলকভাবে ইমনের মৃত্যুকে ‘এনক্যাশ’ করতে চাইছেন। বারবার তিনি কোনো প্রমাণ ছাড়াই ইমনের খুনি হিসেবে বলছেন- সামিরা-সামিরা-সামিরা। কেন?

সালমানের পরিবারের সঙ্গে সামিরা

নিজের আবেগকে সামাল দিতে একটু সময় নীরবতার মাঝে ডুবে যান সামিরা।তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে বলেন, ‘সত্য কথা একটাই। সেটা কখনও দুইটা হয় না। মিথ্যে কথা বলতে গেলে পেঁচিয়ে বলতে হয়। একেকবার একেক জনের নাম বলতে হয়। আমি যা বলেছি সেটাই প্রমাণ হবে। ইন্টারপোল, এফবিআই আসলেও আমার কোনো সমস্যা নেই। আমিও চাই তারা আসুক।’ তিনি বলেন, ‘আমার প্রাক্তন শাশুড়ি  বারবার বলেন যে- তিনি ইন্টারপোল, এফবিআই এর তদন্ত চান। আমি বলেছি, তাতে আমার কোনো ধরণের আপত্তি নেই। আমি ওয়েলকাম জানাই। আমার জন্য আরো সুবিধা হবে প্রমাণ করতে যে, এটি আসলেই আত্মহত্যা, কোনোভাবেই হত্যা না। যত তদন্ত করা হোক না কেন আমার কোনো সমস্যা নেই।’

সালমান শাহের ভক্তদের উদ্দেশ্যে সামিরা বলেন, ‘আমার কথাগুলো আজ সালমানের ভক্তদের মানতে কষ্ট হবে। কিন্তু এটাই সত্যি। অনেকে আমাকে নিয়ে বাজে কথা বলেন, বাজে ধারণা পোষণ করেন। কিন্তু কারো উপর আমার কোনো রাগ নেই, কষ্ট নেই। প্রথম থেকেই তারা সালমান শাহকে ভালোবাসেন। আমার ইমন যতদিন বেঁচে ছিল আমার  শাশুড়ি কি সে সময় বোবা ছিলেন? কেন ইমন নিজে আমাকে কিছু বলেনি? কারো কাছে কোনো অভিযোগ করেনি? কারণ সত্যিটা হলো, আমার কোনো দোষ ছিলো না। ইমন আমার প্রতি ওর মায়ের বিভিন্ন আচরণের জন্য মাকে পছন্দ করতো না। এটা ইমনের পরিবার, খালা-মামা ও তাদের বাচ্চারা জানতো। ফিল্মের লোকজন এমনকি সাংবাদিকরাও জানতেন। ইমন তার মাকে নিয়ে সবসময়ই মানসিক চাপে ভুগতো। আমি সবসময় চেষ্টা করেছি তার(নীলা চৌধুরী)পাশে থাকতে। কিন্তু তিনি দজ্জাল শাশুড়িই হতে চেয়েছেন। যার কাছে ছেলের জন্যই ভালোবাসা নেই তার কাছে আমি কী করে ভালোবাসা আশা করি? আমার উপর দিয়ে অনেক ঝড় যাচ্ছে। আমিও চাই আসল সত্যটা বের হোক। তাহলে আমি শান্তি পাব।’

সবশেষে সামিরা বলেন, ‘যেটা সত্য সেটা প্রমাণ হবে ইনশাল্লাহ। যতদিন বেঁচে থাকব আমি এটাই বলে যাব।

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com